সোমেন চন্দ (১৯২০–১৯৪২) বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ও উচ্চার্য নাম। কয়েক বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি যে স্বাতন্ত্র্য ও শিল্পসফলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল। আকারে ক্ষুদ্র হলেও তাঁর গল্পসম্ভার জীবনদর্শন, সমাজচেতনা ও শিল্পনৈপুণ্য গভীর ও বিস্তৃত। অল্প আয়ু ও স্বল্প রচনাকাল–এই দুই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তিনি হয়ে উঠেছেন চল্লিশের দশকের প্রগতিশীল গল্পধারার এক অনিবার্য স্রষ্টা।
সোমেন চন্দ গল্প লেখার সময় পেয়েছেন মাত্র তিন বছর ১৯৩৯–১৯৪২। তিনি ছিলেন রেলশ্রমিক ইউনিয়নের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। ফলে কলকারখানা এবং রেল শ্রমিকদের জীবনধারণের সরাসরি সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর লেখা গল্পে। এখান থেকেই লেখক সোমেন চন্দের সার্থক উত্তরণ। শ্রমিক ইউনিয়নের কাজ করার সুবাদেই তিনি তাঁর জীবনমুখী সাহিত্যের উপাদানের সন্ধান পেয়েছিলেন। একই সাথে প্রগতি লেখক সংঘে কাজ করার মধ্যদিয়ে নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা।
একদিকে রেলশ্রমিক সংগঠন, অন্যদিকে প্রগতি লেখক সংঘ–এই দুই ধারায় সমতালে বিরামহীন পথ চলেছেন কৈশোর উত্তীর্ণ সোমেন চন্দ। তাঁর প্রথম ছোটোগল্প ‘বনস্পতি’ প্রকাশিত হয় ‘ক্রান্ত’ নামের সাহিত্য সংকলনে। সোমেন চন্দের মৃত্যুর কিছুদিন পর ১৯৪২ সালে ‘ইঁদুর’ গল্পটি কলকাতার ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি সচেতন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সংকেত ও অন্যান্য গল্প’।
১৯৪৪ সালে কলকাতা থেকে তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘বনস্পতি ও অন্যান্য গল্প’ প্রকাশ পায়। এ সময় তাঁর দুটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হলে বাংলার বাইরে তার পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। ‘সংকেত’ গল্পটির অনুবাদক লীলা রায় (অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী), ‘ইঁদুর’ গল্পের অনুবাদক অশোক মিত্র।
মাত্র বাইশ বছর বেঁচে থাকা সোমেন চন্দের সাহিত্যজীবন মাত্র দুই–আড়াই বছরের। লেখক হিসেবে সোমেন চন্দের পরিচিতি তাঁর মৃত্যুর পর। এই অতি অল্প সময়ে তাঁর রচনা যে বিশিষ্টতায় বিচার্য তা একান্তই তাঁর সমাজ–দর্শনের ফল। তাঁর গল্পে জীবনবোধ প্রকাশের ঔজ্জ্বল্য সুস্পষ্ট যা সমসাময়িক জীবনপ্রবাহেরই ধারক। সেই জীবনবোধ সুখী–সুন্দর সমাজনির্মাণের প্রত্যয়। তিনি গল্প লিখেছেন মানুষের অনুভূতির গভীর তলদেশসঞ্চারী অনুভবের সংমিশ্রণে। সেখানে তিনি নতুন ধারার প্রবর্তক। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের গল্পধারার অগ্রগামী সোমেনের গল্পভাবনা। গত শতকের চল্লিশ–পঞ্চাশ দশকে বাংলা ছোটগল্পধারাকে প্রগতির পথে বিকশিত করার সার্থক কারিগর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি সোমেন চন্দ। এই সময়ে বাংলা ছোটোগল্পে প্রগতিধারার যে বিকাশ, তারই সূচনা হয়েছিল সোমেন চন্দের লেখায়।
গণজীবনের প্রবহমানতার সঙ্গে একাত্ম সোমেন চন্দ মানব–মানবীর সূক্ষ্ম অনুভূতিকে স্পর্শ করে নির্যাস আহরণ করে তার মর্মবাণী দিয়ে সিক্ত করেছেন তাঁর লেখা। গ্রাম আর গ্রামের মাটি–মানুষের সাথে গভীর সম্পর্কের ফসল এই সৃষ্টি। তাঁর গল্পের উৎসভুবন কেবল গ্রামের মানুষই নয়, তাঁর দৃষ্টিতে সন্ধান করেছেন কলকারখানায় শ্রমিকদের অন্তর্জীবন। নিজে কাজ করেছেন শ্রমিক সংগঠনে। মৃত্যুর দু–বছর আগে তিনি জড়িয়ে পড়েন রেল শ্রমিকদের সংগঠনের সাথে। এসব অভিজ্ঞতার সন্ধান পাওয়া যায় তার ‘সংকেত’ গল্পে।
মানুষের জীবন থেকে কাহিনি এবং চরিত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে সোমেন চন্দের ছোটোগল্পের কাঠামো। সমসাময়িক নানা বিষয়ের দিকে সজাগ দৃষ্টির প্রতিফলন পাওয়া যায় তার গল্পে। সারা ভারতবর্ষে যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের নিনাদ গগনস্পর্শী তখন সোমেনের আশঙ্কা সামপ্রদায়িক সংঘাতের প্রভাবে সেই সংগ্রামে ভাটা পড়ে কি না–এই আশঙ্কারই ফসল ‘দাঙ্গা’ গল্প। এ গল্পে লেখক নিজেই একজন সচেতন অংশীদার। তিনি গল্প লিখেছেন সমাজ আর মানুষের সুখ–দুঃখের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা থেকে। এই দায়বদ্ধতার উৎস তাঁর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ। দ্বিধাহীন চিত্তে তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন। এই দ্বিধাহীনতা তাঁকে ঠেলে দিয়েছে অকালমৃত্যুর দিকে যা আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল।
এ যাবৎ প্রকাশিত সোমেন চন্দের গল্প সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সোমেন চন্দের গল্পগুচ্ছ (১৯৭৩), সম্পাদনা– রণেশ দাশগুপ্ত– কালিকলম প্রকাশনী, ঢাকা; সোমেন চন্দ রচনাবলি (১৯৯২), সম্পাদনা বিশ্বজিৎ ঘোষ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা; সোমেন চন্দ গল্পসংগ্রহ (১৯৯৭), সম্পাদনা– পবিত্র সরকার, বাংলা আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গ; সোমেন চন্দ ও তার রচনা সংগ্রহ (১৯৯৯), সম্পাদনা ড. দিলীপ মজুমদার, কলকাতা নবজাতক প্রকাশন; সোমেন চন্দ গল্পসমগ্র (২০১৮), সম্পাদনা–বদিউর রহমান,পাঞ্জেরি পাবলিকেশন লিঃ।
এ পর্যন্ত সোমেন চন্দের মোট ২৮টি গল্প সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলা ছোটোগল্পের ধারায় সোমেন চন্দ এক বিশেষ পথের পথিক। তাঁর গল্পের কাহিনি এবং চরিত্র তাঁরই চারপাশ থেকে নেওয়া। সমাজের নানা অসঙ্গতির বিচিত্র সব ঘটনা সোমেন চন্দের ছোটোগল্পের অবলম্বন। সরাসরি রাজনৈতিক প্রসঙ্গেরও সন্ধান পাওয়া যায় তার গল্পে। সোমেন চন্দ সাধারণ থেকে অতি সাধারণ মানুষের সাদামাটা জীবনের গভীরে প্রবেশ করে তার নির্যাস পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন সার্থকভাবে। একজন শ্রমিক সংগঠকের পক্ষে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সন্ধান অতি সহজ; আর সেই সহজ পথেই তাঁর পথচলা।
বিভিন্ন চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করে তাদের পরতে–পরতে আলো নিক্ষেপ করেছেন গভীর মনীষায়। সোমেন চন্দের ছোটোগল্প তাই জীবনরসে পূর্ণ, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ উত্তীর্ণ হতে পারেন গভীর সচেতনতায়। সোমেন চন্দের ছোটোগল্প পাঠককে পৌঁছে দিতে পারে মানবমুক্তির মানসলোকে। সেই সাথে অবশ্য উচ্চার্য নামও। সোমেন চন্দের প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প ‘শিশু তপন’ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে।
তাঁর বয়স তখন সতেরো। ‘শিশু তপন’ প্রকৃত অর্থে কিশোরের রচনা। যদিও সে কিশোর, প্রতিভাবান–তবু তার দৃষ্টিভঙ্গি, সৌন্দর্যবোধ, পারিবারিক সংস্কার এবং ট্রাজেডি ধারণা–যা আসলে ট্রাজিক নয়, করুণ মাত্র– সবই লেখকের কৈশোরের প্রতি ইঙ্গিতও করে।
দ্বিতীয় গল্প ‘ভালো–না–লাগার শেষ’। এক শিক্ষিত আধুনিক দম্পতির প্রেমমধুর এক আখ্যান। স্বামী–স্ত্রী দুজনই কর্মরত। স্ত্রীর ওপর স্বামী কখনো জোর করবে না– এই শর্তে বিবাহ।বিরহিনী রমণী শেষ পর্যন্ত আত্নভিমান দূর করে এসে মিলিত হয় স্বামীর সাথে।গভীরতর কোনো জীবনবোধ না থাকলেও একটি মধুর প্রেমের গল্প হিসেবে গল্পটি নিটোল।
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তৃতীয় গল্প ‘অন্ধ শ্রীবিলাসের অনেকদিনের একদিন’– পরিণত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে–কোনো গল্পের পাশে সমান উচ্চতায় দাঁড়াতে সক্ষম।
১৯৩৮ সালে সোমেন চন্দের যে গল্পগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, তার মধ্যে আছে ‘স্বপ্ন’, ‘সংকেত’, ‘মুখোস’, ‘অমিল’, ‘রানু ও স্যার বিজয়শংবর’, ‘এক্স–সোলজার’, ‘পথবর্তী’ ও ‘সত্যবতীর বিদায়’–এর মধ্যে ‘মুখোশ’ গল্পটি সাপ্তাহিক ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
বিষয়বস্তুর দিক থেকে তাঁর উপযুক্ত গল্পগুলোর মধ্যে ‘সংকেত’ ও কিছুটা হলেও ‘অমিল’ ছাড়া বাকি গল্পগুলোতে লেখকের উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে দেখানো। বিচিত্র মানুষ। তার ভালোবাসা ও ভ্রান্তি, স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা , স্নেহ ও দ্বন্দ্ব।
গল্পগুলোর অনেকটাই কাঁচা লেখা ও কিছুটা পরিণত লেখা। ‘পথবর্তী’ গল্পে বংশমর্যাদায় উপযুক্ত নয় বলে মালতীর পিতা সুব্রতর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে অস্বীকার করেন। ব্যর্থ প্রেমিক বিদায় নিয়ে চলে যায় ও অশ্রুসিক্ত প্রেমপত্র ছড়িয়ে দেয় হাওয়ায়। গল্পটির প্লট যে খুব সুচিন্তিত তা বলা যায় না।
এগুলোর মধ্যেই সরল ও একরৈখিক গল্প ‘অমিল’–এর আত্মপ্রকাশ করল সাম্যবাদী দৃষ্টিকোণ, সমাজের শ্রেণিভেদ সম্পর্কে তীক্ষ্ণতর চেতনা।
‘রানু ও স্যার বিজয়শংকর’ গল্পটি সরল ও বক্তব্যমূলক হলেও বিজয়শংকরের দ্বন্দ্ব ও তার প্রতি লেখকের সহানুভূতিও লক্ষণীয়। মানুষকে সাদা–কালো ভাগে ভাগ করার যান্ত্রিকতা সোমেন চন্দ প্রথমেই বর্জন করতে পেরেছিলেন।
এই ধারার শ্রেষ্ঠ গল্প ‘সংকেত’। সংগ্রামী বিশ্বাসকে গল্পে প্রতিষ্ঠিত করা অথচ গল্পের শিল্পগুণ অক্ষুণ্ণ রাখা– এই দুই দিক মেলাতে কম লেখকই পারেন। এ ধরনের গল্পে একজাতীয় ঋজুতা কাঙ্ক্িষত অথচ তা স্লোগানে পর্যবসিত হওয়াও কাম্য নয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হারানের নাত জামাই’ বা ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ গল্প দুটির পাশে দাঁড়াবার মতো গল্প সোমেন চন্দের ‘সংকেত’। ‘সংকেত’ গল্পটির নির্মাণ আশ্চর্য রকমের নিখুঁত।
‘সত্যবতীর বিদায়’ গল্পটি ভিন্ন স্বাদের। রূপহীন, বিত্তহীন, প্রৌঢ়া সত্যবতী ধনী সপত্নীপুত্রের ঘরে আশ্রয়প্রার্থী। সে ঘরে সত্যবতী আশ্রয় পেলেও কী এক অব্যক্ত প্রতিহিংসাবশে সপত্নীপুত্রের শিশু ছেলেমেয়েগুলোকে সে সন্ত্রস্ত করে তোলে ভুতের গল্প শুনিয়ে।
এই পর্বের অবিস্মরণীয় গল্প ‘স্বপ্ন’। গল্পটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুই গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও জগদীশ গুপ্তের গল্পের সমমানের গল্প ‘স্বপ্ন’।
তাদের ‘দিবসের শেষে’ ও ‘হাড়’ গল্পে সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা নিয়তির কাছে মানুষের অসহায়ত্ব ও আত্মসমর্পণের আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু সোমেন চন্দের গল্পের পুরো ব্যাপারটাই বৈজ্ঞানিক অথচ তাঁর লেখনরীতি যেন মানুষের চরিত্রকেই তার নিজের নিয়তি করে তোলে। মানিকের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের সাথে এ গল্পের প্রাথমিক তুলনা করা চলে। কিন্তু সোমেন চন্দের গল্পটিতে জীবন বাসনার তীব্রতা যখন অকম্পিত রেখায় মৃত্যুতে গিয়ে শেষ হয় তখন আমরা ট্র্যাজিক চেতনার স্বাদ পাই; যা সাধারণভাবে বাংলা ছোটোগল্পে খুব সুলভ নয়।
গল্পটিতে তারাশঙ্করের একাধিক গল্পের ছাপ রয়েছে। বিশেষত, বৈষ্ণবদের এই শ্রেণির ও ভাষাভঙ্গি প্রচলিত, তার সুন্দর মধ্যে প্রেম সম্পর্ক বিষয়ে যে বিশেষ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষাভঙ্গি প্রচলিত,তার সুন্দর রূপায়ণ এ গল্পটিতে স্পষ্ট।
‘দাঙ্গা’ গল্পটিকে সামপ্রদায়িক সংঘাত সম্পর্কিত শ্রেষ্ঠ গল্প বলা যায়। গল্পটিতে সামপ্রদায়িক বিরোধের নিরর্থক রক্তপাতের ইঙ্গিত করা হয়েছে।
‘ইঁদুর’ গল্পটি বহুলপঠিত ও বহুল–উচ্চারিত নন্দিত গল্প। সংগত কারণে ‘ইঁদুর’ গল্পটিকে অধিকাংশ জনই সোমেন চন্দের শ্রেষ্ঠ গল্প বলে মনে করেন। গল্পটির ছোটো পরিসরে লেখক দেখিয়েছেন একটি বিশেষ সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণির সমগ্র অবস্থাটির প্রতিফলন। সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত বিত্তহীন অক্ষম যে মধ্যবিত্তশ্রেণিকে তিনি দেখান, তারা সর্বতোভাবে আত্মপ্রবঞ্চক। গল্পটির শেষ বিন্দুতে লেখক সত্যের ছবিই রেখেছেন, স্বপ্নের ছবি নয়।
সোমেন চন্দ বেশ কয়েকটি প্রেমের গল্প লিখেছিলেন। কিন্তু তরুণ চিত্তের আবেগ–উচ্ছ্বাস সেখানে প্রাধান্য পায়নি। প্রেমকে বেঁচে থাকার অন্যতম ইতিবাচক রূপ হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি। ‘ভালো–না–লাগার শেষ’ গল্পে প্রেম অনুভব সুন্দরভাবে পরিবেশিত, কিন্তু গতানুগতিক। তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘মরূদ্যান’ গল্পের দূর সম্পর্কের আশ্রিত রুনুর সঙ্গে তার বীনাদির সম্পর্ক।
‘একটি রাত’ গল্পে বীণার সাথে সুকুমারের দেখাই হয় না। তবু সুকুমারের প্রতি ভালোবাসা যেভাবে লেখক দেখিয়েছেন তার চেয়ে ভালোভাবে বুঝি প্রকাশ করা যেতো না।
সোমেন চন্দের গল্পের কথনরীতি বিবৃতিমূলক এবং প্লট মোটের ওপর গল্পাশ্রয়ী হলেও তা খুব প্রবলভাবে ঘটনাশ্রয়ী নয়। তাঁর গল্পকে খানিকটা আবহনির্ভর বলা যায়। সেই আবহ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘একরাত্রি’ বা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’–এর মতো প্রেমবোধ বা কারুণ্যবোধে লিরিক্যাল হয়ে ওঠে না।
‘ক্ষুধিত পাষাণ’–এর মতো রহস্য আবহময় গল্প সোমেন চন্দ লেখেননি। বরং বলা যেতে পারে তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোতে যেমন– ‘দাঙ্গা’, ‘ইঁদুর’, ‘অন্ধ শ্রীবিলাসের অনেক দিনের একদিন’ ইত্যাদি গল্পে প্রধান হয়ে ওঠে একটি টেনশন–এর আবহ।
সোমেন চন্দের বিবৃতিধর্মী কথনরীতির মধ্যেও কিছু রকমফের লক্ষ করা যায়। অনধিক ত্রিশটি গল্পের মধ্যে মাত্র চারটি গল্পে তিনি ব্যবহার করেছেন উত্তম পুরুষের বচন। ‘শিশু তপন’ (১৯৩৭) সোমেন চন্দের প্রথম প্রকাশিত গল্প। এখানে একটি বালিকার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং তার ফলে সঙ্গী বালকের শোক। গল্পটির একজন কথক আছেন, যিনি ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার অনেকদিন পরে গল্পের পাঠক ও শ্রোতাদের গল্পটি বলেছেন। তাঁর ২৮টি প্রাপ্ত গল্পের আর দুটিমাত্র গল্পে এক কথক চরিত্রকে নিয়ে এসেছেন। দুটি গল্পেই সেই কথক আবার গল্পের অন্তর্গত এক চরিত্র হয়ে উঠেছেন। আগের দুটি গল্পের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেনি।
গল্পে ব্যবহৃত গদ্যের ক্ষেত্রে সোমেন চন্দ সাধু বাংলা গদ্য ও চলিত বাংলা গদ্য দুই–ই ব্যবহার করেছেন। তিনের দশকের শেষ পর্যন্ত, এমনকি চারের দশকের প্রারম্ভেও গল্পের মাধ্যম হিসেবে সাধু গদ্য অপ্রচলিত হয়নি। আবার চলিত ভাষায় প্রচলিত হয়েছে। সোমেন চন্দ দুটি রীতিতেই অভ্যস্ত ও অনায়াস ছিলেন। গল্পের বিষয় বা অভিপ্রায়ভেদে গদ্যের রীতিতে যে পরিবর্তন করেছিলেন, তেমন নয়। স্বাভাবিকভাবে প্রথম দিকের লেখা গদ্যে সাধুরীতি ও পরের দিকে লেখা গদ্যে চলিতরীতি প্রযুক্ত হয়েছে। সংলাপ অংশে তিনি সবসময়ই চলিত বাংলা ব্যবহার করেছেন। তাঁর দু–একটি গল্পে সংলাপের ভাষার আড়ষ্টতা ও অস্বাভাবিক আবেগের স্পর্শ আছে। প্রথম কয়েকটি গল্পের পরেই তা থেকে সর্বাংশে মুক্ত হয়েছিলেন।
সোমেন চন্দ খুবই কম উচ্চারিত। বর্তমানে কেউ কেউ তাঁর গল্পালোচনার ব্রতী হয়েছেন। এটি বাংলা ছোটোগল্পের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
সোমেন চন্দের গল্পের চরিত্ররা তাঁরই চারপাশের মানুষ–গ্রামের দরিদ্র কৃষক, কলকারখানার শ্রমিক, বিপন্ন মধ্যবিত্ত কিংবা প্রেম ও জীবনের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত সাধারণ মানুষ। এদের জীবনের টানাপোড়েন, স্বপ্নভঙ্গ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি মানবমুক্তির ইঙ্গিত সন্ধান করেছেন। তাঁর গল্প তাই কেবল সামাজিক দলিল নয়, মানবিক উপলব্ধিরও এক উৎকৃষ্ট শিল্পরূপ।
বাংলা ছোটোগল্পের প্রগতিধারার সূচনা ও বিকাশে সোমেন চন্দ একটি অপরিহার্য সেতুবন্ধন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি এই ধারাকে আরও তীক্ষ্ম ও জীবনঘনিষ্ঠ করে তুলেছেন। আজও তাঁর গল্প পাঠককে সচেতন করে, প্রশ্ন জাগায় এবং মানবিক মুক্তির মানসলোকের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে সক্ষম হয়। এই কারণেই সোমেন চন্দ কেবল স্বল্পায়ু প্রতিভা নয়–তিনি বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় শিল্পী।













