সৈয়দা করিমুননেসার দ্বিতীয় কাব্য ‘শব্দে আঁকি’

গোফরান উদ্দীন টিটু | শুক্রবার , ২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

কবি সৈয়দা করিমুননেসার দ্বিতীয় কাব্য ‘শব্দে আঁকি’ ২০২৪ সালে প্রকাশিত অত্যন্ত সুখপাঠ্য একটি গ্রন্থ। ২০২১ সালে রাদিয়া প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় ‘হলুদ ফুলের দুপুর’। দুটি বই মিলিয়ে একজন চিত্রশিল্পী সৈয়দা করিমুননেসা ডালিয়াকে পূর্ণাঙ্গ কবি হিসাবেই যেন খুঁজে পাই আমরা। জীবনসঙ্গী শিল্পী জয়নুল আবেদিনের আঁকা দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদে মাত্র ছত্রিশ পৃষ্ঠার বইটিতে স্থান পেয়েছে কবির সর্বমোট ত্রিশটি কবিতা। প্রথম গ্রন্থ ‘হলুদ ফুলের দুপুর’ এ ছিলো আটাশটি।

শব্দে আঁকি’র অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলো হলোরঙধনু, রঙ্গন, জারুলের ক্যাম্পাস, জ্ঞান, বন্ধু আমার, শূন্যে, বর্ষার মেঘমালা, জয়ী, স্বর্গময় পৃথিবী, পাতা ঝরার দিন, মেঘের খাম, বাংলাদেশ, শিল্প, বিষণ্ন বেদনা নিয়ে, আয়না, নববর্ষ, ঋতুরাজ, সাহসী আলো, সুন্দরের পথে, প্রত্যাশা, মাতৃত্ব, রমজানের বাবা, সত্যবাদী মেঘ, বন্ধুত্ব, বিজয় দিবস, প্রিয়র চোখে জল, বছর শেষে, শীতের বুড়ি, অপেক্ষা, সময়।

প্রথমে যদি কবির কাছে জানতে চাই বইয়ের নাম ‘শব্দে আঁকি’ কেন? কবি নিশ্চয় সদুত্তর দেবেন। তবে আমি বলবো কবি যেহেতু একজন চিত্রশিল্পী এবং এ কবিতাগুলোও তার এক একটি শিল্পকর্মহয়তো কিছুটা হলেও বলা সার্থক হবে কবি শব্দেও ছবি আঁকেন। তাকে ধন্যবাদ এমন অসাধারণ নামকরণের জন্য।

কবির একটি কবিতা ‘বন্ধু আমার’

ঘোরতর সাইক্লোনের মতো

ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে

আঘাত হানে সমুদ্রের পাড়ে,

কাছে আসার আগে

দূরে চলে যায়।

মহাসমুদ্রের মতো

বিপদে বন্ধুর পরিচয়

এই দুঃসময়ে আমি

চিনেছি বন্ধু আমার

পরম, পরিচিত

মহান রব!

পরম করুণাময় মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কবি স্রষ্টাকে পরম বন্ধু বলেছেন। সত্যিই তিনি আমাদের সত্যিকার বন্ধু বলে আমিও মনে করি। ‘বাংলাদেশ’ কবিতায় দেখি

আমাদের আছে বায়ান্ন

আমাদের আছে নবান্ন

ভুলিনি আমরা একাত্তর

মা হারা ছেলের আর্তনাদ

বোনেরা হারিয়েছে সম্মান

ভাইরা নয় শুধু

অনেক বোনও গিয়েছে যুদ্ধে

আছে বাউলের গান

কত পিঠাপুলির ঘ্রাণ

আমরা হয়েছি ধন্য

বাংলাদেশের জন্য।

সত্যিই এ চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে সৈয়দা করিমুননেসার ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি আমাদের আশান্বিত করে।‘শিল্প’ কবিতার শেষ দুটি লাইনপৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম বিষয় / সুন্দরের অনুসন্ধান করা।

কবি যেন সে কাজটিই করছেন সগর্বে। তার প্রতিটি কবিতায় আমরা সে কথারই প্রতিধ্বনি শুনি। ‘আয়না’ কবিতায় আছে

নিজের দিকে তাকাই / স্বপ্নীল আশা জাগিয়ে দেয় /অমাবস্যার অন্ধকারেও!

এই বইয়ে কষ্টের অনেক কবিতা থাকলেও কবি শেষ পর্যন্ত আমাদের আশাবাদি করেন চমৎকার সব চিত্রকল্পে যা এক কথায় অসাধারণ। তার নববর্ষকবিতাও যেন এ কথারই জয়ধ্বনি। ‘সাহসী আলো’ কবিতায় কবি বলেন

অস্থির শূন্যতায় দিন কাটে / অথচ ঠিক তখনই একটুখানি / কেবল একটুখানি আলো / জানালার পাশে এসে সাহস জোগায়। ‘সুন্দরের পথেকবিতায় কবির স্বীকারোক্তিরাত্তির বেলা আমাকে আলোকিত করে / আমার সুন্দরের পাশে হাঁটা/ ক্রমাগত চলতে থাকে।

আমরাও চাই কবির এ অন্তহীন পথ চলা অভিরাম সুন্দরের পথেই হোক। শিল্পচর্চা ও কাব্যচর্চা পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটুক। ‘প্রত্যাশা’ কবিতাটিও আমাদের বেশ আশান্বিত করে। ‘মাতৃত’্বকে কবি এঁকেছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হিসেবে। ‘রমজানের বাবা’ কবিতায় কবি একজন সাধারাণ মানুষকে অসামান্য ভালোবাসায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘বিজয় দিবস’ কবিতার শেষ লাইনে কবি বলেনবিজয় শুধু একার নয়, সকলের।

সত্যিই তাই যেন হয়। ‘বছর শেষে’ কবিতায় কবির ভাষায়বছর শেষে পাখির মতো উড়তে ইচ্ছে করে / কেবল উড়তে ইচ্ছে করে। এ ইচ্ছে আমাদেরও। বছর শেষে কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা। ‘অপেক্ষা’ কবিতায় কবির বাণীআত্মাকে ধুয়ে মুছে তোমার তরশে রাখি / কে এসে দিয়ে যায় অবিরত ঝাঁকি / জানালা রেখেছি খোলা /বৃষ্টি এসে দিয়ে নাড়া! পরম শ্রদ্ধেয় বাবামাকে উৎসর্গীত কবি সৈয়দা করিমুননেসার ‘শব্দে আঁকি’ কাব্যটি সবাইকে নাড়া দিয়ে যাক।

লেখক: কবি, শিশুসাহিত্যিক, কলেজ শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধশুভ হোক নতুন বছর
পরবর্তী নিবন্ধনতুন বছরে স্বপ্নের পরিধি বাড়াতে হবে