সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী একাধারে চলচ্চিত্র নির্মাতা, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা, প্রশিক্ষক ও লেখক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ, ভাঙা কামানের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছিল তখনও, ঐ সময়ে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী‘র জন্ম, ২৬ আগস্ট, ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে। বাবা সৈয়দ রফিক উদ্দিন আহমদ চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, পরবর্তীকালে ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। মা নুরুন্নাহার বেগম পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের লেখক ছিলেন। ‘বোবা মাটির ফসল‘ কবিতা ও ‘ফসল বোবা মাটির‘ তার ছোট গল্পের বই। তার বাবার চাকরির সূত্রে ছোটোবেলা কাটে চট্টগ্রামে, কৈশোর বেলা রাজশাহী এর পরে ঢাকায়। শৈশবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিল দেখেছেন, খেলাচ্ছলে সেই মিছিলে শরিকও হয়েছেন। পড়াশোনা রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও পরবর্তীকালে ঢাকা কলেজে। চলচ্চিত্র বিষয়ক ডিগ্রি নিয়েছেন ভারতের পুনেতে অবস্থিত ‘ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে। সেখানে তিনি সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ ও ওমপুরির মত বিখ্যাত শিল্পীদের।
তিনি বেড়ে উঠেছেন সংস্কৃতির পরিবেশে ও সাংস্কৃতিক আবহে। লেখালেখির শুরু স্কুল জীবনে, যখন রাজশাহী কলেজিয়েটের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ইত্তেফাকের কচি–কাঁচার আসরে রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই তার প্রথম লেখা ছাপান। পরে ‘কৌণিক‘ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। কৌণিক থেকে প্রতি মাসে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেন। এই কৌণিক থেকে কবি আবুল হাসানের সাথে যৌথভাবে তিনি সম্পাদনা করেছেন আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা সংকলন ‘কাক‘। যাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ১২৮ জন কবির কবিতা স্থান পায়। এই কৌণিক থেকে গল্প, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও কবিতা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘স্বপক্ষে‘ নামে আরো একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।
স্বাধীনতা পরবর্তী তিনি ঢাকা থিয়েটার ও নাট্যচক্র এর সাথে যুক্ত হন। ইন্ডিয়া থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে দেশে চলচ্চিত্র শিল্প উন্নয়নে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ সরকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ ও আর্কাইভ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এই ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্সে তার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে মোর্শেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, মানজারি হাসান মুরাদ ও তারেক মাসুদের মত বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র নির্মাতা। আসলে তিনি যত না ফিল্ম নির্মাতা তার চেয়ে দ্বিগুণ শিক্ষক। তিনি বেশি ছবি নির্মাণ করেন নি, কিন্তু তিনি বা তার হাত ধরে, তার অনুপ্রেরণায়, দিকনির্দেশনায়, তার এগিয়ে দেয়া পথে বহু চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্য নির্মাতা, অনেক সৃজনশীল মানুষ ও শিল্পী গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণদের চলচ্চিত্রের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি কিংবদন্তিতুল্য।
বিশিষ্ট এই নির্মাতার প্রথম সিনেমা ‘ঘুড্ডি’ মুক্তি পায় ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর সেই সাদাকালো–রোমান্টিক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় আশির দশকে খ্যাতি পাওয়া নন্দিত অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফার।
সালাউদ্দিন জাকী ‘ঘুড্ডি’ ছাড়াও ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আলমগীর ও রোজিনাকে নিয়ে ‘লাল বেনারসী’, ইলিয়াস কাঞ্চন এবং অঞ্জু ঘোষকে নিয়ে ‘আয়না বিবির পালা’ নির্মাণ করেন।
১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে জাকী এফডিসিতে অপারেটিভ ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে নিয়োগ পেয়ে ৫ বছরের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি এসএ টিভির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কর্মরত আছেন।
১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে ঘুড্ডি ছবির সংলাপের জন্য ষষ্ঠ জাতীয় শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার পুরস্কার পান সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী। গত শতকের নব্বই দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের মহাপরিচালকের দায়িত্বেও।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২০ এর আয়োজনে খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকীকে প্রদান করা হয় আজীবন সম্মাননা।
চলচ্চিত্র শিল্পে অবদানের জন্য ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকীকে একুশে পদক প্রদান করা হয়।
৭৭ বছর বয়সে তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ইং মৃত্যুবরণ করেন। সালাহউদ্দীন জাকীর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া পৌরসভার ভোয়ালিয়া পাড়ায়। তার স্ত্রী শাহানা বেগম এক সময় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িত ছিলেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।