সেহেরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ

নগরের হালিশহরে রান্নাঘরে গ্যাস বিস্ফোরণ ।।অগ্নিদগ্ধ ৯ জন দুই ভাইয়ের পরিবারের সদস্য ।।এক নারীর মৃত্যু, অন্যদের অবস্থা আশঙ্কাজনক, পাঠানো হয়েছে ঢাকায়

আজাদী প্রতিবেদন  | মঙ্গলবার , ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

নগরীর হালিশহরে একটি বাসায় রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে রানী আকতার নামে এক নারী মারা গেছেন। গত রোববার দিবাগত শেষ রাতে সেহেরির সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় আহতদের সকলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে তাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে প্রেরণ করা হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ ৯ জন দুই ভাইয়ের পরিবারের সদস্য। কুমিল্লা থেকে চিকিৎসা করাতে চট্টগ্রামে ভাইয়ের বাসায় এসে পরিবারসহ দগ্ধ হয়েছেন ছোট ভাই।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হালিশহর এইচ ব্লকের এসি মসজিদের নিকটে হালিমা মঞ্জিল নামে ৬ তলা একটি ভবনের তৃতীয় তলায় স্ত্রী রানী আকতার এবং দুই সন্তানসহ বসবাস করেন স্থানীয় একটি গাড়ির ওয়ার্কশপের মালিক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। সেহেরির খাবার রান্নার জন্য রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে গেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ঘরে থাকা নারী ও শিশুসহ ৯ জন মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।

অগ্নিদগ্ধরা হচ্ছেন সাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (), উম্মে আইমন (), আয়েশা আক্তার (), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০)

এদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন, তার স্ত্রী রানী আকতার ও ছোট ভাই সুমনের স্ত্রী পাখি আকতারের শ্বাসনালীর শতভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া একজনের ৮০, একজনের ৪৫ এবং বাকিদের শরীর ২০২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে বলে বার্ন ইউনিট জানিয়েছে।

ঘটনার পর সাখাওয়াত হোসেনের আত্মীয় এবং স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠান। সাখাওয়াত হোসেনের বাড়ি কুমিল্লার বরুয়ার বাঘমারা গ্রামে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে বসবাস করেন। অপরদিকে দুর্ঘটনায় দগ্ধ মোহাম্মদ সুমন সাখাওয়াতের ছোট ভাই। তিনি নাকের অপারেশন করাতে স্ত্রী ও সন্তানসহ চট্টগ্রামে ভাইয়ের বাসায় আসেন। দুদিন আগে তিনি নাকের অপারেশন করান।

চমেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, দগ্ধদের সকলের শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সকলের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স আগ্রাবাদ স্টেশনের অফিসার খান খলিলুর রহমান বলেন, বাসাটিতে সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করা হয় না। লাইনের গ্যাসে চুলা জ্বলে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়েছিল, রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। পরে আগুন জ্বালাতে গেলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সেই বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হন। বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে ফায়ার সার্ভিসের দুটি স্টেশনের ৪টি গাড়ি ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে একই ভবনে গত ৫ বছর ধরে বসবাসকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন বলেন, সেহেরির জন্য উঠেছিলাম। পাশের ফ্ল্যাটে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। বের হয়ে দেখি আগুনে দগ্ধ চারপাঁচজন ছোটাছুটি করছেন। তাদের গায়ের কাপড়ও ঝলসে গেছে। একজনের পরনের কাপড়ে তখনো দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। আমি দৌড়ে ওই বাসায় গিয়ে একটা শিশুকে নিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি তার গায়ে পানি ঢেলে দিই। এছাড়া দুজনকে হাসপাতালে দিয়ে এসেছি। বিস্ফোরণে ঘরের জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, তখন পরিস্থিতি ছিল অবর্ণনীয়। পুরো বাসায় ভয়াবহ অবস্থা ছিল। তবে ভবনটির অন্যান্য ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণে কিছু জিনিসপত্র ভাঙলেও কারো ক্ষতি হয়নি। আগুন অন্য বাসায় ছড়ায়নি।

অগ্নিদগ্ধদের হাসপাতালে নিয়ে যান তাদের আত্মীয় মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, সেহেরির আগে রান্নাঘরে গ্যাস বিস্ফোরণ হয় বলে জেনেছি। দগ্ধ সকলে একই পরিবারের সদস্য। কুমিল্লার বরুয়া থেকে সাখাওয়াতের বাসায় স্ত্রী পাখি আকতার এবং দুই সন্তানসহ এসেছিলেন ছোট ভাই সুমন। তাদের সবাই অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দগ্ধ ৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটায় ৯টি আলাদা অ্যাম্বুলেন্সে সকলকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের এমপি সাঈদ আল নোমান সাহেব চিকিৎসার ব্যাপারটি মনিটরিং করছেন। তিনি ঢাকায় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটেও বলে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ বঙের ইনচার্জ এসআই মোহাম্মদ আশিক বলেন, গ্যাস বিস্ফোরণে শিশুসহ দগ্ধ ৯ জনকে ভোরে হাসপাতালে আনা হলে তাদেরকে ৩৬ নম্বর বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় বিকালে তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাখাওয়াতের স্ত্রী রানী আকতার মারা যান।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত জানান, দগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, মর্মান্তিক এ ঘটনার খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্টদের ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়। মেডিকেল টিমের মাধ্যমে দগ্ধদের চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা শিশুসহ দগ্ধ সবার সুস্থতা কামনা করছি।

বিডিনিউজ জানায়, গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। অন্য তলাগুলোতে চারটি করে ইউনিট আছে। তৃতীয় তলায় যে ফ্ল্যাটটিতে আগুন ধরে যায় সেটি ছাড়াও ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের দরজাজানালা ভেঙে গেছে। তৃতীয় তলায় লিফটের দরজা ভেঙে গেছে আর দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলায় লিফটের দরজা বাঁকা হয়ে গেছে।

তৃতীয় তলায় সাখাওয়াত হোসেনের যে ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, সেটি ছাড়াও আরো তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে সেখানে। একটিতে পরিবার নিয়ে থাকেন জসীম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। তার ফ্ল্যাটটি সাখাওয়াতের ফ্ল্যাটের মুখোমুখি। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন শামীমা আক্তার তমা নামে এক নারী। সেখানে তিনি একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন। অপর ফ্ল্যাটটির বাসিন্দারা সবাই ঢাকায় থাকার কারণে সেটি ছিল তালাবদ্ধ। ওই তলার প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজাজানালা ভেঙে যাওয়াসহ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিউটি পার্লারের কর্ণধার শামীমা আক্তার তমা জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। এরপর তিনি দেখেন ঘরের দরজা উড়ে গিয়ে তার পার্লারের আলমারি ও শোকেসের গ্লাস ভেঙেছে। তিনি বলেন, ওই বাসাটি থেকে চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখি তারা দৌড়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন। আর ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। বের হওয়ার সময় তাদের শরীরে আগুনও দেখা গেছে। বাসাটির ডাইনিং টেবিলে প্লেটে ভাত দেখা গেছে। মনে হচ্ছে সেহেরি খাওয়ার সময় বিস্ফোরণে আগুন ধরেছে। খাওয়ার শেষ দিকে হয়তো এ বিস্ফোরণ ঘটেছে।

পার্লারের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, ভোর ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এ সময় ঘর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছিল এবং ঘরের সবাই দৌড়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। আগুন লাগা অবস্থায় এক নারীকে দৌড়ে নিচে নেমে যেতে দেখা যায়।

ভবনটির মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দিদারুল আলম। তার পরিবার থাকে হালিশহর জি ব্লকে। দিদারুল বলেন, ১৬ বছর আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে মোট ২২টি ইউনিট আছে। তার দাবি, ভবনের গ্যাস লাইনে কোনো ধরনের ধরনের ত্রুটি ছিল না। সব সময় তারা সেগুলো মেরামত করে রাখেন।

ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাটের ভাষ্য, বিস্ফোরণের শব্দ বিকট ছিল। মনে হচ্ছে ভবনসহ ভেঙে পড়ে যাবে। তিনি বলেন, মূল ফটকের পকেট গেট খুলে দিয়ে সেহেরি করে শুতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণের পর দেখি উপরের থেকে ওই ঘরের লোকজন নেমে আসছে। তাদের সবাই দগ্ধ হয়েছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং পাইপলাইন চালু হওয়ার আশা
পরবর্তী নিবন্ধরোজার মাহাত্ম্য অর্জনে সঠিক নিয়ম-পদ্ধতি জেনে নিতে হবে