সেই শিশুকে রাখা হতো বাথরুমে, খেত পেস্ট ও টিস্যু

বিমানের এমডির বাসায় নির্যাতন

| বুধবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানসহ চারজনের রিমান্ড শুনানিতে উঠে এল শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ভয়াবহ তথ্য। গতকাল মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানির একপর্যায়ে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন সেই গৃহকর্মীর জবানবন্দির কিছু অংশ পড়ে শোনান। সেই জবানবন্দিকে রোমহর্ষক বর্ণনা করে বিচারক বলেন, জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, পিঠে খুন্তি দেওয়া হত। চোখে দেওয়া হত মরিচের গুঁড়া। বাথরুমের মধ্যে রাখত। খাবার দিত না। পানির মধ্যে থাকার কারণে পায়ে পচন ধরে গেছে। পুরো শীতে শীতের পোশাক দেয়নি, খাবার দেয়নি। টয়লেটের পেস্ট, পানি খেয়ে থেকেছে। বাথরুম আর বাথরুমের আশেপাশে তাকে আটকে রাখত। খবর বিডিনিউজের।

বিচারক বলেন, জবানবন্দিতে উঠে এসেছে তার শরীরের মধ্যে মুখ থেকে গলা পর্যন্ত লম্বা পোড়া দাগ, যা এখন সাদা হয়ে আসছে। কপালে লাঠি দিয়ে মারার দাগ। হাতে বাঁশের লাঠির ও পোড়া দাগ আছে। দাগটি এখনো দগদগে। পায়ের উরুর অংশে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকার দাগ আছে। পিঠে বাঁশের লাঠি দিয়ে মারার অসংখ্য চিহ্ন আছে। চোখ দুটি ভেতরে ঢোকানো ও কালো দাগ। শরীরে জ্বর ও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা আছে। মাথার চুল ধরে টানার কারণে মাথা ব্যথার কথা বলেছে শিশুটি।

শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদে মঙ্গলবার রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই রোবেল মিয়া। মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে সাফিকুর ও রূপালী খাতুনকে পাঁচ দিনের রিমান্ড এবং বীথির সাতদিন ও অপর গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক।

গৃহকর্মী শিশুটিকে আইনি সহায়তা দেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ডিএমসি) ফাহমিদা আক্তার রিংকি। অর্ধশতাধিক আইনজীবী শিশুটিকে আইনি সহায়তায় আদালতে উপস্থিত হন। রিমান্ড শুনানিতে রিংকি বলেন, ভিকটিমের ওপর চার আসামি পাশবিক নির্যাতন করেছে। সাফিকুর রহমান কী কারণে নির্যাতন করেছে, তা জানার জন্য রিমান্ড প্রয়োজন। ১২ বছরের নিচে শিশুকে নির্যাতন করা অপরাধ। বীথি তাকে বাসায় রেখে নির্যাতন করেছে। প্রথমে তারা শিশুটিকে খাটে রাখত। পরে নিচে, এরপর বারান্দায়, পরে টয়লেটে রাখে। টয়লেটের পেস্ট, টিস্যু খেয়ে বেঁচে ছিল শিশুটি। শীতের মধ্যে শীতের কাপড়ও তাকে দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, একটা ঘরের মধ্যে শিশুটির সঙ্গে যে ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে, তারা (বাসার অন্য গৃহকর্মী) কাজের লোক হলেও বাইরে এসে প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। খুন্তি গরম করে তাকে ছ্যাঁকা দিত। সরকারি উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বাসায় এমন শিশু নির্যাতন দেশ ও জাতির জন্য লজ্জার। তাকে রোমহর্ষক নির্যাতন করা হয়েছে।

আসামিদের পক্ষে এ কে আজাদ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। এ আইনজীবী বলেন, সাফিকুর রহমান অফিস করতেন। সপ্তাহে মাত্র একটা দিন বাসায় থাকতেন। তিনি এ ঘটনার বিষয়ে অবগত না। তার রিমান্ড নামঞ্জুরের প্রার্থনা করছি। শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনায় তার হোটেল কর্মচারী বাবা গত ১ ফেব্রুয়ারি সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি, বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের নামে মামলা করেন। এরপর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ২ ফেব্রুয়ারি জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর ছোট শিশুদের দেখাশোনার জন্য ১১ বছরের আরেক শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে খুঁজে দেন। মেয়েটির বিয়েসহ যাবতীয় খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে তার হোটেল কর্মচারী বাবা গত বছরের জুন মাসে সাফিকুর রহমানের বাসায় তাকে পাঠান। সবশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় গিয়ে মেয়েকে দেখে আসেন বাবা। এরপর আর মেয়েটিকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

সেখানে বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি বিমানের এমডির স্ত্রী ফোন করে গৃহকর্মী মেয়েটির অসুস্থতার কথা বলে তাকে নিয়ে যেতে বলেন। পরে মেয়েটিকে আনতে গিয়ে শরীরে অমানবিক নির্যাতনের চিত্র দেখতে পান তার বাবা। পরে তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধধর্ষণ মামলায় হিরো আলমের বিরুদ্ধে পরোয়ানা
পরবর্তী নিবন্ধস্কুল-কলেজের এমপিওভুক্তি কার্যক্রম স্থগিত