সূর্য সেন : বিপ্লবের অবিনাশী নাম

শাহিদা জাহান | সোমবার , ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ

সূর্য সেন বিপ্লবের নৈতিকতা, রাষ্ট্রবোধ ও অবিনাশী নাম। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সূর্য সেনযিনি সকলের কাছে ‘মাস্টারদা’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি কেবল একজন সশস্ত্র বিপ্লবী নন, তিনি ছিলেন একটি দর্শন, একটি রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং একটি বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক। ইতিহাস দীর্ঘদিন তাঁকে প্রান্তে ঠেলে রেখেছে, নানান রকম আখ্যায়িত করে। কিন্তু সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে গভীর বিশ্লেষণে আজ সুস্পষ্টসূর্য সেন ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা নিজের সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করেছিলেন।

ইতিহাস সব সময় ন্যায়ের পক্ষে কথা বলে না। অনেক সময় সে ক্ষমতার ভাষায় লেখা হয়। তাই কিছু নাম উজ্জ্বল থাকে, আর কিছু নাম ইচ্ছাকৃতভাবে ছায়ায় ঠেলে দেওয়া হয়। সূর্য সেনও তেমনই এক নাম, যাঁকে ইতিহাস দীর্ঘদিন প্রান্তে আটকে রেখেছে। তাঁকে কখনো ‘চরমপন্থী’ কখনো ‘অতিসাহসী, আবার কখনো ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে খাটো করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো সরিয়ে আজ যখন আমরা গভীরভাবে তাকাই, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সূর্য সেন কেবল একজন বিপ্লবী নন, তিনি ছিলেন রাষ্ট্রচিন্তার এক বিকল্প পথের রূপকার।

একজন শিক্ষক কীভাবে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন, এই প্রশ্নের উত্তর সূর্য সেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিপ্লব আসে কেবল অস্ত্র হাতে নয়,বিপ্লব আসে চেতনায়, নৈতিক দৃঢ়তায় এবং আত্মত্যাগে। ব্রিটিশ শাসনের অন্ধকার সময়ে তিনি যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা নিভে যায়নি, নিভে যাবে না কখনো। বরং সময়ের সঙ্গে আরও তীক্ষ্‌ণ হয়ে আজও আমাদের প্রশ্ন করে, অন্যায়ের মুখে আমরা কোথায় দাঁড়াই। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, সূর্য সেনের বিপ্লব শুধু আবেগনির্ভর নয়,বরং তা ছিল সুপরিকল্পিত, নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সুসংহত এক প্রতিবাদী অগ্নিমশাল।

১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ শাসিত বাংলার চট্টগ্রামে সূর্য সেনের জন্ম। পেশায় শিক্ষক হওয়ায় সবাই তাঁকে ‘মাস্টারদা’ নামে ডাকতেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধের এক অসাধারণ রূপকার। তিনি কখনোই শিক্ষাকে কেবল জীবিকার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখানো, ভয়ের শিকল ভাঙা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই তিনি তরুণ সমাজকে প্রস্তুত করেছিলেন শুধু পরীক্ষার খাতার জন্য নয়, ইতিহাসের পরীক্ষার জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে তা মূল্যহীন। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।

বিশ শতকের শুরুতে ভারত ছিল রাজনৈতিকভাবে অধিকারহীন, অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব এবং সাংস্কৃতিকভাবে অবদমিত একটি উপনিবেশ। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা আইন, প্রশাসন ও সেনাশক্তির মাধ্যমে একটি ভয়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল। এই বাস্তবতায় সূর্য সেন উপলব্ধি করেন,আবেদন, প্রস্তাব বা সীমিত প্রতিবাদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে নড়াতে পারবে না। তাই তিনি বেছে নেন বিপ্লবী পথ।

এই বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল শাসকের মনে ভয় সৃষ্টি করা নয়, বরং শাসিত মানুষের মনে সাহস সঞ্চার করা। সূর্য সেনের বিপ্লবী দর্শন সহিংসতা নয়, প্রতিরোধ। অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন, তিনি সহিংসতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। বাস্তবে তিনি সহিংসতাকে লক্ষ্য নয়, বরং পরিস্থিতির অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতেন। তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের বলতেন, আমরা অস্ত্র নিয়েছি মানুষ মারার জন্য নয়, মানুষকে জাগানোর জন্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাস্তবতা ছিল নির্মম ও নিষ্ঠুর। একদিকে অর্থনৈতিক লুটপাট, অন্যদিকে প্রশাসনিক দমন, যেখানে আইন ছিল শাসকের ঢাল, আর বিচার ছিল নিপীড়নের মুখোশ। এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের সাংবিধানিক আন্দোলন, আবেদননিবেদন কিংবা ধীর সংস্কারবাদ সূর্য সেনের কাছে অপর্যাপ্ত মনে হয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন,যে রাষ্ট্র বন্দুকের নলের ওপর দাঁড়িয়ে, তাকে কেবল নৈতিক অনুরোধ দিয়ে উৎখাত করা যায় না।

এখানে একটি ঐতিহাসিক সত্য স্পষ্ট করা জরুরি, সূর্য সেন সহিংসতাকে কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাঁর বিপ্লব ছিল প্রতিহিংসার নয়, প্রতিরোধের রাজনীতি। মানুষের মনে জমে থাকা ভয় ভেঙে দেওয়া এবং শাসকের অজেয়তার মিথকে চূর্ণ করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে নিছক ‘বোমাবন্দুকের বিপ্লবী’ নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও নৈতিক বিপ্লবীতে রূপ দেয়।

এই দর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের মাধ্যমে। সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ব্রিটিশ অস্ত্রাগার দখল করেন, টেলিগ্রাফ ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং সাময়িকভাবে ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে অচল করে দেন। সামরিক দৃষ্টিতে এই অভিযান দীর্ঘস্থায়ী ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

এই অভিযানের ফলে ব্রিটিশ প্রশাসনের অজেয় ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে, উপমহাদেশের তরুণ সমাজ নতুন অনুপ্রেরণা পায়, স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন বিপ্লবী ভাষা যুক্ত হয়। এটি প্রমাণ করে, একটি ছোট, সংগঠিত গোষ্ঠীও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।

সূর্য সেনের আন্দোলনের আরেকটি যুগান্তকারী দিক ছিল নারী ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের মতো নারীরা কেবল সহযোগী ছিলেন না, ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। এটি ছিল শুধু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নয়, একই সঙ্গে উপনিবেশিক সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও এক সাহসী বিদ্রোহ। সূর্য সেন বিশ্বাস করতেন, যে সংগ্রামে নারী নেই, সে সংগ্রাম কখনো পূর্ণ হতে পারে না।

১৯৩৩ সালে সূর্য সেন গ্রেফতার হন। কারাগারে তাঁর ওপর চালানো হয় অকথ্য ও নির্মম নির্যাতন। ইতিহাস বলে, তাঁর শরীর ভাঙার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর আদর্শ এক বিন্দুও নড়েনি। অবশেষে ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি ছিলেন নীরব, অবিচল ও দৃঢ়, যেন মৃত্যুকেও আদর্শের কাছে পরাজিত করতে প্রস্তুত।

নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে স্বীকার করতেই হয়, সূর্য সেনের বিপ্লব দীর্ঘমেয়াদে একটি কেন্দ্রীভূত জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিতে পারেনি। ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল বহুগুণ শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তাঁর আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমায় না। বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি কতটা অসম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলেন।

আজকের সময়ে সূর্য সেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যখন রাজনীতি আপস, সুবিধাবাদ ও নৈতিক শূন্যতায় আক্রান্ত, তখন তিনি আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, আমরা কি সত্যিই আদর্শের মূল্য দিতে প্রস্তুত? তিনি মনে করিয়ে দেন স্বাধীনতা মানে কেবল শাসক বদল নয়, চিন্তার মুক্তি ক্ষমতা দখল নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা।

সূর্য সেন ইতিহাসের পাতায় বন্দী কোনো নাম নন। তিনি এক অবিনাশী চেতনা। যে চেতনা শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা অপরাধ। যে চেতনা বলে, বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হয় না, সময় নেয় মাত্র।

একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে সেই মানুষদের স্মরণ করেই, যারা জীবনের বিনিময়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সূর্য সেন সেই সাহস, সেই নৈতিক দৃঢ়তা এবং সেই আত্মত্যাগেরই এক উজ্জ্বল, অমলিন নাম।

লেখক : শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষা ও আমাদের শিক্ষার্থীরা
পরবর্তী নিবন্ধসমাজ ও মানুষ গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন