সুসময়ে চলে গেলেন মা-মাটির নেত্রী

‘এমন সাহসী নেত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে আবার আসবে কি না জানি না’

| বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদ শুনে তার জানাজায় অংশ নিতে গতকাল সকালে ১৩ জন মিলে মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঢাকায় আসেন নেত্রকোণা সদর উপজেলার আব্দুল্লাহ, সাইফুল ও মনির মিয়া। তাদের মত বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ভিড়ে বুধবার দুপুরে মানিক মিয়া এভিনিউ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিএনপির কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এসেছিলেন প্রিয় নেত্রীর জানাজায় যোগ দিতে।

গত বছরে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরা আব্দুল্লাহ বলেন, আমার বয়স তিরিশ বছর, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তার পুরোটা সময় দেখছি খালেদা জিয়া লড়াই সংগ্রাম করেছেন, তার উপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। এতকিছুর পরও তার মুখ থেকে কখনো খারাপ কথা শুনি নাই। এই গুণ দেখে আমি বিএনপি সমর্থন করি। গত বছরের জুলাইয়ের পর তো সবাই কথা বলতে পারছে। আমি পারছি, আপনি পারতাছেন। এখন তো সুসময় ছিল তার, সুসময়ে তিনি চলে গেলেন। হায়াতমউত তো আর বাইন্দা রাখা যাবে না। খবর বিডিনিউজের।

দল বেঁধে আসা ১৩ জনের কেউ বিএনপি বা দলটির কোনো অঙ্গ সংগঠনের কর্মী বা সদস্য নন। দলীয় পদ পদবীও নেই। ঢাকায় আসতে গাড়ি ভাড়ার টাকা ১৩ জনই সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। কারো কাছ থেকে চাঁদা বা অনুদান নেননি জানিয়ে মনির মিয়া বলেন, আমি গেরস্ত (গৃহস্থ) মানুষ। আমাগো তো টাকা কম। সবাই মিলে টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া দিয়েছি। সকাল ৭টায় নেত্রকোণা সদর থেকে রওয়ানা দিয়ে চার ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছান তারা।

এই দলের সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, দ্যাশের জন্য তার (খালেদা জিয়া) যে টান, তা বলে বুঝানো যাবে না। একজন ভালো নেত্রী ছিলেন, দ্যাশের জন্য জীবন দিয়ে দিলতবুও বিদেশে গিয়ে থাকলেন না। তার একটা ভিডিও মারা যাওয়ার পর থেকে বার বার দেখি। তিনি বলেছেন, তার বিদেশে কোনো ঠিকানা নেই, দ্যাশেই সব। তার মতো কেউ (রাজনীতিবিদ) তো দ্যাশকে ভালোবাসলো না। তার জানাজায় আসতে আজকে কামাই দিলাম (কাজে যাননি)

সেনা জীবন থেকে ক্যাপ্টেন পদবী নিয়ে অবসরে যাওয়া দিলদার হোসেন ঢাকার শাহীনবাগে থাকেন। জানাজায় আসার কারণ জানতে চাইলে বললেন, খালেদা জিয়া আমার চেয়ে বছর দুয়েক বড়। আমার জন্ম ১৯৪৭ সালে তার (খালেদা জিয়া) ১৯৪৫ সালে। আমিও সেই পথেই (মৃত্যুর পথে) যাবো। এজন্য তার জন্য দোয়া করতে আসলাম। শহীদ জিয়া দেশপ্রেমিক ছিলেন, তিনিও (খালেদা জিয়া) দেশের জন্য কাজ করেছেন রাজনীতিতে। তার জন্য দোয়া করাটা উচিত।

রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার রবিউল হক জানাজা শেষে বলেন, ঢাকায় থাকি, জীবনেও তার (খালেদা জিয়া) মুখ থেকে কোনো কটু কথা শুনিনি। জীবন চলে যায়যায়, তবু দেশের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করেননি, যারা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। তার মত নেত্রী অনেক লাগবে আমাদের। কিন্তু একজনই পেলাম। তিনি মারা যাওয়ায় দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। এখন দেশের যে কী হবে?

খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে পাবনা থেকে ঢাকায় এসেছেন তরুণ আব্দুল ওয়াহাব। খামার বাড়ি মোড়ে তিনি বললেন, খালেদা জিয়া হলেন মামাটি ও দেশের নেত্রী। তাকে ভালোবেসে দল করি। নিজের টাকা খরচ করে ঢাকায় আসছি সকালে। জানাজা পড়তে ঢাকায় এসেই সংসদের গেটে গেছি। আমি যখন যাই তখনো গেট খোলেনি। খোলার পর প্রথম যারা ঢুকেছে, আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। আমি যুবদলের সদস্য, কোনো পদে বা কমিটিতে নাই, কোনো পদ লাগবেও না। এখন বিএনপি তার মত (খালেদা জিয়া) চললে আজীবন সমর্থন দেব।

খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ মনোভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশেও দেশ ছেড়ে না যাওয়ার বিষয়টিকে অনেক বড় ঘটনা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী জোবায়ের হোসেন। রাজধানীর বঙ্গবাজার থেকে জানাজায় অংশ নিতে ফার্মগেইট আসার পর আর সামনে যেতে পারেননি। অন্যদের সঙ্গে কাতার বেঁধে তেজগাঁও সরকারি কালেজের সামনে দাঁড়িয়ে জানাজার নামাজ পড়েন। জোবায়ের বলেন, আমি তো ঢাকায় থাকি। কোনো দল করি না, কাজ করি, খাই। খালেদা জিয়ার উপর কত যে অত্যাচার হইছে তা তো টিভিমিডিয়াতে দেখছি। সে তো কারো সঙ্গে আপস করে নাই। তার মত ভালো নেত্রীর জানাজায় আসতে পারা সৌভাগ্য বলে মনে করি।

শুধু জানাজায় অংশ নিতেই বাসা থেকে বেরিয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মোহাম্মদ টিটু মুন্সি। তিনি বলেন, বিভিন্ন অফিসে ইলেকট্রিক মাল সপ্লাইয়ের কাজ করি। সরকারি বন্ধ পাইলে সারাটা দিন বাসায় রেস্ট (বিশ্রাম) নেই। কিন্তু খালেদা জিয়ার জানাজায় না আসলে নিজেরে বেঈমান মনে হত। তিনি দেশের জন্য কত কাজ করলেন, আর আমি ঢাকায় থাইক্কা তার জানাজায় আসুম না? এইটা হয় না।

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ফারুক আহমেদ ও শ্যামল কুমার বলেন, এমন দেশপ্রেমিক ও সাহসী নেত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে আবার আসবে কি না জানি না। প্রিয় নেত্রীর শেষ বিদায় জানাতেই এখানে এসেছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচান্দগাঁওয়ে পিস্তলসহ দুই যুবক গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধকক্সবাজারে ধর্ষণের অপমানে কিশোরীর আত্মহত্যা, নারী গ্রেপ্তার