সুযোগ, ঝুঁকি এবং বাংলাদেশি বাস্তবতা

ইমতিয়াজ জিহাদ | শনিবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ভাষা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যেই জায়গায় কয়েক বছর আগেও কনটেন্ট পরিকল্পনা, গ্রাহক বিশ্লেষণ কিংবা বিজ্ঞাপনের কপি লেখা ছিল সম্পূর্ণ মানুষের উপর নির্ভরশীল, সেখানে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নীরবে কিন্তু গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। বিশ্বজুড়ে মার্কেটিং শিল্পে এআই এখন আর ভবিষ্যতের ধারণা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?

HubSpotএর সামপ্রতিক গ্লোবাল মার্কেটিং রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ মার্কেটার কোনো না কোনোভাবে AI ব্যবহার করছে। Social Media Todayএর বিশ্লেষণ বলছে, AI ব্যবহারের ফলে কনটেন্ট আইডিয়েশন, ক্যাম্পেইন পরিকল্পনা এবং পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে সময় সাশ্রয় হচ্ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অনেক প্রতিষ্ঠান কনটেন্ট প্রোডাকশনে সময় কমাতে পারছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ AI এখন কেবল পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়; এটি কার্যকর ব্যবসায়িক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশেও এসে লেগেছে, তবে তার প্রয়োগ ও প্রভাব এখনো অসম এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত।

বাংলাদেশের ডিজিটাল বাস্তবতা বুঝতে হলে সামপ্রতিক তথ্যের দিকে তাকানো জরুরি। We Are Socialএর Digital 2026: Bangladesh রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬৩ মিলিয়নের কাছাকাছি। এই বিশাল ডিজিটাল জনসংখ্যা মার্কেটিংয়ের জন্য একদিকে যেমন বড় সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়িয়েছে প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার মাঝেই এআই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের অনেক ব্র্যান্ড এবং এসএমই ইতোমধ্যে এআইভিত্তিক টুল ব্যবহার শুরু করেছে। কনটেন্ট আইডিয়া তৈরি, পোস্ট লেখার খসড়া, বিজ্ঞাপনের কপি, এমনকি গ্রাহক সেবায় চ্যাটবট, সবখানেই এআইয়ের উপস্থিতি বাড়ছে। এতে সময় বাঁচছে, খরচ কমছে, এবং সীমিত জনবল দিয়েই তুলনামূলক বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সুবিধা।

তবে এই সুবিধার আড়ালে কিছু মৌলিক ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে, যেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। Social Media Todayতে প্রকাশিত একাধিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই যদি কেবল শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে কনটেন্টের গুণগত মান, ব্র্যান্ডের স্বকীয়তা এবং গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশি বাস্তবতায় এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি।

কারণ আমাদের দেশের অনেক ব্র্যান্ড এখনো ডিজিটাল মার্কেটিংকে একটি যান্ত্রিক কাজ হিসেবে দেখে। সেখানে এআই যুক্ত হওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে। একই ধরনের কনটেন্ট, একই ভাষা, একই ভিজ্যুয়াল, সব ব্র্যান্ড যেন একে অপরের প্রতিচ্ছবি। এআইয়ের তৈরি কনটেন্ট যদি ব্র্যান্ডের নিজস্ব কণ্ঠস্বর, মূল্যবোধ এবং প্রেক্ষাপট বুঝে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে সেটি ব্র্যান্ডকে আলাদা করার বদলে আরও সাধারণ করে তোলে।

এআইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ডেটা বিশ্লেষণ। HubSpotএর রিপোর্ট অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করে গ্রাহকের আচরণ, পছন্দ এবং সিদ্ধান্তের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করলে মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মৌলিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। সেই সাথে বাংলাদেশে এখনো সেভাবে সোশ্যাল লিসনিং টুলস এর ব্যবহার ও সেভাবে বাড়েনি, ফলে এআই ব্যবহার করা হলেও সেটি হয় অনুমানের উপর, নয়তো অর্ধেক বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় কন্টেন্ট।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষতার অভাব। এআই কোনো ম্যাজিক টুল নয়, যেটি চালু করলেই ফল পাওয়া যাবে। এটি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বোঝা, ডেটা রিডিংয়ের সক্ষমতা এবং কনটেক্সটের গভীর ধারণা। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক এসএমই এবং এমনকি কিছু বড় প্রতিষ্ঠানও এই জায়গায় পিছিয়ে। ফলে তারা হয় এআইকে অতিরিক্ত নির্ভরতার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, নয়তো একেবারেই ভুলভাবে প্রয়োগ করছে।

গ্রাহক আস্থার প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট যদি অতিরিক্ত যান্ত্রিক হয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মানবিক ছোঁয়া না থাকে, তাহলে গ্রাহক দ্রুত সেটি বুঝে ফেলে। অনলাইনে আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে, কিন্তু নষ্ট হতে সময় লাগে না। ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর বার্তা বা অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলে সেই আস্থা ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের ডিজিটাল বাজারে যেখানে ইতোমধ্যে বিশ্বাসের সংকট রয়েছে, সেখানে এআই ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এআইয়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে। Social Media Todayএ প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভবিষ্যতের মার্কেটিং টিমে কাজের ধরন বদলে যাবে। কপি লেখা, ডিজাইন বা বেসিক অ্যানালিটিক্সের মতো কাজগুলোতে এআই সহায়ক ভূমিকা নেবে। এতে কিছু কাজের প্রয়োজন কমবে, আবার নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে। বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি এখনো খুব সীমিত।

বিশেষ করে তরুণ মার্কেটারদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু টুল ব্যবহার জানলেই হবে না; জানতে হবে কিভাবে এআইকে স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এআইকে সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়, বরং সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করার সহায়ক হিসেবে দেখতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির অভাব থাকলে ভবিষ্যতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি আরও প্রকট হবে।

সরকারি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এআই নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। Digital 2026: Bangladesh রিপোর্টে যেমন ডিজিটাল প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, তেমনি সতর্ক করা হয়েছে ডিজিটাল বৈষম্যের দিকেও। এআই যদি কেবল বড় ব্র্যান্ড ও শহরকেন্দ্রিক ব্যবসার হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে গ্রামাঞ্চল, প্রান্তিক উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা আরও পিছিয়ে পড়বে। এই বৈষম্য কমাতে হলে প্রশিক্ষণ, নীতিমালা এবং অ্যাক্সেস, তিনটি জায়গাতেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য এআই ইন মার্কেটিং একদিকে বড় সুযোগ, অন্যদিকে বড় পরীক্ষা। সুযোগ এই অর্থে যে, সীমিত রিসোর্স দিয়েই আন্তর্জাতিক মানের কাজ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরীক্ষা এই অর্থে যে, আমরা কি এটিকে বুঝে, দায়িত্বশীলভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারছি কিনা।

দিনের শেষে এআই কোনো বিকল্প নয় মানুষের জন্য। এটি একটি টুল। যে টুলটি সঠিক হাতে পড়লে শক্তি বাড়ায়, আর ভুল হাতে পড়লে ক্ষতি ডেকে আনে। বাংলাদেশের মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এই টুলকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে, প্রেক্ষাপট, নৈতিকতা এবং কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহার করা।

এআই যদি ব্র্যান্ডের কণ্ঠস্বর, গ্রাহকের বাস্তবতা এবং দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিংকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। আর যদি কেবল ট্রেন্ডের পেছনে ছুটে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এই প্রযুক্তিই হয়ে উঠতে পারে বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতার উৎস।

এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রির সামনে প্রশ্ন একটাই, আমরা কি এআইকে নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি এআই আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করবে? ভবিষ্যৎ সেই উত্তরেই নির্ভর করছে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক; লীড বাংলাদেশ লিঃ, চীফ ক্রিয়েটিভ অফিসার ও প্রতিষ্ঠাতা; লীড মার্কেটিং ইনকর্পোরেশন; কানাডা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএখন প্রয়োজন নালা খালগুলোর নাব্যতা বাড়ানো
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে