
এই মহিয়সি নারীর সাথে আমার প্রথম দেখা ফুলকিতে মহিলা পরিষদের সম্মেলনে। সম্ভবত ৮৮/ ৮৯ সালে। তিনি চট্টগ্রাম মহিলা পরিষদের সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। আমি তখন পূর্বকোণ এ সাংবাদিকতা করছি। আমাকে নিউজটি করার জন্য এসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন তৎকালীন চিফ রিপোর্টার বেলাল ভাই। চট্টগ্রামে মহিলা পরিষদের সভাপতি ছিলেন আমার ননাস বেগম উমরতুল ফজল। বিকেলে প্রোগ্রাম, আমি সকালে মর্নিং শিফটে কাজ শেষ করে বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিকেলে ফুলকির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। পুরনো ফুলকির বেড়ার ঘরে ছোট্ট একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মহিলা পরিষদের সদস্যরা ছাড়াও সেদিন নানা পেশার নারী পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। আমি নিউজ করলাম। আমার সাথে ফটোগ্রাফার ছিলেন রূপম চক্রবর্তী।
নিউজ শেষ করে আমি চলে আসার সময় আমাকে ডেইজী ডেইজী করে ডাকতে লাগলেন উমরতুল আপা। বলেন, এদিকে এসো, তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিই। আমি কাছে গেলে উনি তার সহজাত বিনয় আর স্নেহের সুরে বলেন, ফুফু ওর নাম ডেইজী মউদুদ, সে সাংবাদিক , আমার চাচা ওহীদুল আলমের পুত্র মউদুদের বউ। তিনি আমায় বুকে টেনে নিলেন, বলেন, তুই ওহীদ ভাইয়ের ছেলের বউ সাংবাদিকতা করিস, ঢাকায় গেলে আমার সাথে দেখা করবি। আর ওহীদ ভাই আর ভাবীকে আমার সালাম দিস। আবার উমরতুল আপা রূপমকে ডেকে ছবি তুলতে বলেন। একটি ছবি তুললো মাঝখানে আমি আর আমার দুপাশে দেশবরেণ্য দুই নারী নেত্রী। আমিতো সন্ধ্যায় অফিসে গিয়ে রিপোর্ট জমা দিয়ে চলে আসি, পরের দিন নিউজ ছাপা হলো, কিন্তু আমাদের পূর্বকোণে তখন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন শিশির দা। তিনি আমাকে বললেন তোমার সাথে উনার কথোপথন, আলাপচারিতা আর তোমার অনুভূতি নিয়ে একটা লেখা আমাকে কালই দাও। আমি তখন বয়সে নবীন, সাংবাদিকতার বয়স ও হয়তো বছর পাঁচেক হবে। তখন কম্পিউটারের যুগ না, হাতে লিখতে হতো। আমি বাসায় এসে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে একটি ফিচার লিখে শিশির দাকে দিলাম। দেখি তিনি রূপম থেকে আমি, সুফিয়া কামাল আর উমরতুল ফজলের ছবিটা দিয়ে ফিচারটি কি সুন্দর করে ছাপলেন।
সাদাকালো ছবির যুগ। তারপরেও কী সুন্দর! কৃতজ্ঞতা আর খুশিতে আমার মন ভরে গিয়েছিল সেদিনের যে পরিচয় আর আত্মীয়তার বন্ধনে আমি তাঁর সাথে আবদ্ধ হয়েছিলাম, তা অটুট ছিল দীর্ঘসময় পর্যন্ত। আমি যখনই আমার মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছি, ততবারই ঢু মারতাম তাঁর ধানমণ্ডির সাাঁঝের মায়ার বাড়িতে। কী সুন্দর আর পরিপাটি ছিল বাড়িটি। ভীষণ আর্টিস্টিক, মায়া আর মমতায় জড়ানো। তাঁর ‘পল্লী স্মৃতি’ কবিতাটির মতোই। ‘বহুদিন পড়ে মনে পড়ে আজি পল্লী মায়ের কোল/ ঝাউশাখে যেথা বনলতা বাঁধি হরষে খেয়েছি দোল / কুলের কাঁটার আঘাত সহিয়া কাঁচা পাকা কুল খেয়ে/ অমৃতের স্বাদ যেন লভিয়াছি গাঁয়ের দুলালী মেয়ে/ চৈত্র নিশীথে চাঁদিমায় বসি শুনিয়াছি রূপকথা/ মনে বাজিয়াছে শুয়ো দুয়ো রাণী দুখিনী মায়ের ব্যথা/ তবু বলিয়াছি মার গলা ধরে মাগো সেই কথা বল/ রাজার ছেলেরে পাষাণ করিতে ডাইনী করে কি ছল? কবিতাটা মুখস্থ ছিল বলে কয়েক চরণই লিখে ফেললাম। স্কুলে পাঠ্যপুস্তকে যার কবিতা পড়ে পড়ে বড় হয়েছি, তাঁকে বড় হয়ে এসে এতো কাছে পাবো কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। যতো বড় হয়েছি, ততই পাঠ করেছি তার কবিতা। রীতিমতো মুখস্থ করে ফেলতাম। ‘আজিকার শিশু ’কবিতাটি তো কোনোদিনই ভুলবোনা। ‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা/ তোমরা এখন সে বয়সে লেখাপড়া কর মেলা/ আমরা যখন আকাশের তলে উডায়েছি শুধু ঘুড়ি/ তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগণ জুড়ি/ চাঁদ সেতারার কিসসা শুনিয়া ঘুমিয়েছি মোরা সবে/ মেরুতে মেরুতে জানা পরিচয় কেমন করিয়া হবে। এসব কবিতা একটি কালের চিত্র আমাদের চোখের সামনে ছবির ক্যানভাসের মতোই ভেসে উঠে।
সাংবাদিকতার সাথে লেখালেখি জড়িত ওতোপ্রোতোভাবে। তাই প্রতি বছরেই এই মহিয়সির জন্মদিন এলেই আমার একটা প্রতিবেদন লেখা যেন অনিবার্য হয়ে হয়ে পড়তো। তবে ডেস্কে কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। তখন কম্পিউটার এর যুগ না, হাতে লিখতে হতো। আবার অবাধ তথ্য প্রবাহ ছিল না। তাই লাইব্রেরিই ছিল একমাত্র ভরসা। আমাদের পূর্বকোণ অফিসে লাইব্রেরি ছিল। সেখানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা আর প্রচুর বই ছিল। আমি অফিসের কাজ শেষ করে লাইব্রেরিতে বসে পুরনো পত্রপত্রিকা পড়তাম, আর বিভিন্ন বই পত্র পড়ে একটি ফিচার তৈরি করে ফেলতাম। আর যেদিন তিনি মারা গেলেন, সেদিন তো বিশাল করে লিখতে হলো প্রথম পাতায়। অবশ্য পড়ে সাহিত্য পাতা বের হলো তাঁর ম্মরণে। সেদিন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখার শিরোনাম টা আমার এখনো মনে আছে, তিনি লিখেছিলেন, সুফিয়া কামাল শতাব্দীর সাহসিকা। শতাব্দীর শেষ সূর্য এবং একুশ শতকের প্রথম সূর্যটি তিনি দেখে যেতে পারলেন না।
আজ ২০ জুন শতাব্দীর এই সাহসিকার ১১২ তম জন্মদিবস। দিবসটিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেই এই লেখার অবতারণা। বিংশ শতাব্দীর বাংলার নারী জাগরণ ও আন্দোলন সংগ্রামের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে সুফিয়া কামালের নাম গভীরভাবে জড়িত। এই শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে শেষ দশক পর্যন্ত প্রায় শতাব্দীকাল তাঁর জীবন অত্যন্ত ঘটনাবহুল। সুফিয়া কামলের জন্ম ১৩১৮ সনের ১০ আষাঢ় ( ২০ জুন ১৯১১) শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আবদুল বারী আর মায়ের নাম নবাবজাদী সৈয়দা সাবেরা খাতুন। সুফিয়া কামাালের জীবন সংগ্রামের জীবন। তিনি যখন মাতৃকোলে একেবারে শিশু, তখন তাঁর পিতা নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তখন তাঁর মা সন্তানদের নিয়ে পিত্রালয়ে চলে আসেন। মাতুলালয়ে প্রচুর বিলাস বৈভব, আদব কায়দা ও কঠোর রক্ষণশীল পরিবেশে তিনি লালিত হন। সে সময় মুসলিম পরিবারে মেয়েদের জন্য অনেক কিছুই নিষিদ্ধ ছিল। একবারেই সীমিত ছিল মেয়েদের বেড়ে ওঠার জগৎ। আর নারী শিক্ষা সে তো কঠোর থেকে কঠোর শৃঙ্খলে বন্দী। এই কঠোর ও সীমাবদ্ধ আগল ভেঙেই বেরিয়ে এসেছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা তিনি পাননি।
বড় মামার এক বিশাল লাইব্রেরিই ছিল তাঁর পাঠশালা, আর তাকে সহযোগিতা করেছেন তার মা। বাড়িতে উর্দু ভাষার প্রচলন থাকলেও মা বাংলা জানতেন। মায়ের কাছেই তিনি বাংলা শেখেন। মামী আর খালাদের কাছ থেকে মেঘদূত, রত্নদ্বীপ, আরবী, উর্দু আর ফার্সি গল্প শুনে বিশেষ করে সে সময়কার পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বেগম রোকেয়া আর সারা তৈফুরের লেখা পড়ে তাঁর চেতনায় সাহিত্য অনুরাগের সঞ্চার হয়। শুরুতেই কোনো দাড়ি, কমা ছাড়াই কবিতা ও গল্প লিখে ফেলেন। এই লেখায় নবাব বাড়ির মিলাদের ও গজলের সুর, পাইক পেয়াদাদের জারি সারি গান আর পুঁথি পাঠের সুর মূর্ছনার প্রভাব ছিল। তাঁর বিয়ে হয় বারো বছর বয়সে, ষোল বছর বয়সি মামাতো ভাই নেহাল হোসেনের সাথে। নেহাল হোসেন এর সাথে তিনি বরিশালে চলে আসলে সেখানে বিপ্লবী অশ্বিনী দত্তের ভাই ‘তরুণ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন। স্বামী নেহাল হোসেন ওই পত্রিকার সাথে যুক্ত থাকায় সুফিয়া কামালের প্রথম লেখা এই পত্রিকায় ছাপা হলে তাঁকে পরিবার থেকে নানা গঞ্জনা শুনতে হয়। পরে তারা কলকাতায় চলে এলে সাহিত্য সমাজের সাথে পরিচিতি ঘটে। ক্রমে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। ১৯৩২ সালে তাঁর স্বামী নেহাল হোসেন মারা গেলে পারিবারিক অসহযোগিতায় তিনি এক কন্যা সন্তানকে সাথে নিয়ে বিধবা মায়ের হাত ধরেই বাড়ি ত্যাগ করেন। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতার কাজ নেন। পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা অব্যাহত রাখেন। দিনের বেলা সময় পেতেন না, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নিশ্চিন্ত অবসরে রাতে এই নিভৃতচারিণী লেখিকা সুফিয়া কামাল যুগপৎ বিশ্বভূবনের আঙিনায় নিজের জায়গা করে নিলেন। সাহিত্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে কাজী নজরুল ইসলাম এবং সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীনের অবদান অনস্বীকার্য।
কবি কাজী নজরুল ইসলামই তাকে সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন যা, উনার জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নাসির উদ্দীন সুফিয়া কামালের মাঝে কেবল কাব্যসত্তা আবিষ্কার করেন নি, তিনি সওগাত এর মহিলা সংখ্যায় তাঁর একটি ছবিও ছেপে দেন। সে সময় এটি ছিল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। তাঁর প্রথম কবিতা ‘বর্ষা’ আর গল্প ‘সৈনিক বধূ’। লেখাগুলো তাঁর যখন সাত / আট বছর , সে সময়ে লেখা। কিন্তু ছাপা হয় তাঁর বিয়ের পরে। ১৯২৬ সনে সওগাত পত্রিকায় প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী ’ ছাপা হয়। প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সনে। কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সনে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো সাঁঝের মায়া, একাত্তরের ডায়েরি, মায়াকাজল, উদাত্ত পৃথিবী, ইতল বিতল, কেয়ার কাঁটা, সোভিয়েতে দিনগুলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটলে তিনি কবির জন্মদিনে একটি কবিতা লিখে পাঠান। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেন: ‘তোমার কবিত্বশক্তি আমায় বিস্মিত করে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং নিশ্চিত তোমার প্রতিষ্ঠা’। কবির আশির্বাণী সত্যি হয়েছিল। ১৯৩৯ সনে চট্টগ্রামের কামালউদ্দীনের সাথে তাঁর বিয়ে হলে তিনি সুফিয়া কামাল নামেই পরিচিতি পান। প্রগতিশীল স্বামীর সহযোগিতা এবং উৎসাহে তিনি সমাজ আন্দোলনে ব্রতী হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ৪৬ এর দাঙ্গা এবং ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন। ১৯৭০ সনে তিনি মহিলা পরিষদ গঠন করেন। ৭১ সনে ঐতিহাসিক আন্দোলনে মহিলাদের সমাবেশে ও মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ঢাকা শহরে অবরুদ্ধ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন।
তাঁর পরিবারের সকল সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম বাঙালি মুসলিম মহিলা যিনি বিমানে উড্ডয়ন করেছিলেন। দেশে মৌলবাদ বিরোধী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজ নারী সমাজ এগিয়ে আসার পেছনে তিনিই ছিলেন অগ্রপথিক। সুফিয়া কামাল দেশি বিদেশি মোট ৪০ টি পদক পেয়েছেন। ১৯৭৬ সনে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লেখিকা পুরস্কার ১৯৭০, ১৯৯৬ তে বেগম রোকেয়া পদক। ১৯৯৯ সনে নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা জাতীয় পর্যায়ে নারীদের জন্য বই মেলা ও নারী সমাবেশের আয়োজন করে। এই মেলা সুফিয়া কামালকে উৎসর্গ করা হয়। সুফিয়া কামাল নিজ হাতে এই মেলায় একটি বাণী লিখে দিয়েছিলেন ২৫ অক্টোবর। এটিই ছিল তাঁর জীবদ্দশায় শেষ বাণী। ১৯৯৯ সনের ২৯ নভেম্বর তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে কেবল নারী সমাজের নয়, দেশের বিভিন্ন সংকট আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র যেন খসে পড়েছিল।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক











