‘ঘুরে এলাম কতো দেখে এলাম/ পশুর নদীর জলে প্রাণ ভাসালাম’ –সুন্দর প্রাণীর আবাস সুন্দরবনে বনবিভাগের পর্যটন কেন্দ্রে একদিন। ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ সাল। আমার স্বামীর বন্ধু (ওরা দুজনেই বন বিভাগের রিটায়ার্ড অফিসার) কুদ্দুস ভাই এর সোনাডাঙা আবাসিকের বাড়ি থেকে মংলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম সকাল সাতটায়। খুব অল্প সময়ে পশুর নদীর তীরে মংলা বন্দর ঘাটে বনবিভাগের বিশ্রামাগারে পৌঁছে গেলাম। কিছু সময় পার করে সেখানে সবার সাথে পরিচয় পর্ব, ছবি তোলা, চা–নাস্তার আপ্যায়ন শেষে তাদের ঘাট থেকে বোটে করে যাত্রা শুরু করলাম। আহ্! কী দারুণ দেখতে! সুন্দরবন—চারপাশে যেন সুন্দরের সমারোহ আবার বিভিন্ন ধরনের জাহাজের, ইঞ্জিন নৌকারও সমারোহ।
সকাল ৯টা। অসাধারণ সব দৃশ্য। চারপাশে জল আবার বন, বন আবার জল। সুন্দরী, গরান, গেওয়া, গোলপাতা। গোলপাতা তার নাম হয়েছে তার গোলাকার ফলটার জন্য। আসলে তার পাতাগুলো গোল নয়, নারকেল পাতার মতো দেখতে।
প্রথমবার গিয়েছিলাম সেই ১৯৯৪ সালে। সুন্দরবন ভ্রমণ সব সময় অসাধারণ সুন্দর হয় এবং আয়েশি। এতো সুন্দর আমাদের এই দেশে এমন বিরামহীন সৌন্দর্যের অসামান্যতা মনোমুগ্ধকর তৃপ্তি ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। বিধাতার কী অপার দান!
শীতকাল হওয়াতে সারা নদীতে যেন ইঞ্জিন নৌকার খেলা চলছে। কতো পর্যটক চলছে সুন্দরবনের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে। ঘণ্টা দুয়েক ভ্রমণের পর আমরা নামলাম বন বিভাগের ‘করমজল’ কুমির প্রজনন কেন্দ্রে। মা কুমিরেরর বাচ্চা পাশে নিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। কোন কোন বাচ্চা কুমির ঘুরে বেড়াচ্ছে। অসামান্য সৌন্দর্যের প্রতীক যেন —ওয়াচ টাওয়ার থেকে সুন্দর বনের সৌন্দর্য উপভোগ করা এক বিরল ঘটনা যেন। মধু, কাঁচা কাঠ বাদাম কেনা হলো। এখানেই প্রমাণ পাওয়া গেলো ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের। সব বৃক্ষরাজি যেখানে জলে জন্ম তাদের শ্বাসমূলগুলো ডাঙায় ঊর্ধ্বমুখো হয়ে আছে। এরপর বনবিভাগের গাইডের সাথে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে গেলাম অরিজিনাল সুন্দরবনের ভিতরে। গাছের ডালে বানরেরা বসে আমাদের দিকে অপলক চেয়ে আছে। নানা প্রজাতির বৃক্ষ, মৌমাছির গুঞ্জন, তিতির, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, সাপ, মৌচাক, কুমির, নানা জাতের পাখির শব্দ তারা যেন অভয়ারণ্যে, কোন ভয় কাজ করে না তাদের। তারা আমাদের অহংকার, আমাদের সম্পদ। তারা মানুষ দেখলে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে।
এরপর আবার ইঞ্জিন নৌকায় যাত্রা। এবার উদ্দেশ্য ডাংমারি। বন বিভাগের কর্মকর্তার বাসায় দুপুরের লাঞ্চের এক মহা আয়োজন। কোয়ার্টারের অভ্যন্তরে এক বিশাল দিঘি যেখানে নৌকা বাঁধা আছে দুটো, সহজে দাঁড় বেয়ে নৌকা চালানো যায়। কোয়ার্টারে ঢুকতেই চোখে পড়ে কাদামাটিতে টাইগারের পায়ের ছাপ, চিত্রা হরিণ ও তাদের মায়াবী চাহনি। কোয়ার্টারের অভ্যন্তরে এক বিশাল দিঘি যেখানে নৌকা বাঁধা আছে দুটো, সহজে দাঁড় বেয়ে নৌকা চালানো যায়। আহ্! যেন স্বপ্নলোকে বাস করছি। নদীর প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি অঞ্চল যেন স্বপ্নে আঁকা রঙিন ভুবন। এতো মনোলোভা দৃশ্য অভাবনীয় আল্লাহর দান! ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের পর গবেষকরা সুন্দরবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন মাশাআল্লাহ এবার দেখে মনে হলো আগের বারের চেয়ে আরও বেশি সুন্দর, বেশি সম্মৃদ্ধ সব গাছ–গাছালি, পাখপাখালি, মৌয়াল কিম্বা জন্তুবিশেষ।












