সুকুমার বড়ুয়া : আমাদের আদর্শের ছড়াশিল্পীর বিদায়

রাশেদ রউফ | মঙ্গলবার , ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

গতকাল ৫ জানুয়ারি আমাদের বাংলাদেশে উদযাপন করা হলো জাতীয় ছড়া দিবস। এ দিবসের কর্মসূচি উদ্বোধন করেন কবিছড়াসাহিত্যিক সনজীব বড়ুয়া। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো এ দিবস উদযাপন করা হয়েছিলো চট্টগ্রামে। সেই সময়ে উদ্যোক্তারা দেশবিদেশের ছড়াকারদের দিবসটি পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকটি স্থানে ২০২৫ থেকে আরও বিভিন্ন সংগঠন এই দিবস উদযাপন করেছে বলে জানা গেছে। ইতিহাসের অনেককিছুর শুরু চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রামে অবস্থানরত ছড়াসাহিত্যিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতি বছর ৫ জানুয়ারি জাতীয় ছড়া দিবস পালন করবেএ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তাঁরা গতকাল অনুষ্ঠানে।

সুকুমার বড়ুয়ার জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি। এবছর ২জানুয়ারি আমরা তাঁকে হারিয়েছি। তিনি আমার প্রিয় ছড়াসাহিত্যিক। তাঁর ছড়া পড়ে আমি মুগ্ধ হই, আনন্দিত হই, উচ্ছ্বসিত হই। প্রায় প্রতিটি ছড়াই আকর্ষণীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত। সুকুমার বড়ুয়া বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের অগ্রণী পুরুষ। যে ক’জন লেখক শুধু ছড়াসাহিত্য চর্চা করে খ্যাতির শিখরে অবস্থান করেছেন তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর প্রায় প্রতিটি ছড়াই আকর্ষণীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত। ‘বিষয়ের অভিনবত্বে এবং প্রকাশভঙ্গির সাবলীলতায়’ তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছড়াসাহিত্যিক।

১৯৫৮ সাল থেকে এই ৬৮ বছরের লেখালেখি জীবনে বেরিয়েছে তাঁর অনেকগুলো ছড়াগ্রন্থ। তন্মধ্যে রয়েছে : পাগলা ঘোড়া, ভিজে বেড়াল, চন্দনা রঞ্জনার ছড়া, এলোপাতাড়ি, নানা রঙের দিন, সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া, চিচিং ফাঁক, কিছু না কিছু, সুকুমার বড়ুয়ার বুদ্ধচর্চা বিষয়ক ছড়া, প্রিয় ছড়া শতক, টুস্‌টাস্‌, নদীর খেলা, ‘ছড়াসমগ্র’ প্রভৃতি। পেয়েছেন অসংখ্য পাঠকের ভালোবাসা, অর্জন করেছেন একাডেমিক স্বীকৃতি, একুশে পদক। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন। মেধা ও শ্রমের সংমিশ্রণে তিনি পেয়েছেন লেখালেখির ক্ষেত্রে অসামান্য খ্যাতি। তাঁর প্রাপ্তি তাঁর প্রত্যাশাকে ডিঙিয়ে গেছে অনেক আগেই। সুকুমার বড়ুয়ার আচরণ এত সহজ এবং চলাফেরা এত সাধারণ ছিল যে তাঁকে দেখে মনে হতো নাতিনি কত বড় সৃষ্টিশীল মানুষ। আমার মনে হয়, তিনি নিজেও জানতেন না যে তাঁর দক্ষতার ওজন কতটুকু! তিনি আমাদের ছড়াসাহিত্যে একজন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। লুৎফর রহমান রিটনের ভাষায়-‘সুকুমার বড়ুয়া নামটি আমাদের গৌরব’।

সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার প্রধান আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে তাঁর ‘ছন্দ’। ছন্দের ঝঙ্কারে তাঁর ছড়ার প্রতিটি শব্দ যেন নেচে উঠে। সুরের মোহজালে আটকে পড়া ছড়াগুলো শোনামাত্রই তুষ্ট হয় আমাদের কান, উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মন। মিটে যায় কৌতূহল ও কল্পনার উৎসুকতার দাবি। তাঁর ছড়ার মন্ত্রমুগ্ধ ছন্দেচপল নৃত্যেনিটোল সুরে দোলায়িত হয় আমাদের মন। একবার পড়লে বারবার পড়ার স্পৃহা জাগে, মুখস্থ হয়ে যায় এবং মাঝে মাঝে মগজের ভেতর গুন গুন করে ফেরে ছড়ার বিভিন্ন পঙ্‌ক্তি। ফলে আড্ডায়, আসরে উপস্থাপিত হয় তাঁর বিভিন্ন ছড়া। যদিও ছড়ায় ধ্বনির পরেই আসে বক্তব্য।

বলা আবশ্যক যে, সুকুমার বড়ুয়ার প্রায় সবক’টি ছড়াতেই যেমন ধ্বনির মাধুর্যতা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি সন্ধান মেলে অর্থের নিগূঢ় রহস্যের। এতে একদিকে পাওয়া যায় ছন্দের জাদুস্পর্শ, অন্য দিকে মেলে পূর্ণ বিকশিত বুদ্ধির আনন্দ।

সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াগুলো সব ধরনের বৈশিষ্ট্যে অনন্য। তাঁর স্বাতন্ত্রবোধ তাঁকে বিশিষ্টতা দান করেছে। তাঁর ছড়ার সহজিয়া রূপ তাঁকে ‘প্রিয় লেখক’ ‘প্রিয় ছড়াসাহিত্যিক’র আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর ছড়ার বক্তব্য এমনই যে, সহজে আকর্ষণ করে পাঠককে। তাঁর ছড়ার ভাষা ও ছন্দের ব্যবহার এমন যে, সহজেই সহজভাবে গ্রহণ করা যায়; মুখস্থ হয়ে যায়।

সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায় যেমন পাওয়া যায় ধ্বনির স্বতঃস্ফূর্ততা, তেমনি পাওয়া যায় অর্থের গভীরতা, বুদ্ধির চাতুর্য। তবে এ বুদ্ধি কৃত্রিমতায় মোড়া নয়। অকৃত্রিম ও প্রাকৃত।

সুকুমার বড়ুয়া’র মনের স্বাভাবিক প্রকৃতি আবেগ নয়, কৌতুক। ব্যঙ্গ করার ক্ষেত্রে, কৌতুক করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রাণোচ্ছল মন স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারে। তাঁর কৌতুকপূর্ণ ছড়ায় যেমন থাকে হাস্যরস, তেমনি থাকে সমাজের স্বরূপচিত্র।

অসময়ে মেহমান

ঘরে ঢুকে বসে যান

বোঝালাম ঝামেলার

যতগুলি দিক আছে

তিনি হেসে বললেন

ঠিক আছে ঠিক আছে

মেঘ দেখে মেহমান

চাইলেন ছাতাখান

দেখালাম ছাতাটার

শুধু ক’টা শিক আছে

তবু তিনি বললেন:

ঠিক আছে ঠিক আছে।

কৌতুকের মধ্যে দিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে, ছন্দের অনুরণনে তিনি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন দেশের পরিস্থিতি, সমাজের বৈষম্য। শোষণের চিত্র ফুটে উঠেছে এ ধরনের একটি ছড়ার উদাহরণ এখানে টানছি :

অমুক দেশের অমুক

পরের মাথায় কাঁঠাল রেখে

কোয়া খাবেন একে একে

মিষ্টি হেসে বলেন আবার

তোমার বোঝা কমুক,

ভাগ্য দোষে আমার পেটে

জমছে বোঝা জমুক

সে যে অমুক দেশের অমুক।

সুকুমার বড়ুয়া’র ছড়ার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাঁর ছড়া সর্বজনীন। ছোটোদের কাছে খুবই প্রিয় তাঁর ছড়া, বড়োরাও আনন্দ পান। তাঁর ছড়ায় থাকে ছোটোদের মনকে তুষ্ট করতে পারে এমন উদাহরণ, আবার থাকে বক্তব্য কিংবা খোঁচা, যাতে বড়োরা পান তৃপ্তি। এতে মেটানো হয় তাদের কাঙ্ক্ষিত দাবি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পত্রিকা মাসিক ‘শিশু’তে তাঁর একটি ছড়া ছাপা হয়েছে। ছড়াটি এরকম :

সবুজ বনের তোতা

খাঁচার ভেতর বন্দি হয়ে

ঠোঁট করেছে ভোঁতা।

দেখালে দেখে

শেখালে শেখে

শোনালে হবে শ্রোতা

এর কথা ওর কানে দিয়ে

গণ্ডগোলের হোতা,

সবুজ বনের তোতা।

ছড়াটি পড়ে ছোটোরা মজা পেয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্‌তু ছড়াটি একটি রূপকধর্মী। এতে ফুটে উঠেছে একটি বাস্তবচিত্র। গভীরভাবে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যাবে এ ছড়ার তাৎপর্য। যে কোনো মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে। কিন্‌তু সে যখন অন্যের অধীনে আবদ্ধ, তখন সে হারায় তার স্বাধীনতা, ঠোঁটটা তাঁর ধারালো থাকলেও ভোঁতা হয়ে যায়। দেখালেই সে দেখবে, শোনালেই সে শুনবে, শেখালেই সে শেখবে। নিজে থেকেই কিছুই করতে পারবে না। তবে ‘সে’ই আবার বিপদ হয়ে দাঁড়ায়; এর কথা ওর কানে দিয়ে ওঠে গণ্ডগোলের হোতা।

কী চমৎকারভাবে ছোটোদের মনের মতো করে সুকুমার বড়ুয়া উপস্থাপন করেছেন খাঁটি সত্য নির্ভেজাল চিত্রটি। সুকুমার বড়ুয়া একজন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। ১৯৬২ সালে লিখেছেন চাঁদে যাওয়ার কথা। অথচ যাওয়া শুরু করেছে মানুষ ১৯৬৯ সালে থেকে। সেই বাষট্টিতে তিনি লিখেছেন

এমন হবে কি

একটি লাফে হঠাৎ আমি

চাঁদে পৌঁছেছি।

গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে

দেখে শুনে ভালো করে

লক্ষ যুগের অন্ত আদি

জানতে ছুটেছি।

সুকুমার বড়ুয়া বাংলাদেশের অনেক তরুণ ছড়াকর্মীর আদর্শের ‘ছড়াশিল্পী’। তাঁর সহজাত প্রকাশনৈপুণ্যে, শব্দকুশলতায় ও সুরের ব্যঞ্জনায় তাঁর ছড়া যেমন হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী, তেমনি তিনি হয়ে উঠেছেন ‘প্রিয়’।

আমি তাঁর ছড়ার একজন দরদি পাঠক। আমি আপ্লুত হই তাঁর বক্তব্যে, অভিভূত হই তাঁর অভিনবত্বে। উল্লসিত হই তাঁর উপস্থাপনায় এবং নেচে উঠি তাঁর ছন্দের ঝঙ্কারে। আমি তালে তালে মাতাল হই, উচ্ছ্বসিত হই এবং আলোড়িত হই। (স্কেচ : মোমিন উদ্দীন খালেদ)

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানবিক মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আগামী দিনগুলো
পরবর্তী নিবন্ধযুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ১