সিদ্দিক আহমেদ: কথা- কাহিনির অসামান্য রূপকার

মুহম্মদ নুরুল আবসার | রবিবার , ১২ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে এ বিরল ব্যতিক্রমী মানুষটিকে। দিনে দিনে সখ্যতা বেড়েছে নিবিড়ভাবে। তিনিই ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন তাঁর এবং আমার বয়সের ব্যবধানকে। গল্পে গল্পে পার করেছি অনেক রাত। তিনি শুনিয়েছেন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের আশ্চর্য সব কাহিনি। অবলীলায় বলেছেন, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির জটিল সব হিসাব নিকেশ। তাঁর সাহচার্য, আন্তরিকতা, বন্ধুতা এবং সহমর্মিতায় আমি ক্রমশ হয়ে উঠলাম তাঁর ভাবশিষ্য। আর তাঁর অজান্তেই তাঁকে পাঠ করছি নিয়ত। কিন্তু আমার মূর্খতা বারবার হোঁচট খেয়ে নিষ্পেষিত হয় সুবিশাল জ্ঞানবৃক্ষের চাপায়। তাঁর গভীরে প্রবেশ করে যদি এক বালুকণা জ্ঞানও আহরণ করতে পারতাম, তাহলে আমার এ জীবন অন্যরকম হতো। আমি বিচ্যুত হয়ে বন্দনা করছি নিজের। কিন্তু উপায় নেই। তেত্রিশ বছর ধরে তাঁর ছায়ায় ছায়ায় হেঁটেছি, যতই তাঁকে দেখেছি ততই মুগ্ধতা ও বিস্ময়তায় তন্ময় হয়েছি। দেখেছি মানুষের উপর তাঁর প্রচণ্ড ভালোবাসা ও বিশ্বাস অপরিসীম এবং সে ভালোবাসা অকৃত্রিম। নিজের চাল চুলোর খবর নেই কিন্তু অপরের ভালো মন্দের খবর রাখা এবং সহমর্মিতার হস্ত প্রসারিত করা যেন ছিলো তাঁর রুটিন ওয়ার্ক।

বিশ্বের বহু বিখ্যাত মনীষীর মতো তিনিও প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষার সনদ নেননি। কিন্তু তিনি বিশ্বের নানা ভাষার নানা বিষয়ের হাজার হাজার গ্রন্থের স্বাদ আস্বাদন করে ঋদ্ধ হয়েছেন এবং বিশ্বের সাহিত্য সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি ও ভাবধারাকে আত্মস্থ করে কবিতার রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন তা আমাদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সনদধারীদের অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন। আমরা তাঁর পিছু পিছু দৌড়াচ্ছি। জানি সারা জীবন দৌঁড়েও তাঁকে ছুঁতে পারবো না। এটা তিনি জানতেন এবং বোঝতেন বলেই হয়তো আমাদের ‘খোলা জানালায় গোপন সুন্দরবনউপহার দিয়েছেন। জগৎবিখ্যাত শিল্পী পিকাশো’কে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে। এতে তিনি নন্দনতত্ত্ব ও চিত্রকলার শিল্পিত রূপের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন নিপুণ কারিগরের মতো। এরপর ‘আপেলে কামড়ের দাগ’ দিয়ে তিনি তাঁর সৃজনশীলতার চমৎকার নৈপুণ্য দেখালেন তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠকদের। বিশ্ব সাহিত্যের বাছাইকৃত সেরা কিছু কবিতা বাংলায় রূপান্তরিত করে সবাইকে চমকে দিলেন। যদিও তিনি এই কর্মটি করেছেন সত্তর দশক থেকে ‘অনুবাদ’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে। শুধু কি তাই? না, বহু বাংলা গদ্য, পদ্য এবং ছড়াকেও তিনি ইংরেজিতে রূপান্তরিত করেছেন। যার কোনো হিসাব তাঁর কাছেও ছিলো না। মানুষকে ভালোবাসাই ছিলো তাঁর একটি চরম নেশা। তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। তাঁর শত্রুকেও (যদি কেউ থাকে) প্রচণ্ড রকম ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। অহংবোধ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি বলেই তিনি চাটগাঁর চেরাগ হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিলো চোখে পড়ার মতো। নবীনরাও সিদ্দিক ভাইবলতে পাগল। তিনিও হয়তো ভালোবেসেই তরুণদের কিছু ‘মানবফুলউপহার দিয়েছেন। তরুণদের বলতে চেয়েছেনওই মানবফুলের সৌরভ নিয়ে নিজেদের বিকশিত করো। সিদ্দিক আহমেদ জীবনের সত্তুর বছরের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন হাজার গ্রন্থের পৃষ্ঠা ও পাতানিয়ে। নানা বিচিত্র গ্রন্থের পৃষ্ঠা ও পাতা তাঁকে আবদ্ধ করে রেখেছিলো দিনকে দিন, রাতকে রাত। হয়তো এ জন্যই তিনি হয়ে উঠেছেন আজকের এই সিদ্দিক আহমেদ। জীবনে হাজার হাজার বৈচিত্র্যময় গ্রন্থ পাঠ করেও তিনি ছিলেন অতৃপ্ত। জ্ঞানের তৃষ্ণায় ভূষিত হয়ে রচনা করেছেন জল ও তৃষ্ণা। দৈনিক আজাদীসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে লিখেছেন অজস্র প্রবন্ধ নিবন্ধ সেখান থেকে বাছাইকৃত কিছু লেখা দিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘প্রভৃতি’। সবশেষে প্রকাশিত হয়েছে ‘ছিটেফোঁটা’। এখনো অনেক লেখা গ্রন্থভুক্ত হয়নি। তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল সিদ্দিক আহমেদ সমগ্রপ্রকাশের।

ব্যক্তি সিদ্দিক আহমেদের ছিলো জীবন নানা বৈচিত্র্যে ভরা। ষাটসত্তর দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পট পরিবর্তনের সেই ঐতিহাসিক দিনগুলোর তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং অংশগ্রহণকারী। তিনি সেই সময় এসেছেন বহু বিখ্যাত মানুষের সান্নিধ্যে। সেই প্রসঙ্গ আছে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের স্বরূপ উন্মোচন করলে আমরা দেখতে পাইআদর্শে তিনি আপসহীন, আচরণে আন্তরিক। কখনো বজ্রের মতো বহ্নিগর্ভ, আবার কখনো কুসুমের মতো সুকোমল। তাঁর চক্ষুজুড়ে দেখার তৃষ্ণা ছিলো, তৃপ্তি ছিলো না। সম্মানের প্রাচুর্য ছিলো, বিকার ছিলো না। দানের অভ্যাস ছিলো, অহংকার ছিলো না। চলনে, বলনে, পোশাকে তিনি ছিলেন অতি সাধারণ, অথচ আধুনিক। চলমান বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, নাটক, সংগীতসব বিষয়ে তিনি ছিলেন সব সময় আপডেটেড। এজন্যই এই শহরের সব বয়সের জ্ঞান পিপাসুরা ছুটে আসতেন তাঁর কাছে একটু দীক্ষা নেবার আশায়। চরম সৌভাগ্য যে, আমাদের কালে আমরা এরকম একজন সিদ্দিক আহমেদকে পেয়েছি অতি আপন করে। কাউকে তিনি নিরাশ করতেন না। ব্যক্তি জীবনে নানা কষ্ট থাকলেও সেটা চেপে রাখতেন চমৎকারভাবে। অপরের সমস্যা সমাধানে সদা নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। বুদ্ধি দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে, উপদেশ দিয়ে উপকার করতেন বহুজনের। তেত্রিশ বছর দেখতে দেখতে তাঁর প্রতি প্রচণ্ড রকম ভালোবাসা জন্মেছিলো। শেষ জীবনে তাঁর শরীরযন্ত্র তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ধীরে ধীরে শেষ বিকেলের দিকে তিনি ধাবিত হন। অবশেষে ২০১৭ সালের ১২ই এপ্রিল আমাদের শোক সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

লেখক: সম্পাদক, আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন বছরের ভাবনাগুলো হোক নতুন
পরবর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে