সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং পাইপলাইন চালু হওয়ার আশা

অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স টেন্ডার তিন প্রতিষ্ঠানের দরপত্র গেল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে

হাসান আকবর  | মঙ্গলবার , ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

সাগরের তলদেশে এবং মাটির নিচে থাকা প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) পাইপলাইন চালু হওয়ার আশা দেখা দিয়েছে। বহুল প্রত্যাশার পাইপলাইনটি চালু করতে অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স (ওঅ্যান্ডএম) টেন্ডার খোলার পর এই আশা জেগেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি খোলা টেন্ডারে ৩টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করেছে। সেগুলো প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দুবাইভিত্তিক আইএলএফের নিকট পাঠানো হয়েছে। তাদের পরামর্শসহ প্রতিবেদন পাওয়ার পর তিনটি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কাছে পাঠানো হবে। মূল্যায়ন শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে কার্যাদেশ দেওয়া হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

কমিশনিং এবং পরীক্ষানিরীক্ষা সম্পন্ন হলেও পাইপলাইনটি দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) দেশের জ্বালানি তেল খালাসে বিশ্বমানের প্রযুক্তি সন্নিবেশ করতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছিন।

বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আমদানিকৃত জ্বালানি তেল নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে। লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে এসব জ্বালানি তেল খালাস করা হয়।

বহির্নোঙর থেকে গুপ্তাখাল জেটি পর্যন্ত জ্বালানি তেল লাইটারিং করতে বিপুল অর্থ খরচের পাশাপাশি প্রচুর সময় লাগে। অপচয় এবং চুরিও হয়। ১ লাখ মেট্রিকটন জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ খালাসে ১০১১ দিন এবং ৩০ হাজার মেট্রিকটন ডিজেলবাহী জাহাজ খালাসে ৪৫ দিন সময় লাগে। এই পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল খালাস সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল খালাসের জন্য ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে নেওয়া ওই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সাগরে নোঙর করা বড় বড় মাদার ভ্যাসেল থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। এতে একটি পাইপলাইনে ডিজেল এবং অপর পাইপলাইনে ক্রুড অয়েল আনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কঙবাজারের মাতারবাড়ী দ্বীপের স্টোরেজ ট্যাংক থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে ভাসমান বয়াটির অবস্থান। ২২০ কিলোমিটার সমান্তরালে দুটি পাইপলাইনের সঙ্গে সেটি সংযুক্ত। এর মধ্যে ১৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইন অফশোর বা সাগরের তলদেশে এবং ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইন অনশোর বা স্থলভাগে স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের দুটি আলাদা পাইপলাইন ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়। বড় জাহাজ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রথমে মহেশখালীর ট্যাংক টার্মিনাল, পরে সেখান থেকে পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংক টার্মিনালে নিতে এগুলো স্থাপন করা হয়েছে। চীনের অর্থায়ন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটির কাজ শেষে কমিশনিং এবং পরীক্ষানিরীক্ষাও করা হয়েছে।

এই টার্মিনালটি ঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার মতো লোকবল বিপিসির নেই। ইতোমধ্যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড তিন বছরের জন্য এসপিএম পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনাও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে সব আলোচনা ভেস্তে যায়।

বিপিসির শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানান, পাইপলাইনটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বুঝে নিয়েছে। কিন্তু এটি পরিচালনার মতো অভিজ্ঞ লোকবল বিপিসির নেই। তাই বিপিসি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার পর পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আনার কার্যক্রম শুরু হবে। ইতোমধ্যে এক দফা টেন্ডার আহ্বান করলে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। পরে ওই টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ১১টি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার ডকুমেন্টস কিনলেও দাখিল করে তিনটি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার খোলা হয়। ইতোমধ্যে টেন্ডার ডকুমেন্টস প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফের কাছে পাঠানো হয়েছে।

উক্ত কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে মাসখানেকের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগের পর সাগর থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হবে। এতে বিপিসির বছরে অন্তত ৮শ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএক হাজার টন বর্জ্য থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব
পরবর্তী নিবন্ধসেহেরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ