ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারকে ‘কৃষকের বন্ধু’ বলে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া ছিলেন কৃষকের বন্ধু, আপনাদের নির্বাচিত বর্তমান বিএনপি সরকারও হচ্ছে কৃষকের বন্ধু। কারণ একটা কথা তো একটু আগে বললাম, কৃষক ভালো থাকলে– কৃষাণী ভালো থাকলে এই বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। কাজেই কৃষক ভাইদেরকে আমরা ভালো রাখতে চাই, কৃষাণী বোনদেরকে আমরা ভালো রাখতে চাই। বাংলাদেশের কৃষিকে আমরা শক্তিশালী ভিত্তির উপরে গড়ে তুলতে চাই। গতকাল সোমবার দুপুরে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দিনাজপুরে যে খাল কেটেছিলেন, পাঁচ দশক বাদে সেই সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কাজের সূচনা করলেন তারই ছেলে তারেক রহমান। বাবার মতোই নিজে কোদাল দিয়ে কেটে সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পোলো শার্ট, জিন্স, কেডস পরিহিত তারেক রহমানের মাথায় ছিল লাল–সবুজের ক্যাপ, যাতে লেখা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এর মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরের সাহাপাড়াসহ সারাদেশে ৫৪ জেলার খাল খনন–পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন সরকারপ্রধান। খবর বিডিনিউজের।
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, আমরা এই খাল যেমন কাটার কথা বলেছিলাম, খাল কাটার কাজ আজকে শুরু করেছি, ঠিক একইভাবে মা–বোনদেরকে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার কথা আমরা বলেছিলাম, সেটির কাজও আমরা শুরু করেছি। একইভাবে কৃষক ভাইদের জন্য যেমন সুদ মওকুফ করেছি আমরা মা–বোনদের কাছে যেরকম ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছি, কৃষক ভাইদের কাছেও আমরা কৃষক কার্ড দিব, যাতে করে তাদের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারি, তাদেরকে সহযোগিতা করতে পারি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনো শুরু হয়নি, ইনশাআল্লাহ আগামী মাস থেকে আমরা এটার পাইলট প্রজেক্টের কাজ শুরু করব। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সকল কৃষক ভাইদের কাছে বিশেষ করে যারা ছোট কৃষক, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক কৃষক, মধ্যম কৃষক তাদের কাছে আমরা এই কার্ডগুলো দিব, যাতে করে এই কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন রকম সরকারি সুযোগ–সুবিধা পেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে চাপ পড়েছে : নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে কিছুটা সময়ের দরকার জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ আপনাদের চিন্তা করার কোনো কারণ নাই, এই এলাকাসহ পুরা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় সমগ্র এই রংপুর বিভাগের যত মায়েরা আছেন, সবার কাছে ধীরে ধীরে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিব। শুধু একটু সময়ের প্রয়োজন, মাত্র সরকারের বয়স হয়েছে এক মাস, একটু সময়ের প্রয়োজন। আর একটা জিনিস তো বুঝতে হবে, সবাই আপনারা বুঝেন যে এই যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতির উপরে একটু চাপ পড়েছে। তারপরেও আমরা যে কমিটমেন্ট, যে ওয়াদা করেছি, আমাদের মা–বোনদের কাছে যে ওয়াদা করেছি আমরা সেগুলো কিন্তু আমরা ধীরে ধীরে ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়নের কাজ এরই ভেতরে আমরা শুরু করেছি।
মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বিশৃঙ্খলা করতে চায়: ‘মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে’ যারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অনেকে আছে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কিন্তু বিভ্রান্ত করতে চায়। আমাদেরকে সতর্ক সজাগ থাকতে হবে– বিভিন্ন রকম কথাবার্তা বলে কারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। পারবেন তো? আপনাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে মা– বোনদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলা, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে দেশের মানুষ, গ্রামের মানুষ, এলাকার মানুষ কীভাবে ভালো চিকিৎসা পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে, আমাদের সন্তানেরা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরা কীভাবে লেখাপড়া করে মানুষ হতে পারে সেটাই হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কী করে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব, সেটি কৃষি হোক, সেটি শিল্প হোক সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের সমর্থন চেয়ে তিনি বলেন, এই কাজগুলো যদি করতে হয়, আমি কিন্তু একা পারবো না। কাকে লাগবে সাথে? জনগণকে সাথে লাগবে। নির্বাচনে যেমন আপনারা ধানের শীষের সাথে ছিলেন, আপনারা সমর্থন দিয়েছেন, এখনও কিছু আপনাদের সমর্থন ছাড়া আমরা এই কাজগুলো করতে পারব না। জনগণের সমর্থন ছাড়া দেশ উন্নয়নের কাজ সম্ভব না। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস। সেই জনগণের সমর্থন প্রয়োজন।
খাল খননে কী সুবিধা? দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরাপুরের সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ৫৪টি জেলায় খনন কর্মসূচির সূচনা করেন। সমাবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। এরপর খালের পাড়ে কয়েকটি বৃক্ষ রোপণ করেন তিনি। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহাপাড়া খালটি খনন করেছিলেন। সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়।
খাল খনন করলে জনগণের কী সুবিধা হয়, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমরা যারা বিএনপি করি, আমরা এমন একটি দল করি যেই দলের কাজ হচ্ছে সেই কাজগুলো করা, যেই কাজগুলো করলে মানুষের উপকার হবে, যেই কাজগুলো করলে মানুষ খুশি হবে। আমরা চেষ্টা করি সেই কাজগুলোই করতে এবং সে কারণেই আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি আনুষ্ঠানিকভাবে আজকে আমরা এই সাহাপাড়া খালটি আমরা পুনঃখননের কাজ শুরু করেছি।
এই খালটা ইনশল্লাহ আমরা সম্পূর্ণভাবে যখন কাজ শেষ করতে পারব, সম্পূর্ণভাবে যখন কাজ শেষ করব; তখন কিন্তু প্রায় ৩১ হাজার কৃষক এখান থেকে পানি পাবে। এই খালের সুবিধা পাবে ৩১ হাজার কৃষক। প্রায় ১ হাজার ২ শ হেক্টর জমি এই খালে যে পানি থাকবে, সেই পানির সেচ সুবিধার মধ্যে আসবে। সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ এই খালের পানির সুবিধা পাবে। শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা এবং পানি সংরক্ষণ করে মৎস্য চাষ এবং খালের দুই পাড়ে বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই খালটি আপনারা পুনঃখনন শেষ করলে আমি আবার এটা দেখতে আসব। সরকারপ্রধান তারেক রহমান বলেন, আমি নির্বাচনের সময়ে একটা কথা বলেছি, বিদেশে অনেকের আত্বীয়–স্বজন আছে; তাদের সাথে আপনাদের নিশ্চয় কথা হয়। তারা বলে, ওদের দেশটা সুন্দর। তো ভাই ওদের দেশটা যদি সুন্দর হয়, সেটা জ্বিন–ভূতে এসে দেশ বানায় দিয়ে গেছে? ওদের দেশের মানুষই তো দেশ সুন্দর করেছে, করেছে না? ওদের দেশ তো জ্বিন এসে দেশ সুন্দর করে নাই। ওই দেশের মানুষই তো ওদের দেশকে গড়ে তুলেছে। তাইতো? ওরা পারলে তাহলে আমরা কেন পারব না? আমরাও ইনশল্লাহ পারব।
জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সাংসদ আখতারুজ্জামান মিয়া, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, মনজুরুল ইসলাম, সাদেক রিয়াজ, কাহারোল উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা, রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম।
খনন হবে ২০ হাজার কিলোমিটার : পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচির আলোকে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী, নাল, জলাধার খনন করা হবে। জিয়াউর রহমানের সময় এ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ৬৭৫.১৮ মাইল দীর্ঘ ১৯৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী এলাকায় ‘বেতনা নদী’ পুনর্খনন কাজ যখন উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান, তখন তিনি সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ‘জিয়া কেন জনপ্রিয়’ শীর্ষক একটি সংকলন গ্রন্থে এ কে এম সালেক তার প্রবন্ধে লিখেছেন, জিয়াউর রহমানের এই কার্যক্রম শুরুর আগে দেশে ১০ শতাংশ জমিতে শুকনো মৌসুমে পানি সরবরাহ সম্ভব ছিল। খাল খনন কর্মসূচির পর অন্তত ৫২ লাখ একর জমিতে সেচের সুবিধা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মাছ উৎপাদন, পানি নিষ্কাশন ও নৌ চলাচলে সহায়ক হয় ওই প্রকল্প। বৃদ্ধি পায় খাদ্য উৎপাদন।
এখন নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, এ কর্মসূচি কৃষি ও সেচ কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ভূ–উপরিস্থ পানির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে ভূ–গর্ভস্থ পানির চাহিদা হ্রাস করাও এই খনন কার্যক্রমের লক্ষ্য। সরকার আশা করছে, এই কার্যক্রমের ফলে খরা প্রবণতা কমবে, অনদিকে বন্যা ও জলাবদ্ধতাও হ্রাস পাবে।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, পানিসম্পদ, স্থানীয় সরকার, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সমন্বয়ে ‘দেশব্যাপী নদী–নালা–খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। প্রতি কিলোমিটার খনন, পুনঃখননে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অন্তত ২০ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। পলি ও বালিতে ভরাট হয়ে বর্তমানে নৌপথ কমে হয়েছে চার হাজার কিলোমিটার। বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ–এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে বর্ষা মৌসুমে যেখানে নৌপথ থাকে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার, শুষ্ক মৌসুমে নৌপথ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার ৩৪৭ কিলোমিটারে।












