সাবেক দুই এমপির মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি

মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসন

ফরিদুল আলম দেওয়ান, মহেশখালী | শুক্রবার , ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

সাগরবেষ্টিত মহেশখালী ও কুতুবদিয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার২ আসনে বইছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। উপকূলীয় এই জনপদে এখন আলোচনার মূল বিষয় প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নের সমীকরণ। নির্বাচনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে একদিকে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, অন্যদিকে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। একই সাথে মাঠে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা জিয়াউল হক, গণআধিকার পরিষদের অ্যাডভোকেট এস এম রুকনুজ্জামান খান ও জাতীয় পার্টির মাহমুদুল করিম। প্রার্থী পাঁচ জন হলেও মূল লড়াইটা হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে।

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, এ আসনের মোট ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১০৮ জন ভোটারের মধ্যে মহেশখালী উপজেলার ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭২৭ জন। তারমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৩৬ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ২৭ হাজার ৯১ জন। কুতুবদিয়া উপজেলার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৩৮১ জন। তারমধ্যে পুরুষ ভোটার ৫৪ হাজার ৩২৯ জন এবং মহিলা ভোটার ৪৯ হাজার ৫২ জন।

কঙবাজার২ আসনে মোট ভোট কেন্দ্র ১১৮টি। তারমধ্যে, মহেশখালী উপজেলায় ভোট কেন্দ্র ৮১টি। কুতুবদিয়া উপজেলায় ভোট কেন্দ্র ৩৭টি। এ আসনের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোট কেন্দ্র ছিল ১১৮টি। এ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তাবিত ১১৮টি ভোট কেন্দ্রে মোট বুথ সংখ্যা ৭১৯টি। তারমধ্যে পুরুষ বুথ ৩৪টি এবং মহিলা বুথ ৩৭০টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে সরকার একইদিনে গণভোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভোট কেন্দ্রগুলোতে বুথ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আগে এই সংসদীয় আসনটি বৃহত্তর মহেশখালী ও কঙবাজার সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল। কুতুবদিয়া উপজেলা সংযুক্ত ছিল চকরিয়া উপজেলার সাথে। ১৯৮৪ সালে অন্যান্য আসনের সাথে কঙবাজার২ আসনটি পুনর্বিন্যাস করে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়। তখন থেকে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে উইং কমান্ডার জহিরুল ইসলাম, ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাকশাল থেকে মোহাম্মদ ইসহাক বিএ, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ এবং ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মত বিএনপির আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ এবং ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ইসলামীর এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে পরপর তিনটি একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আশেক উল্লাহ রফিক এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপির প্রার্থী সাবেক দুই বারের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ নির্বাচনী এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন। দীর্ঘ বিরতির পর বিএনপি নির্বাচনে ফেরায় তার কর্মীসমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। আলমগীর ফরিদ তার প্রচারণায় উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং মহেশখালীতে স্থাপিত কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গভীর সমুদ্র বন্দরে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিচ্ছেন। তার সমর্থকদের দাবি, আলমগীর ফরিদ এই জনপদের মাটির মানুষ এবং সাবেক দুইবারের পরীক্ষিত খাদেম। পূর্বের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং বিএনপির সুসংগঠিত ভোটব্যাংক তাকে বিজয়ী করতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. হামিদুর রহমান আযাদ এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তার প্রধান নির্বাচনী ইশতেহারের কেন্দ্রে রয়েছে মহেশখালীকে দেশের প্রধান ‘ইকোনমিক হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনসভায় তিনি বলেছেন, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ও অর্থনৈতিক জোন সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মহেশখালী হবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক রাজধানী। এছাড়া স্থানীয় লবণ চাষিদের দুঃখ লাঘবে লবণকে রপ্তানি পণ্য হিসেবে ঘোষণা এবং বিনা সুদে ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি প্রান্তিক চাষিদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তার অনুসারীরা মনে করছেন, ক্লিন ইমেজ এবং পূর্বের সংসদীয় অভিজ্ঞতাই তাকে লড়াইয়ে এগিয়ে রাখবে।

এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা জিয়াউল হক। ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে তিনি মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার দুর্গম এলাকাগুলোতে ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং ইনসাফ কায়েমের স্লোগান নিয়ে তিনি সাধারণ ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। মাওলানা জিয়াউল হক বলেন, মানুষ বড় দুই দলের শাসনে ক্লান্ত, তারা এখন পরিবর্তন চায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে মহেশখালীকুতুবদিয়া আসনে বিএনপিজামায়াত দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াইটা হবে সমানে সমান। এদের মধ্যে যেকোনো একজন জিতবেন অল্প ভোটের ব্যবধানে। তবে এ আসনে হাতপাখাও একটি ফ্যাক্টর হতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় আবেগ এবং সাধারণ মানুষের সাথে মাওলানা জিয়াউল হকের নিবিড় যোগাযোগ অনেক সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইউনাইটেড হাসপাতালের তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
পরবর্তী নিবন্ধআমাদের বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত