ভোরবেলা পুকুরপাড়ের প্রকাণ্ড শিরীষ গাছের কোটর হতে সুকণ্ঠী পাপিয়া ‘পিউ কাহা’ বলে ডেকে উঠতেই বাড়ির সকলে কাজে লেগে পড়লো। কার্যসমাধা না হতে এক মুহূর্ত জিরিয়ে নেওয়ার অবকাশ নেই কারও। বিশেষত, সবার কাজ ঘুরে ঘুরে তদারকি করছেন বলে রায়হানের মা একটু বেশিই অস্থির। একবার রান্নাঘরে গিয়ে দেখেন রান্নার কাজ কতদূর আগালো, আবার ঘরে এসে দেখেন ঘরদোর সাজানো–গোছানো ঠিকঠাক হলো কিনা। আত্মীয়–স্বজন একে একে আসতে শুরু করেছে। বাড়ির আশপাশের মহিলাদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। হাতের কাজ শেষ করে শীঘ্রই সকলে চলে আসবে। ছোট ছেলেমেয়েরা উঠানঘর জুড়ে আনন্দ–উল্লাস করছে। কেবল একজনের মনে কোনো আনন্দ নেই, কোনো উচ্ছ্বাস নেই। সে হলো আশা এই বাড়িরই বউ। আজকের সমস্ত আয়োজন তারই জন্য। অথচ সে যেনো পাথরের মতো নির্জীব, নিষ্প্রাণ। সকাল থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে। চোখে একবিন্দু ঘুম নেই, অথচ শয্যাত্যাগ করার জন্যও কোনো তাড়া নেই। শাশুড়িমা কয়েকবার এসে বলে গেছেন অনতিবিলম্বে প্রস্তুত হয়ে নিতে। ফের এসে যদি এমনই দেখেন তবে একরাশ মুখঝামটা শুনতে হবে নিশ্চিত। গত দুই বছর ধরে এমনটাই দেখে এবং সহ্য করে আসছে সে। গতকাল রাত থেকে বিছানার একপ্রান্তে কিছু জিনিসপত্র রাখা; একটা লাল রঙের শাড়ি, তার সঙ্গে ব্লাউজ, শায়া, চুড়ি, তিলক, আলতা ইত্যাদি। সবকিছুই লাল রঙের। পেটের উপরে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসলো সে। রোজকার চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে গোসল করলো। শাড়ি–চুড়িতে আবৃত হয়ে সহসা অন্ধকার রজনীতে উজ্জ্বল রাকাশশীর ন্যায় শুচিতা বিস্তার করে সকলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এলো। এমনই এক কার্তিকের অপরাহ্ণে কোমল রৌদ্রস্নাত হেমন্ত হয়ে এই ঘরে এসে উঠেছিল আশা। সেদিনও এমন ঘরময় জাঁকজমক, আড়ম্বর আর মানুষের কোলাহল ছিলো। আজও আছে; তবে সেদিনের মতো আজ তার চেহারায় নতুনত্বের ছাপ নেই, চোখেমুখে লজ্জা নেই, নেই মনের কোণে লুকিয়ে রাখা একান্ত নিজস্ব কোনো স্বপ্ন। তবুও এতগুলো মানুষের মাঝে আজ সে বিশেষ একজন। সকলে তার দিকে এগিয়ে এলো। কেউ হাতে–মাথায় হাত বুলিয়ে তার সুস্বাস্থ্য কামনা করলো। কেউবা অনাগত সন্তানের জন্য মনভরে প্রার্থনা করলো। আশার ননদ জেরিনু তার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে কারুকার্যখচিত একটি পাটির উপরে বসালো তাকে। তার চারপাশে বাটিতে বাটিতে সাজানো হলো নানা ধরনের খাবার। তাতে আছে সরু চালের ভাত, সরষে ইলিশ, কবুতরের মাংস, গরুর রেজালা, মুগডাল চচ্চড়ি, টমেটোর চাটনি, পাতার বড়া, ক্ষীরের পায়েস আর পাটিসাপটা পিঠা। এগুলো আশার পছন্দের সব খাবার। এই অনুষ্ঠানে দোহদবতী কন্যাকে তার সাধের সব খাবার খাওয়ানো হয় বলেই একে সাত মাসে সাধ বা সাধভাত বলে। এতে পাড়া–পড়শী, আত্মীয়–স্বজন সকলে উপহার–উপঢৌকন নিয়ে অংশগ্রহণ করেন এবং মা–সন্তানের মঙ্গলার্থে স্রষ্টার কাছে দোয়া করেন। লোকমুখে প্রচলিত, সাধের দিনে সাধ পূরণে ত্রুটি হলে সন্তান মায়ের অবাধ্য হয়। তাই রায়হানের মা ওরফে মতিজা বানু পুত্রবধূর জন্য নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব খাবার তৈরি করেছেন। সনাতন ধর্মের রীতি থেকেই মূলত সাধের প্রচলন বাঙালি মুসলিম সমাজে ব্যাপকতা লাভ করেছে। তাই স্বভাবতই মানুষের এবং যুগের চাহিদা অনুযায়ী কিছু নিয়মকানুনে পরিবর্তন এসেছে। তন্মধ্যে একটি নিয়ম কমবেশি সব সমাজেই প্রচলিত। আর তা হলো, দুটি পাত্রে আলাদা আলাদা করে সোনা এবং রূপা ঢেকে রাখা এবং গর্ভিণীকে যেকোনো একটি পাত্র পছন্দ করতে বলা। গর্ভিণী যে পাত্রটি তুলবে তাতে যদি সোনা থাকে, তবে তার ছেলে হবে আর রূপা থাকলে মেয়ে হবে। অধুনা যদিও এমনটা নিছক মজার ছলে করা হয়, তবে কিছুকাল আগেও এমন বিশ্বাস জনমনে প্রোথিত ছিল। এমনকি যদি দৈবদোষে কারও হাতে রূপা উঠে যেতো, তবে তার ভাগ্যকে অপ্রসন্ন বলে তিরস্কার করা হতো। আশার ভাগ্য ভালো, তাই তার হাতে সোনা উঠলো। তথাপি সকলের খুশি হওয়াতে সে মোটেই খুশি হতে পারলো না। কেমন যেনো মনে হলো, রূপা উঠলেই ভালো হতো। যেখানে হস্তবল কিংবা মুখবল অকেজো, সেখানে মনোবলে জয়ী হওয়াটাই বা কম কীসের! মতিজা বানু খঞ্চার মতো বড়ো একটা থালা এনে তার সামনে রাখলেন। তাতে সব পদের খাবার থেকে একটু একটু করে দিলেন। হাতে এক গ্লাস পানি ধরে বললেন, ‘হাত ধুয়ে খাওয়া শুরু করো। তোমার জন্যই তো এতো আয়োজন।’
আশা আশ্চর্য না হয়ে পারলো না। যে মুখ দিয়ে কেবল হুলই ফোটে, তা দিয়ে হঠাৎ মধু ঝরতে দেখলে আশ্চর্য হবারই কথা। এ কেমন ব্যবহার তার! হয়তো ঘরভর্তি আত্মীয়–স্বজন আছে বলে কিংবা আজকের দিনে ভাবী জননীর সাধ পূরণ না হলে সন্তানের অমঙ্গল হবে বলেু ঠিক ভেবে পেল না সে! এ তো ভালোবাসা নয়, মমতা নয়ু এ কেবলই সংস্কার! এতদিনের জমানো আঘাত যেনো ঘৃণা হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো তার। আশা হাত গুটিয়ে বসে রইলো। শ্বাশুড়ি গ্লাসটা আরেকটু সামনে এগিয়ে দিলেন। আশা তার বদ্ধমুষ্টি আরও একধাপ শক্ত করে চেপে ধরে বললো, ‘আমি এসব নিয়ম মানি না। মনগড়া যত কুসংস্কার!’
এতগুলো মানুষের সামনে মুখের উপরে এমন দুঃসাহসিক প্রতিবাদ মতিজা বানু কিছুমাত্রে সহ্য করলেন না। রাগে–ক্ষোভে তার দুই চোখ ফুলে উঠলো। হাতে থাকা গ্লাসটি তিনি সজোরে মেঝেতে রাখলেন। কাচের পাত্র আঘাত পেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। শ্বশ্রুমাতার অনুসরণে আশার ক্ষোভও গিয়ে ঝরলো নিরীহ–নিষ্প্রাণ বস্তুর উপরে। প্রতুত্তরে আশা তার খাবারের থালা দুই হাত দিয়ে তুলে সম্মুখে ছুড়ে মারলো। রসনায় রস জাগানিয়া মুখরোচক সব খাবার ঘরময় সুগন্ধি ছড়াতে লাগলো। মতিজা বানু বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে রইলেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গই একদিন মহারণ্যে দাবানলের সৃষ্টি করেু একথা তিনি হাড়েহাড়ে উপলব্ধি করলেন। উত্তপ্ত অঙ্গারে জলসিঞ্চন করতে কিংবা ফুঁক দিতে, কিছুতেই উৎসাহ হলো না কারও। সুতরাং গতিক সুবিধার না দেখে আত্মীয়–অনাত্মীয় যে যার মতো প্রস্থান করলো। মতিজা বানু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আশা একাকী স্বস্থানে স্থির হয়ে বসে রইলো। দৈবদোষে সেদিনের আয়োজন এমনই নিরানন্দে, সবিঘ্নে সমাধা হয়ে গেলো। বলাবাহুল্য, এই ঘটনার পরে সংসার থেকে শান্তি এবং সংস্কার দুটোই চিরতরে বিদায় নিলো।













