সাগরে জলদস্যুর গুলিতে জেলে নিহত পক্ষকালে ৫০ ফিশিং ট্রলার দস্যুর কবলে

মহেশখালী প্রতিনিধি | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ

ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে বঙ্গোপসাগর উপকূল। নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকে কক্সবাজারের টেকনাফসেন্টমার্টিন থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা গহীরা উপকূল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকাজুড়ে জলদস্যুদের ভয়ংকর অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বুধবার বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুর গুলিতে কুতুবদিয়ার শাহাদাত হোসেন খোকন (১৭) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। গত ১৫ দিনে চট্টগ্রাম ও কঙবাজার উপকূলে অন্তত ৫০টি ফিশিং ট্রলার দস্যুর কবলে পড়েছে। এতে ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধ শতাধিক জেলে আহত হয়েছে। এছাড়া বরগুনার পাথরকাটা ও খুলনার বেশ কিছু জেলে জলদস্যুর হামলায় আহত হয়ে কুতুবদিয়ায় চিকিৎসা নিচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ জলদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধিতে জেলেরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জেলেদের দাবি জরুরি ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া না হলে সাগরে জলদস্যুদের অরাজকতার ফলে মৎস্য শিকার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কুতুবদিয়ার জলদস্যু আক্রান্ত ফিশিং ট্রলার এফবি অজুফা আক্তার মানু’র মালিক জসীম উদ্দিন জানান, তার ফিশিং বোটটি ২০ জন মাঝিমাল্লাসহ বুধবার দুপুরে সাগরে মাছ ধরছিল। বেলা আনুমানিক ২টার দিকে একদল জলদস্যু বোটটিকে ধাওয়া দেয়। একপর্যায়ে দস্যুরা বোটে উঠতে না পেরে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে। এতে শাহাদত হোছাইন খোকন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বোটটি উপকূলে ফিরে আসে। পরে স্বজনরা শাহাদতকে উদ্ধার করে কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কুতুবদিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুল হক জানান, সাগরে জলদস্যুদের গুলিতে নিহত শাহাদত হোছাইনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কঙবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

কুতুবদিয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি ও ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, গত এক মাসে সাগরে বেপরোয়া জলদস্যুর কারণে মৎস্যজীবীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এই সময়ে অর্ধশতাধিক ফিশিং বোট ডাকাতির শিকার হয়েছে এবং জলদস্যুদের হামলায় তিনজন মৎস্যজীবী নিহত হয়েছে। কুতুবদিয়াসহ অন্য উপকূলীয় মৎস্যজীবী ও ফিশিং বোট মালিকদের কাছে নিয়মিত ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করছে জলদস্যু ও ডাকাত চক্র। তারা মোবাইল ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে, মুক্তিপণ দাবি করছে এবং চাঁদা না দিলে সাগরে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া বা অপহরণের হুমকি দিচ্ছে। এতে করে অসহায় মৎস্যজীবী ও বোট মালিকরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাগরে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া নিরীহ জেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এদিকে গতকাল কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের মাসিক সাধারণ সভায় উপস্থিত থেকে মহেশখালীকুতুবদিয়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ কুতুবদিয়ায় জলদস্যুর গুলিতে জেলে নিহতের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কঙবাজারের পুলিশ সুপারকে অবগত করে জলদস্যুদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ প্রদান করেন। সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার জামশেদ আলম রানা উপস্থিত ছিলেন।

অপরদিকে গত বুধবার ভোরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের ৩টি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মনি নামের এক ট্রলারের মাঝি গুলিবিদ্ধ হয়। বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে এই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ট্রলারগুলোতে থাকা ৩০ জন মাঝিমাল্লা জলদস্যুর হামলায় আহত হয়। মাঝিমাল্লাদের ভাষ্যমতে, জলদস্যুগুলো বাঁশখালী, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী এলাকার। ট্রলারে থাকা সব মাঝিমাল্লাদের মারধর করে এবং প্রয়োজনীয় মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায় জলদস্যুরা।

এদিকে গত বুধবার মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে একটি জলদস্যু গ্রুপের প্রধান জাহাঙ্গীর ও তার ৮ সহযোগীকে ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ আটক এবং ডাকাতের কবলে পড়া ৪ জেলেকে উদ্ধার করেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাউজানে সন্ত্রাস ও অপরাধ কর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন
পরবর্তী নিবন্ধগরু লুটে বাধা দেয়ায় মালিককে গুলি করে হত্যা