সাখাওয়াত হোসেন মজনু স্মরণে

মনোয়ার হোসেন রতন | বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

রমজান মাস আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির, ধ্যানমননের, স্মৃতিরও। সেই স্মৃতি যেন সময়ের প্রবাহে এক অদৃশ্য সেতু বোনা। এই পবিত্র মাসের ১৮ রমজান, ২০২১ সালে, আমার বড় ভাই সাখাওয়াত হোসেন মজনু পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। মায়ের চলে যাওয়ার মতো ১৯৭৮ সালের ১৮ রমজানে একই ভোরের, এক স্নিগ্ধ আলোয় পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গিয়েছিলেন তিনি। সময়ের ব্যবধান যতই দীর্ঘ হোক, তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি কখনও তাঁকে ভুলিয়ে দেয়নি। চট্টগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে, পাঠকের মনে, আর দৈনিক আজাদীর পাতায় তিনি আজও জীবিত। তিনি ছিলেন লেখক, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক গবেষক কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, এক নিবেদিতপ্রাণ মানবতাবাদী।

দৈনিক আজাদী পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে, সাখাওয়াত হোসেন মজনু চট্টগ্রামের পাঠকের কাছে এক আস্থার নাম। তাঁর কলাম মানেই ছিল শহরের নিত্যদিনের গল্প, সমাজের ভেতরের নড়াচড়া, সাধারণ মানুষের জীবনের টুকিটাকি ঘটনার ভেতর লুকিয়ে থাকা বড় বাস্তবতা। তিনি কখনো দূর থেকে দেখেননি, মানুষকে মানুষের ভেতর থেকে দেখেছেন; তাদের ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রত্যেক মানুষের জীবনে ছোট ছোট ঘটনাও কখনো বড় অর্থ বহন করে।

তাঁর লেখার ভাষা সহজ, কিন্তু গভীর। শব্দের কৃত্রিম ভার নেই, আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন লেখা মানে দায়বদ্ধতা, কলাম মানে সাক্ষ্য। পাঠক তাঁর লেখা থেকে শুধুমাত্র তথ্য নয়, সহযাত্রা খুঁজে পেত। চোখে চোখ রেখে কথা বলার এই ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছে। তিনি লিখেছেন যেন পাঠককে বোঝাতে নয়, বরং তাঁর সঙ্গে হাঁটতে, দেখতেও এবং অনুভব করতেও প্রলুব্ধ করে।

মুক্তিযুদ্ধ তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। সাখাওয়াত হোসেন মজনু ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন মৌলিক গবেষক। তিনি পুনরুক্ত ইতিহাসে সন্তুষ্ট ছিলেন না। দলিল, সাক্ষাৎকার, মাঠপর্যায়ের তথ্য, নির্ভরযোগ্য সূত্র সব মিলিয়ে তিনি ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর চোখে মুক্তিযুদ্ধ কখনো দলীয় বয়ান নয়; এটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। তিনি দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার গল্প শুধুমাত্র যুদ্ধে নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিকোণে।

ইতিহাসচর্চায় তাঁর সততা ছিল আপসহীন। সুবিধাজনক সত্য নয়, তিনি বেছে নিয়েছেন কঠিন সত্য। সেই কারণেই তিনি বিতর্কের মুখে পড়েছেন, কিন্তু কখনো নৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর বিশ্বাস ইতিহাস বিকৃত হলে ভবিষ্যৎ পথ হারায়, জাতি বিভ্রান্ত হয়। তাই তিনি লিখেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন; সবই সত্যের খোঁজে।

প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর লেখায় যুক্তি ছিল, আবেগ ছিল, কিন্তু উগ্রতা নেই। রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মানবিক ও বিশ্লেষণধর্মী। জটিল বিষয়কে সহজভাবে বোঝানোর দক্ষতা তাঁকে সাধারণ পাঠক ও গবেষক উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে। তাঁর কলামে কখনো উচ্চারিত অভিমান নেই, শুধুই গভীর দৃষ্টি।

গ্রন্থকার হিসেবেও পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণামূলক রচনা, সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন এবং সমসাময়িক চিন্তাধারার লেখাগুলো তাঁকে একজন গুরুত্ববহ লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে এসব রচনা আজও মূল্যবান দলিল। ইতিহাসের শিক্ষা, সমাজচিন্তা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সবই তিনি তুলে ধরেছেন নিজের কলমের আলোয়।

কলমের বাইরেও তিনি মানবতাবাদী সমাজসেবক। প্রচারের আলো তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। নীরবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করা এসবই করেছেন তিনি। মানবতাবোধ তাঁর নীতি; ধর্ম, দল ও মত তাঁর কাছে দ্বিতীয়। মানুষকে তিনি প্রথমে মানুষ হিসেবে দেখেছেন, তারপর সব কিছু।

ব্যক্তিজীবনে সংযত, শালীন ও নৈতিকভাবে দৃঢ় ছিলেন। পরিবারে বড় ভাই হিসেবে অভিভাবকের মতো। লেখালেখির পথে হাঁটতে গিয়ে আমি ছোট ভাই বারবার শিখেছি, লেখক হওয়া মানে কেবল লেখা নয়; লেখক হওয়া মানে সময়, সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি লেখা সেই শিক্ষার নিদর্শন।

১৮ রমজানে তাঁর প্রস্থান কেবল পরিবারের শূন্যতা নয়; চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেরও অপূরণীয় ক্ষতি। আজাদীর পাতায় তাঁর কলাম আর ছাপা হবে না, কিন্তু চিন্তা, সততা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এসব রয়ে যাবে একটি মানদণ্ড হয়ে। তরুণ লেখক তাঁর কলাম খুঁজে পেলে অনুপ্রাণিত হবে; গবেষক তাঁর কাজ থেকে সঠিক ইতিহাসের আলোকে খুঁজে পাবে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে, এই লেখা কোনো আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা নয়। এটি একজন নাগরিকের শ্রদ্ধা, একজন লেখকের ঋণস্বীকার। যদি এই লেখা পড়ে কেউ তাঁর কলামের সঙ্গে আবার সংযোগ খুঁজে পায়, গবেষক তাঁর তথ্য ও বিশ্লেষণকে পুনরায় পড়ে দেখেন, তবেই স্মরণটি কার্যত সার্থক হবে।

সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ সময়ের সীমা ছাড়িয়ে যান। সাখাওয়াত হোসেন মজনু এমনই একজন। তিনি কলামের বিবেক ছিলেন, মানুষের মুখ ছিলেন। তাঁর কলম কখনো নিঃশব্দ নয়, বরং ইতিহাস ও মানবতার প্রতি বদ্ধমূল দায়িত্বের প্রতিচ্ছবি। রমজানের এই পবিত্র দিনে আমি তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমি কে? স্বাধীনতা
পরবর্তী নিবন্ধঅনন্য কাব্য ‘চলো স্বপ্ন বুনি’