শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষ পরিশীলিত হয়। সৃজন মননে এর প্রভাব বিস্তর। কারণ সংস্কৃতি হলো সমাজের জীবনধারা। আর এই জীবনধারা আবর্তিত হয় – ভাষা, কলা, সাহিত্য, জ্ঞান–বিজ্ঞান, আইন, দর্শন, রাষ্ট্র, নৈতিকতা, ধর্ম, ঐতিহ্য, রীতি–নীতি, মূল্যবোধ, প্রথা, প্রতিষ্ঠান এবং অনুষ্ঠানের মধ্যে। এ সকলের মাধ্যমেই সমাজে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে উঠে। সংস্কৃতি চর্চা এবং বিকাশে আমাদের যত্নবান হওয়া আবশ্যক। সংস্কৃতি শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম। উন্নত জীবন সম্বন্ধে, চেতনা–সৌন্দর্য্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে বোধের উন্নত বিকাশ। নিজ নিজ কৃষ্টি, ঐতিহ্য এবং ভাবধারায় অটুট থেকে তা যথাযথ পরিপালন, পরিপোষণ। নিজস্বতা হারিয়ে কাউকে খুশি করতে গেলে দুর্গতি পোহাতে হয়। সম্মুখীন হতে হয় বিপর্যয়–বিধ্বস্তির। স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য অবলোকন করা সংস্কৃতির কাজ। সৌন্দর্য্যবোধের উন্মোচন, প্রতিভার বিচ্ছুরণ, নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা প্রদর্শন সংস্কৃতিবান লোকের বৈশিষ্ট্য। আত্মার শুদ্ধতা, পরিপুষ্টিলাভ বিকাশ ও বিস্তার শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চায় সম্ভব। এর মাধ্যমে আসে মানবজীবনের পরিপূর্ণতা। সমাজ ও রাষ্ট্রে বজায় থাকে শান্তি শৃংখলা। সাংস্কৃতিক কর্মীরাই এগিয়ে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকটে। অন্যায়–অবিচার প্রতিরোধে। আন্দোলন সংগ্রামে নিজেদের সম্পৃক্ত করে তা‘কে বেগবান করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা ছিল লক্ষ্যণীয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত সাংস্কৃতিক কর্মীরা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ত প্রাণিত, উজ্জীবিত করেছে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রিয় স্বদেশকে পরাধীনতার শৃংখল মুক্তিতে। সংস্কৃতির লালন, সাংস্কৃতিক কর্মীদের পরিপালনে রাষ্ট্রের আরো মনোযোগী হওয়া অত্যাবশ্যক। শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরী এবং তার প্রচার প্রসারে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দায়িত্ব নিতে হবে আন্তরিকতায়। শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার পথ রুদ্ধ হলে তা‘র জায়গা দখল করবে অপসংস্কৃতি। যুক্ত হয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ। দেখা দেয় চেতনার পচন। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিনষ্টি। অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় পতন। পতন থেকে রক্ষা পেতে হলে মানুষের বিকাশকে বড় করে দেখতে হবে। প্রয়োজন শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির অবাধ চর্চা এবং তা প্রচার ও প্রসারে অধিক যত্নবান হওয়া। সংস্কৃতির উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবনের বিকাশ ঘটিয়ে পতন থেকে রক্ষা করা। সংস্কৃতির বিকাশ এবং অধিকতর ক্রিয়াশীল করে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁরা নিয়োজিত তাঁদের। সামাজিক স্তরবিন্যাসে যাঁরা উঁচুস্তরে সমাসীন তাঁরাই সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে অধিকতর ক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। যে সংস্কৃতি আমার কৃষ্টি, ঐতিহ্য রক্ষায় মনোযোগী নয় বা যার চর্চায় নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, আধুনিকতার নামে উচ্ছৃংখলতা পরিদৃষ্ট হয় তা সর্ব্বৈ বর্জনে আরো বেশি যত্নশীল এবং আন্তরিক হওয়া জরুরি।
বর্তমানে বিজাতীয় সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ ও আগ্রাসন আমাদের সমাজজীবনে ক্রমশ ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী ও দেশজ সংস্কৃতির উপাদানগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বিকৃত তথ্য, বিভ্রমকর বিনোদন আর এদেশের মাটির সাথে সম্পর্কহীন অপসংস্কৃতির বিশাল সর্বগ্রাসী ও বহুমাত্রিক জাল নিকষ অন্ধকারে পর্যবসিত করছে ক্রমাগত। বিভেদ, বৈষম্যের অসম প্রতিযোগিতায় জনজীবন দুর্বিষহ। মানবিকতাবোধের বিপর্যয়, অনাচার, অশ্লীলতা, বৈষয়িক সম্পদ লাভের অদম্যস্পৃহা, আত্মকেন্দ্রিকতা, প্রতারণা সমাজে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। সৃজন মননচর্চায় বৈকল্য ডেকে এনেছে। বিলাসের কৃত্রিম চাহিদায় বিজাতীয় সংস্কৃতি, ভাবধারা, রুচি, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের অনুপ্রবেশ কাম্য নয়। অনুপ্রবেশ ঘটুক নিজের পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে সংযুক্তি রেখে, দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সমুন্নত রেখে। দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে যথাযথ মনোনিবেশ অপসংস্কৃতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। রুটিন দায়িত্ব পালনে সংস্কৃতিচর্চা আবদ্ধ থাকলে সমূহ বিপদ। সরকার, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্টরা আরো বেশি আন্তরিকতায় সক্রিয় হয়ে সুস্থ, সুন্দর প্রিয় স্বদেশ হয়ে উঠুক বাঙালি সংস্কৃতিময়। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তরণ ঘটুক। দেশীয় সংস্কৃতিচর্চায় প্রজন্ম গড়ে উঠুক। তার উপর ভিত্তি করে উৎকর্ষতা লাভ করুক আন্তর্জাতিকতায়।
লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক।











