সরকারের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা

ঝুঁকিতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান

| বুধবার , ৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, ফ্লাইট সংকট, ভিসা জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার শঙ্কায় এরই মধ্যে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার হার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার হার নেমে এসেছে প্রায় একচতুর্থাংশে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধস নামবে। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভস প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান পত্রিকান্তরে বলেন, শ্রমবাজারে এই যুদ্ধের প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে গত কয়েক বছরে গড়ে ১০১১ লাখ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। মাসে গড়ে ১ লাখ মানুষ বিদেশে গেছেন। যার মধ্যে ৭০৮০ হাজারই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট সমস্যায় তাদের বড় একটি অংশ যেতে পারছেন না। এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ভাটা পড়বে।

জানা যায়, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটাই সৌদি আরবনির্ভর। ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রবেশ একেবারেই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। বিএমইটির তথ্যানুসারে ২০২৫ সালে ১১ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজের উদ্দেশে বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখেরও বেশি কর্মীর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। কিন্তু এখন যুদ্ধাবস্থার কারণে সেখানেও যেতে পারছেন অন্য সময়ের একচতুর্থাংশ।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্রের হারে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ওই বছরের ১ এপ্রিল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের জন্য ৮০ হাজার ৭০২ জন, কাতারের জন্য ৯ হাজার ৬৫ জন, কুয়েতের জন্য ২ হাজার ৪৩৭ জন, জর্ডানের জন্য ১ হাজার ১৪০ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ২৫৩ জন ছাড়পত্র নিয়েছিলেন। অন্যদিকে চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত সৌদি আরবে ২৪ হাজার ৫১৮ জন, কাতারে ৩ হাজার ৯৭৩ জন, কুয়েতে ১ হাজার ৫৩৬, জর্ডানে ৯৮৭ জন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ৬২১ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। আমাদের মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশই যায় সৌদি আরবে। শ্রমবাজারের দ্বিতীয় স্থানে কাতার, চতুর্থ কুয়েত, ষষ্ঠ আরব আমিরাত এবং সপ্তম স্থানে রয়েছে জর্দান। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশেই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে আমাদের শ্রমবাজার। বর্তমানে আতঙ্কে আছেন প্রবাসীরা। অনেকেই ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। আর এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে। জানা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক মন্দা বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব বাংলাদেশি বসবাস করছেন, তাদের কাজ ও আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অনেকে দেশে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারবেন না। এতে দেশের রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক ধাক্কা আসতে পারে। ইরানে প্রায় ৮০৯০ হাজার বাড়িঘর স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। বাংলাদেশ যদি তার নিরপেক্ষ অবস্থান রাখতে পারে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের এখন প্রয়োজন এই বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। যারা বিদেশে যেতে পারছে না, তাদের তালিকা করা; আপডেট রাখা এবং বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যাওয়া যেন ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও যাওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা নতুন শ্রমবাজারে মনোনিবেশ করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে একটি অঞ্চল ঝুঁকিতে পড়লে দেশের শ্রমবাজারে কোনো প্রভাব না পড়ে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে