সরকারি বেতন বেড়ে দ্বিগুণের বেশি

মন্ত্রিসভায় অনুমোদন সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ১ জুলাই থেকে তিন ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত পেনশন বাড়ল সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ, সর্বনিম্ন ৫৫

| মঙ্গলবার , ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ

সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে সরকারি চাকুরেদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। তাতে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। বিসিএস দিয়ে যারা প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তারা এ গ্রেডে বেতন পান।

অপরদিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার (নির্ধারিত) থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ গ্রেডে বেতন পান। সেই সঙ্গে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ও আর্থিক সুবিধা বাড়ানোরও অনুমোদন দেওয়া হয়।

বছর কয়েক ধরে আলোচনার পর গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি চাকুরেদের কাঙ্ক্ষিত এ জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করার তথ্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ১ জুলাই থেকে তিন ধাপে এ বেতন কাঠামো কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ২০তম থেকে ১০তম গ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। নতুন এ বেতন স্কেলের সঙ্গে মিল রেখে সশস্ত্রবাহিনীর জন্য আলাদা বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। এটিও ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। খবর বিডিনিউজের।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন এ বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ সংকুলানে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো ঠিক করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন যে প্রস্তাব করেছিল সেটিই সামান্য কাটছাঁট করে বিএনপি সরকারের অনুমোদন পেয়েছে।

২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর ওই বেতন কমিশন গঠন করা হয়। এ বছর ২১ জানুয়ারি কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ওই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি ২০২৬২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে এবং আগামী ২০২৭২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে এ কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। এর কারণ হিসেবে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপর প্রভাব বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্বল্প আয় বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬এর আওতায় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭ এ মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং ভাতাসমূহ ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২০ দিন আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। বেতন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ বরাদ্দ করে যাওয়ার কথা তখন বলেছিলেন তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। পে কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছে তা পরীক্ষা করার জন্য কমিটি করে দেওয়ার কথা তিনি বলেছিলেন।

বিএনপি সরকার গঠন করার পর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়। একই সঙ্গে আগের সরকারের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অর্থের সংস্থান না থাকায় এটি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় নেয়। এছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাড়তি দামে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও সরকারের খরচ বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরুর আগ্রহের আলোচনার সময় তাদের তরফে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অর্থ সংকুলান নিয়ে প্রশ্ন এসেছিল।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এসব বিবেচনায় সেই সুযোগ থাকছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় সরকারি চাকুরেদের জন্য নবম এ বেতন কাঠামো অনুমোদন করল তারেক রহমানের সরকার।

সরকারের ভাষ্য, জাতীয় বেতন কমিশন২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি২০২৫ এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সেগুলোর ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদন গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিস্তারিত পর্যালোচনার পর সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে।

কোন গ্রেডে কত : নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের মধ্যে ১:৭৮ অনুপাতে পার্থক্য রাখা হয়েছে। বর্তমানে যা ১:.০৭৬। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বাড়ি ভাড়াসহ মূল বেতনের সঙ্গে সব ভাতা যোগ হবে।

পেনশনভোগীদের কী হলো? : বর্তমান চাকুরেদের পাশাপাশি একইভাবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার স্তর অনুযায়ী নিট পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা এর নিচের নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তদূর্ধ্ব নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে। এর ফলে যেসব পেনশনভোগী দীর্ঘদিন পূর্বে অবসরে গেছেন এবং যারা তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি হবে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন তারা। তাছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতদিন শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সকল গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাবেন।

জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি : জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো ঠিক করতে পৃথক কমিটি গঠন করার তথ্য দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, এ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। তবে তারাও ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন পাওয়া শুরু করবেন, যা ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমন করা সম্ভব হবে।

নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকার পাবেন। এজন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর সংস্থান মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরসমূহের বাজেটে রাখা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে; যেখানে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসরপরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান দেওয়া থাকবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ