সরকারি ডিপোতে হিসাবের বাইরে ডিজেলের মজুত

যমুনা অয়েলের মোংলা ডিপোতে অভিযান । ১২ হাজার ৬১৩ লিটার ডিজেল বাড়তি পাওয়া গেছে । ডিপো ম্যানেজার বরখাস্ত, তেল সরবরাহ বন্ধ, তদন্ত কমিটি

হাসান আকবর | সোমবার , ৩০ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

জ্বালানি খাতে চলমান অস্থিরতার মাঝে এবার সরকারি তেল ডিপোতে মিলেছে হিসাবের বাইরে গোপনে মজুত করা বিপুল পরিমাণ ডিজেল। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মোংলা ডিপোতে যৌথ অভিযানে এই অনিয়ম ধরা পড়ে। অভিযানের খবর পেয়ে ডিপো ম্যানেজার আল আমিন খান পালিয়ে যান। গোপন মজুতসহ হিসাবের অনিয়মের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ এই ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ডিপোটির তিনটি ট্যাংকে হিসাবের বাইরে ১২ লাখ টাকার ১২ হাজার ৬১৩ লিটার ডিজেল বাড়তি পাওয়া গেছে। অবৈধ মজুতদারির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ডিপো ম্যানেজার মোহাম্মদ আল আমিন খানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে যমুনা অয়েল কোম্পানি তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।

সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার রাত পৌনে ১টার দিকে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে জেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, এনএসআই এবং পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানকালে ডিপোর ম্যানেজার (অপারেশন্স) মোহাম্মদ আল আমিন খানকে ডিপোতে পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি পালিয়ে যান। অভিযানকারী দলের পক্ষ থেকে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি খুলনায় অবস্থান করছেন বলে জানান। পরে কোম্পানির কম্পিউটার অপারেটর (অস্থায়ী) মোহাম্মদ ফারুক হোসাইন দৈনন্দিন রিপোর্টসহ অন্যান্য রেজিস্টার উপস্থাপন করেন। সেই সময় মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের ইনচার্জ এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ম্যানেজার (অপারেশন্স) প্রবীর হীরা উপস্থিত হন। রেজিস্টার ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে উপস্থিত কর্মকর্তাবৃন্দ যমুনা অয়েল কোম্পানির গেজারম্যান মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান, নৌবাহিনীর বানৌজা মোংলার এসএইচএ আবুল কাশেমের সহায়তায় মেজারিং টেপ দিয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ১, ৯ ও ১৪ নম্বর ট্যাংকের ডিজেল পরিমাপ করা হয়। সরেজমিনে তথ্যাদি সংগ্রহ করে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ম্যানেজার (অপারেশন্স) প্রবীর হীরা প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে ট্যাংকসমূহের ডিজেলের পরিমাণ হিসাব করতে সহযোগিতা করেন। উল্লেখ্য, মোংলার এই ডিপোতে পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানির অপারেশন কার্যক্রম পৃথকভাবে পরিচালনা করা হয়।

কাগজপত্র যাচাই এবং প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যমুনা অয়েল কোম্পানির ম্যানেজার (অপারেশন্স) মোহাম্মদ আল আমিন খানের ২৮ মার্চ প্রেরিত ও অফিসে রক্ষিত স্টেটমেন্টের সাথে বাস্তবে ন্যাচারাল টেম্পারেচারে পাওয়া ডিজেলের (এইচএসডি) পরিমাণে গোঁজামিল ধরা পড়ে। এতে ১ নম্বর ট্যাংকে ২৫৮৯ মিলিমিটার ডিপ পাওয়া যায়। ক্যালিব্রেশন চার্ট অনুযায়ী এই ট্যাংকে তেল পাওয়া যায় ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৪৭ লিটার। কিন্তু ডিপো ম্যানেজার এই ট্যাংকে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৮১৫ লিটার তেল থাকার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করেন। এই ট্যাংকে বাড়তি তেল পাওয়া যায় ৯৩২ লিটার। একইভাবে ৯ নম্বর ট্যাংকে ৭৯৪২ মিলিমিটার ডিপ পাওয়া যায়। ক্যালিব্রেশন চার্ট অনুযায়ী এই ট্যাংকে তেল পাওয়া যায় ২৪ লাখ ২০ হাজার ৪৯৫ লিটার। কিন্তু ডিপো ম্যানেজারের রিপোর্টে জানানো হয়, এই ট্যাংকে তেল রয়েছে ২৪ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ লিটার। এই ট্যাংকে বাড়তি তেল পাওয়া যায় ১২ হাজার ৮১৮ লিটার। ১৪ নম্বর ট্যাংকে ডিপ পাওয়া যায় ৮৫৫ মিলিমিটার। ক্যালিব্রেশন চার্ট অনুযায়ী এতে তেল পাওয়া যায় ১২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫৫ লিটার। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এই ট্যাংকে ১২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৯২ লিটার তেল রয়েছে। এই ট্যাংকে রিপোর্টের চেয়ে ১ হাজার ১৩৭ লিটার ডিজেল কম রয়েছে। তিনটি ট্যাংক মিলে মোট ১২ হাজার ৬১৩ লিটার ডিজেল হিসাবের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। ডিজেলগুলোর বাজারমূল্য ১২ লাখ ১০ হাজার ৮৫০ টাকা।

ঘটনার প্রেক্ষিতে যমুনা অয়েল কোম্পানির মোংলা ডিপো ম্যানেজার (অপারেশন্স) মোহাম্মদ আল আমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে যমুনা অয়েল কোম্পানি সূত্র নিশ্চিত করেছে। একইসাথে এই ডিপো থেকে যমুনা অয়েল কোম্পানির জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে হিসাবের বাইরে অতিরিক্ত ডিজেল পাওয়ার ঘটনায় তদন্তে নেমেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অসঙ্গতির কারণ অনুসন্ধান এবং প্রকৃত মজুদ যাচাই করতে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের ডিজিএম (অডিট) মোহাম্মদ জোবায়ের চৌধুরীকে। সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ম্যানেজার (অ্যাডমিন) ও ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস) ফয়েজ আহাম্মদ রউফকে। এছাড়া ঝালকাঠি বার্জ ডিপোর সিনিয়র অফিসার মো. আবুল বাশারকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের জ্বালানি তেলের বাস্তব মজুদ পুনরায় যাচাই ও পরিমাপ করার পাশাপাশি সংরক্ষিত স্টক রেজিস্টার এবং যৌথবাহিনীর পরিমাপে পাওয়া ডিজেলের পরিমাণের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তার দায়দায়িত্ব নিরূপণ করতে বলা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপমহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরিত এই আদেশ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সরকারি ডিপোতে থাকা হিসাবের বাইরে এই ডিজেল অবৈধভাবে মজুত করা হয়েছিল উল্লেখ করে সূত্রগুলো বলেছে, তেলের এই চালানটি একদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে মোংলা পাঠানো হয় বলে যমুনা অয়েল কোম্পানির একটি সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, এসব তেল চোরাপথে বিক্রি করে দেওয়া হতো। জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোতে এই ধরনের অপকর্ম নিয়মিত চলে আসছে। হিসাবের বাড়তি তেলগুলো বাংকারিংসহ জ্বালানি খাতের সংঘবদ্ধ সাগরকেন্দ্রিক চোরচক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

জ্বালানি তেল নিয়ে দেশব্যাপী বিরাজমান অস্থিরতার মাঝে সরকারি ডিপোতে অবৈধ মজুতদারির ঘটনা উদ্‌ঘাটনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর অন্যান্য ডিপোতেও একইভাবে তেলের অবৈধ মজুত গড়ে তোলা হয়েছে কিনা যৌথ অভিযানের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে। কোস্ট গার্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র বিভিন্ন পর্যায়ে তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও বন্দরনির্ভর এলাকায় এ ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি বেশি থাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি ডিপোতে অনিয়মের ঘটনা জ্বালানি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও অভ্যন্তরীণ চক্র মজুতদারির মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে পরিবহন ও শিল্প খাত পর্যন্ত সবখানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, জ্বালানি খাতে এই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে শুধু যৌথ অভিযান নয়, ডিজিটাল মনিটরিং, স্টক ম্যানেজমেন্টের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে সুফল মিলবে। বৈশ্বিক অস্থিরতার সুযোগে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট যাতে প্রকট না হয় তা নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু মনিটরিং জরুরি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআবারও জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জন করল চট্টগ্রাম বন্দর