সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ । কন্টেনার পরিবহনে নতুন করে সারচার্জ আরোপ । আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও শিপিং খাতে উদ্বেগ

হাসান আকবর | শনিবার , ৭ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি কন্টেনার পরিবহনে নতুন করে সারচার্জ আরোপ করেছে। এতে বাংলাদেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্য ও শিপিং খাতে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবং সেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে অনেক শিপিং লাইন। ফলে নতুন চালান পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে বন্দরে বা জাহাজে থাকা মধ্যপ্রাচ্যগামী কন্টেনারগুলোর উপর অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে।

শিপিং সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৪ টন ধারণক্ষমতার একটি সাধারণ কন্টনারে নতুন করে ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। হিমায়িত পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত রেফার কন্টনারে ১৬শ ডলার থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের কন্টেনার পরিবহন খাতে শীর্ষে থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ইতোমধ্যে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক মার্স্ক লাইন, সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি বা এমএসসি, ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম এবং জার্মানির হেপাক লয়েড। এর মধ্যে সিএমএ সিজিএম গত ৩ মার্চ ঘোষণা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩টি দেশে পণ্য পরিবহনে ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করেছে। এমএসসি আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কন্টেনারে ৮০০ ডলার বাধ্যতামূলক সারচার্জ নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে মার্স্ক লাইন উপসাগরীয় সাতটি দেশে প্রতি কন্টেনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে এবং হেপাক লয়েড প্রতি কন্টেনারে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নানা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ, নাবিকদের নিরাপত্তা এবং জাহাজকে ঘুরপথে চালিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর বাড়তি ব্যয়এসব কারণেই বড় শিপিং লাইনগুলো সারচার্জ আরোপ করছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই খরচ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর জন্য প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের পণ্য পাঠানো হয়। গামছা, মুড়ি, বিস্কুট, সুপারি, সবজি, মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য কন্টেনারে করে ওইসব দেশে যায়। কিছু পণ্য আকাশপথেও রপ্তানি করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিবহন ব্যবস্থাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আরব উপসাগরমুখী কিছু জাহাজ সমুদ্রে আটকে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এসব জাহাজকে নিকটবর্তী নিরাপদ বন্দরে খালাস করা হতে পারে। এতে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হবে, যা পুষিয়ে নিতে শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন সারচার্জ আরোপ করছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। এই পথ দিয়েই ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন হয়। লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলে পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকলেও অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যত বিকল্প সমুদ্রপথ নেই।

শিপিং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বাড়ে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, তাহলে জাহাজগুলোকে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ ও আমেরিকামুখী যাত্রা করতে হতে পারে। এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব, সময় এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজ পণ্য বাল্ক কার্গো জাহাজে এলেও শিল্পের কাঁচামালসহ অনেক পণ্য কন্টেনারে পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে রপ্তানির তালিকায় রয়েছে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফলমূল, শাকসবজি, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু শিপিং খাতে নয়, বাংলাদেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবদর দিবস : অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠার আদর্শিক লড়াই
পরবর্তী নিবন্ধচারদিকে তামাক, মাঝে স্ট্রবেরি