পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশে নিট এফডিআই বাড়লেও নতুন বিনিয়োগ আসা কমেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে করোনাকাল থেকেও নতুন বিনিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)-এ খরা থাকলেও প্রতিযোগী দেশগুলো ঠিকই পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৪২ কোটি ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বিদায়ী অর্থবছরে তা ১৯ শতাংশ বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। মূলত বিদেশি কোম্পানির বিদ্যমান ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফা আবার বিনিয়োগ এবং সহযোগী কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়া বৃদ্ধির কারণে নিট এফডিআই বেড়েছে। অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ বা ইকুইটি ক্যাপিটাল কমেছে। বিদায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন এ বিনিয়োগ তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। করোনাকালে ২০২০–২১ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ এসেছিল ৭২ কোটি ডলার। পরের বছর তা বেড়ে হয় ১১৪ কোটি ডলার। ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ আসে যথাক্রমে ৭১ ও ৬৭ কোটি ডলার। বাংলাদেশ না পারলেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ এফডিআই পাচ্ছে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাচ্ছে। যদিও দুই বছর আগেও এফডিআই আনায় দেশটি বাংলাদেশের পেছনে ছিল।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। সে বছর ভারত ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ ও ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এনেছে। দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের এফডিআই তিন বছর ধরে বেড়েছে। এদিকে ২০২২ সালে বাংলাদেশ এফডিআই পেয়েছিল ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আর পাকিস্তান ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। পরের বছরই পাকিস্তান বাংলাদেশকে টপকে যায়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে ১ বিলিয়ন ডলার বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া আর্থিক খাতে অনেকটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনও ঠেকানো গেছে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক করা যায়নি। উল্টো নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের হারও নিম্নমুখী। আবার অনেক ছোট–মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বিদেশি বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে একটি দেশ রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। দেশের বাইরের কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি যখন আমাদের দেশে অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে, তখন আমাদের দেশের অর্থনীতি আরও সচল হয়ে ওঠে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন হয়, বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশীয় কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতেও সহায়তা করে থাকে। এতে অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন খাতের অবকাঠামো উন্নয়নেও বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে ও দ্রুত সময়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন তার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তারা যাতে ব্যবসায়িক লভ্যাংশ সহজ প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারেন তার জন্য ডিজিটাল সেবা চালু রাখতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের বিনিয়োগ করা কোনো প্রতিষ্ঠানে সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে তা দ্রুততার সঙ্গে সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির জন্য গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বড় কোনো সংস্কার করতে পারেনি। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নতি না হওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে চলমান ব্যবসা–বাণিজ্যে গতি নেই। সে জন্য দেশে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না।
তাঁরা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। শুরুতে ভিন্নমাত্রার পদক্ষেপ নিয়েছিল। আমরা আশা করেছিলাম, ব্যবসা–বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতি করতে সাহসী সংস্কার করবেন। তবে গত দেড় বছরে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।’ তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যবসায়ের সব বাধা দূর করে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।







