আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প’এর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে পুরা পৃথিবী বিচলিত এবং বিস্ময়ের সাথে তার র্কীর্তি কলাপ অবলোকন করে যাচ্ছে। এর মাঝে ২১ জুন ২০২৫ ইরানী পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ পরিচালনা, গাজায় ক্রমাগত গণহত্যায় ইসরাইলীদের মদদ দান, আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন কানুন লঙ্ঘন করে সাম্প্রতিকের ভেনেজুয়েলা অভিযান এবং সে দেশের প্রেসিডেন্টকে আটক করে নিয়ে আসা অতঃপর নিজেকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা, গ্রীনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়া, কিউবাকে সমঝোতায় আসার অথবা পরিণতির জন্য তৈরী থাকার হুমকি, ইরানের চলমান অভ্যন্তরীণ আন্দোলনে ইন্ধন, আমি যা বলি এবং করি সেটাই আইন, এ ধরনের রাজকীয় ঘোষণা, এসব মিলিয়ে পৃথিবী এখন এক অভাবনীয় অস্থির সময় অতিক্রম করছে।
আমেরিকার এই আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে এর পিছনের বেশ কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। এর মাঝে রয়েছে আমেরিকার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং একই সাথে পৃথিবীর সম্পদ অধিগ্রহণের অভিলাষ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পরবর্তী সময় বিশ্ব শীতল যুদ্ধকালীন সময়ের বাই পোলার থেকে ইউনিপোলার এ উপনীত হয়েছিল। এটি আমেরিকানদের জন্য স্বস্ত্তি বয়ে এনেছিল। সে অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চীন তার উত্থানের মাধ্যমে বিশ্বকে জানান দেয় বিশ্ব ইউনিপোলার নয় বা আমেরিকার একক কর্তৃত্বাধীন নয় বিশ্ব এখন বাইপোলার। এর পর পরই পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার পুনরুত্থানে বিশ্ব জেনে যায় বিশ্ব এখন ইউনিপোলার বা বাইপোলার নয় বিশ্ব এখন মাল্টিপোলার।
এর মাঝে চীনের বিশ্ব ভূ–রাজনীতিতে আগ্রাসী ভূমিকা, রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানে সমস্ত ইউরোপকে প্রায় কাবু করে রাখার মাঝে আমেরিকা তার ভূ–রাজনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নানা ধরনের আশঙ্কার অনুসঙ্গ অনুভব করে। একই সাথে আমেরিকা রাশিয়া, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়ার সখ্যতার মাঝেও তার জন্য বিপুল ঝুঁকির গন্ধ খুঁজে পায়। রাশিয়া চীনের সখ্যতার মাঝে আমেরিকার বিপদ বিষয়টি আমেরিকার লিজেন্ডারী কূটনীতিক হেনরী কিসিঞ্জার ৭০ এর দশকে আঁচ করতে পেরেছিলেন। এ বোধ থেকেই সম্ভবত ১৯৭১ সালের ৯ জুলাই হেনরী কিসিঞ্জার অত্যন্ত সংগোপনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সহায়তায় চীন সফরে গিয়েছিলেন। তখন হেনরী কিসিঞ্জার’এর লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাগে আনতে চীনকে সাথে পাওয়া। আমেরিকার সে কূটনীতি তেমন একটা সফল হয়নি। এর পিছনের মূল কারণ হিসাবে দেখা যেতে পারে আমেরিকানদের বিশ্ব কূটনীতি এবং অর্থনীতি দুটোতেই প্রভাব বিস্তারের উদগ্র উলঙ্গ আকাঙ্ক্ষা। ফলত আমেরিকার চীনের সাথে সেই গাঁটবন্ধন আর হয়ে উঠেনি। বরং এই গাঁটবন্ধন হয়েছে চীন রাশিয়ার মধ্যে।
২০২৫ এর ৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর চীনের তিয়ানজিয়ানে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো–অপারেশন কাউন্সিল এর সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং আমেরিকাকে স্পষ্ট ইঙ্গিত করে ঘোষণা করেন চীন কারো Bullying বা Intimidating বা চীন কারো ধমক বা ভয় দেখানোকে পরোয়া করে না। আমেরিকার বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Prof Jeffrey Sachs (অধ্যাপক স্যাক্স) এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞানী John Mearshemer (অধ্যাপক জন মারসিমার) এর মত চিন্তাশীল মানুষেরা তিয়ানজিয়ানের সাংহাই কো–অপারেশন কাউন্সিল’এর ফলাফলকে আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির স্পষ্ট বিপর্যয় হিসাবে বিবেচনায় নিয়েছেন।
চীন রাশিয়া ইরান উত্তর কোরিয়ার গাঁটবন্ধন যে কার্যকর এবং ফলপ্রসূ হয়েছে তার প্রমাণ ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধে চীন তার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নিয়ে, ইরান প্রযুক্তি এবং উত্তর কোরিয়া স্ব সৈন্যে রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে। এটা নিশ্চয়ই আমেরিকান কৌশল প্রণেতাদের দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
এ ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে ১১ জানুয়ারী ২০২৫ ন্যাটো কমান্ডারের সুইডেনের স্টকহোমে দেওয়া এক বিবৃতিতে। এখানে তিনি সরাসরি রাশিয়া, চীন এবং ইরানের নাম উল্লেখ করে বলেছেন এইসব দেশ আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ত্তুতি নিচ্ছে। ন্যাটো এবং আমেরিকানদের এই যুদ্ধ ভাবনায় এবং উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনায় গ্রীনল্যান্ড এক অন্যতম অঞ্চলের নাম। এ থেকেই হয়ত আমেরিকান প্রেসিডেন্টের গ্রীনল্যান্ড দখল করার তোড়জোর শুরু করে দিয়েছেন। এই দখল ইচ্ছার বিরুদ্ধে ডেনমার্কের সোস্যাল ডেমোক্রেট পার্টির প্রধান এবং সেদেশের প্রধান মন্ত্রী ম্যাটে ফ্রেডেরিকসন ঘোষণা করেছেন ‘স্যুট ফাস্ট, টক লেটার’ অর্থাৎ গ্রীনল্যান্ডে হাত বাড়ালে আগে যুদ্ধ পড়ে আলোচনা। ইতিমধ্যে জার্মানী, ফ্রান্স প্রকাশ্যে ঘোষণার মাধ্যমে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়টি ন্যাটো এবং আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে নিশ্চিতভাবে।
যে গ্রীনল্যান্ড নিয়ে ভূ–রাজনীতিতে এ ভূকম্পন তা নিয়ে এখানে কিছুটা আলোচনা করা বাঞ্চনীয়। গ্রীনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলের একটি বিশাল দেশ বা ভূ–খণ্ড। আর্কটিক অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে রয়েছে কানাডা, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া, সুইডেন, আমেরিকা এবং ডেনমার্ক। ডেনমার্কেরই শাসনাধীনে গ্রীনল্যান্ড। আর্কটিক সাগর আর নর্থ আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে গ্রীনল্যান্ডের অবস্থান। ২.১৬ মিলিয়ন স্কোয়ার কিলোমিটারের গ্রীনল্যান্ড ভূমির দিক থেকে পৃথিবীর ১২ তম বৃহৎ দেশ। এই বিরাট দেশে মানুষের বাস মাত্র আটান্ন হাজার। অষ্ট্রেলিয়ার পর এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ দেশ। গ্রীনল্যান্ডে সূর্য কখনো অস্ত যায় না আবার কখনো সূর্য দেখা যায় না।
গ্রীনল্যান্ডের আমেরিকা বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে এক বিশাল ভূমিকা। এখানে আমেরিকার ঝুঁকি পর্যালোচনায় অন্য যেকোনও পরাশক্তির অবস্থান তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নাজুক করে তুলবে। কারণ গ্রীনল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকার অবস্থান সবচেয়ে নিকটবর্তী। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অতীতে আমেরিকা গ্রীনল্যান্ড নিজেদের অধিকারে নেওয়ার বহু প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। আমেরিকা ১৮৮৭, ১৯১০, ১৯৪৬, ১৯৫৫, ২০১৯, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে ডেনমার্কের সাথে আলোচনায় বসে। এইসব আলোচনায় বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা পালনকারীদের মাঝে আমেরিকার সেই সময়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রী উইলিয়াম এইচ শেওয়ার্ড, জেমস এফ বায়ার্নস, ভাইস প্রেসিডেন্ট রকফেলার এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনায় আমেরিকানরা গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্ক থেকে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ডেনমার্ক বরাবরই উত্তর দিয়ে এসেছে ‘গ্রীনল্যান্ড নট ফর সেল’ গ্রীনল্যান্ড বিক্রয়ের জন্য নয়। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা শক্তি প্রয়োগে গ্রীনল্যান্ড দখলের হুমকিও দিয়ে রেখেছে এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অহরহই তা দিয়ে যাচ্ছেন।
এই আলোচনা এবং শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান আমেরিকা গ্রীনল্যান্ডকে নিয়ে তার প্রতিরক্ষা ঝুঁকি বা পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে আমেরিকা ‘মনরো ডকট্রিন’ অনুযায়ী গ্র্যীনল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। এটি করা হয়েছিল জার্মানীকে সহজ উপায়ে আমেরিকা আক্রমণ থেকে বিরত রাখার জন্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আমেরিকান সেনাবাহিনী গ্রীনল্যান্ডে তাদের অবস্থান বজায় রাখে। ১৯৪৮ সালের দিকে ডেনমার্ক আমেরিকাকে গ্রীনল্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার জোরাজুরি থেকে কিছুটা সরে আসে। ১৯৪৯ সালে ডেনর্মাক এবং আমেরিকা উভয়েই ন্যাটোর সদস্যপদ গ্রহণ করে। ১৯৫১ সালের দ্বি পাক্ষিক এক চুক্তি আমেরিকাকে গ্রীনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখার অবকাশ সৃষ্টি করে দেয়। ১৯৫৩ সালে ঐ চুক্তির আলোকে আমেরিকা গ্রীনল্যান্ডে তাদের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করে। উত্তর গ্রীনল্যান্ডের ‘পিটুফিক’ সামরিক ঘাঁটি এরই ফলশ্রুতি।
GIUK Gap বা গ্র্যীনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং ইউনাইটেড কিংডম গ্যাপ। উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এই গ্যাপ অন্যতম একটি বিবেচ্য এবং ঝুঁকির বিষয়। ভবিষ্যৎ যুদ্ধকালীন সময়ে শক্র পক্ষ যাতে এই গ্যাপ ব্যবহার করে উত্তর আমেরিকাকে চরম ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে না পারে তার জন্যও আমেরিকা গ্রীনল্যান্ড দখলে নিতে এখন মরিয়া। সমরবিদরা গ্রীনল্যান্ডের ২৭০০০ (সাতাশ হাজার) কিলোমিটার সমুদ্র সীমাকে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ‘সিকিউরিটি ব্লাক হোল’ হিসাবে বিবেচনা করেন। এর বাইরে গ্রীনল্যান্ডে রাশিয়ান পারমাণবিক শক্তি চালিত যুদ্ধ জাহাজগুলির নিরন্তর আনাগোনা এবং চীন রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা আমেরিকার জন্য এই ব্লাক হোল দিন দিন উৎকণ্ঠা –উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর মাঝে সাগর তলের যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও বিস্তৃত তারগুলো আমেরিকার উদ্বেগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। রাশিয়ার সাবমেরিন সমূহ ঐ যোগাযোগ ব্যবস্থায় আড়ি পাততে সক্ষম এমনকি যুদ্ধ বাধলে সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা তারা বিচ্ছিন্নও করে দিতে পারে। এ কারণে গ্রীনল্যান্ডে উপস্থিতি আমেরিকার জন্য এত প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০২১ সালে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘র্যান্ড কর্পোরেশন’ তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, যদি গ্র্যীনল্যান্ড ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা লাভ করে তবে গ্রীনল্যান্ড রাশিয়া চীন জোটের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এই সম্ভাবনা আমেরিকাকে তার প্রতিরক্ষায় গ্রীনল্যান্ডকে আরো বেশি গুরুত্ববহ করে তুলেছে।
এর বাইরে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ানদের নৌ যুদ্ধের প্রভূত সক্ষমতা, চীনের আর্কটিক অঞ্চলে ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রীনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকাকে উদ্বেগাকুল করে রেখেছে নিশ্চিতভাবে।
চীন তার পোলার সিল্ক রোড গড়ে তোলার কৌশলগত অবস্থান ঘোষণায় উল্লেখ করেছে ‘‘to understand, protect, develop and participate in the governance of the Arctic, so as to safeguard the common interests of all countries and the international community in the Arctic and promote sustainable development of Arctic” পারস্পরিক বুঝাপড়া, স্বার্থ সংরক্ষণ, উন্নয়ন সাধন, আর্কটিক অঞ্চলের প্রশাসনে অংশগ্রহণ, এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকল দেশের সাধারণ স্বার্থ রক্ষা এবং এই অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন সাধন ‘ পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে আমেরিকার ‘সিকিউরিটি ব্লাক হোল’ চীনের ‘পোলার সিল্ক রোড’ রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে বিপুল নৌ শক্তির উপস্থিতি বিশ্বের বুকে গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স ছাড়া অন্য কিছু নয়। বলা বাহুল্য এই পলিটিক্সের শিকার হয়েছেন এবং হবেন হাজারো নিরপরাধ নিরীহ মানুষ এবং একারণে এটিই ট্রাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স বলে আমার কাছে অনুমিত।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট; সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












