পৃথিবী আরো একটি বর্ষ পরিক্রমণ শেষ করল। পৃথিবী তার পরিক্রমণে কালের সাক্ষী হতে আরো একটি নতুন বছরের যাত্রায় আমার তথা আজাদীর পাঠক শুভানুধ্যায়ীদের খ্রিস্টীয় নব বর্ষের শুভ কামনা।
নতুন বছরে নব যাত্রায় একজন মানুষ সচরাচর তার অতীত অর্জিত ফলাফলের দিকে পিছন ফিরে দেখে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মিলানোর চেষ্টা করে, তেমনি একটি জাতিও।
আমি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচ এস সি পাশ করার পর নানা পারিপাশ্বিকতার প্রভাব এবং চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম। ইকোনমেট্রিক্স, স্ট্যাটেস্টিকস, ডেভেলপ্টমেন্ট ইকোনমিক্স, মাইক্রো ইকনমিক্স ইত্যাদির নানা সূত্র নানা মারপ্যাচে আমি যখন প্রায় হাবুডুবু খাচ্ছি তখন ম্যাক্রো ইকনমিক্স এর সেন্ট্রাল কোশ্চেন তথা তিনটি মৌলপ্রশ্ন আমাকে মুগ্ধ এবং খুব কাছে টানে। সে তিনটি প্রশ্ন হলঃ
What to produce
How to produce and
For whom to produce
অর্থাৎ কি উৎপাদন করা হবে
কিভাবে উৎপাদন করা হবে এবং
কাদের জন্য উৎপাদন করা হবে।
এই প্রশ্নগুলো অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসাবে হলেও আমাকে বরাবরই নিজের কাছে এই তিনটি প্রশ্ন অন্যান্য উদ্ভূত বিষয়াবলীর উপরও প্রশ্ন করার একটি শক্তিশালী ভিত্তিভূমি তৈরী করে দেয়। যেমন এই চট্টগ্রাম শহরে পরিবহন ব্যবস্থায় এই মৌলিক প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হয়নি বলে গণ পরিবহনের জন্য স্কাই ট্রেন বা মেট্রোরেলের আগে এক্সপ্রেসওয়ে স্থান পেয়েছে, এই মৌলিক প্রশ্নগুলি যদি উত্থাপিত হত তবে আমি নিশ্চিত গণপরিবহনের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পেত। প্রশ্ন করার মধ্যে জানার যেমন আগ্রহ প্রকাশ পায় তেমনি কোন বিষয়ে উদ্যোগীদের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যায় এবং সে অনুযায়ী সাধারণ জনগণকেও তা অবহিত করা যায়। এ প্রেক্ষাপটে ভাল মন্দ উভয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক জনমত গঠন করা যায়। এটি বিবেচনায় রাখলে যিনি ভাল কিছু করছেন বা করায় ব্রতী হয়েছেন তার জন্য প্রশ্ন কর্তা বরং সহায়ক শক্তি হিসাবে গণ্য হবেন আর মন্দের উদ্যোগী হলে তাতে জনমত বিপক্ষে যাবে এটিও নিশ্চিত। সুতরাং প্রশ্নকর্তাকে যদি তথ্য প্রদান করা না হয় বরং তার উপর যদি বিরূপ মনোভাব পোষন করা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে উদ্যোগীদের উদ্দেশ্যের পিছনে কু-মতলব আছে।
আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৯ নভেম্বর ১৮৬৩ সালে গৃহযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সৈনিকদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতে তার বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেনthe nation would have a new birth of freedom, and that government of the people, by the people,for the people shall not perish from the earth’ এর সরল অর্থ জনগণের সরকার, জনগণ কর্তৃক, জনগণের মঙ্গলার্থে।
একটি সরকার যদি জনগণের, জনগণ কর্তৃক এবং জনগণের মঙ্গলার্থে হয় তবে সেই সরকারকে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতায় বিমুখ থাকা বাঞ্চনীয় নয়। অতীতে যেমন দেখা গেছে বর্তমানেও তার কোন ব্যতিক্রম ছাড়া ক্ষমতাকে তথা ক্ষমতাসীনকে মনমত প্রশ্ন না করলে প্রশ্নকর্তার জন্য বিপত্তি সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে অনেক উদাহরণ টানা যায়।
সে প্রসঙ্গে না গিয়ে রাশিয়ান অমর কথা সাহিত্যিক দার্শনিক লিও টলস্টয়’এর Three Questions এর সেই তিনটি বিখ্যাত প্রশ্ন পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি। গল্পে তিনটি প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন নির্জন প্রবাসী লোকান্তরে থাকা এক দরবেশ।
Question. What is the best time to begin something?
Ans. The Hermit explained that the present moment is the only time we have control and can act.
Question. Who are the most important people to deal with?
Ans. The person you are with at the moment. You do not know what the future holds, so focus on the people present with you.
Question. What is the most important thing to do?
Ans. To do good to the person you are with. We are placed on Earth to help others, so making the most of each interaction by doing good is the most important task.
এই প্রশ্নগুলির মাহাত্ম্য আমার কাছে অনেক। যেমন প্রথম প্রশ্ন কোন কিছু শুরু করার প্রকৃষ্ট সময় কখন? এর উত্তর দিয়েছেন নির্জন প্রবাসী দরবেশ, এখনই অর্থাৎ বর্তমানই সেই সময় যার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ আছে। দ্বিতীয় প্রশ্নঃ সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ কারা যাদের নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে কাজ করতে হবে? নির্জন প্রবাসী দরবেশের উত্তর, বর্তমানে তোমার সাথে যারা আছে, ভবিষ্যৎ তোমার কাছে অজানা অতএব যারা তোমার সাথে বর্তমান তাদের উপর আলোকপাত করতে হবে। তৃতীয় প্রশ্ন। সবচেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে। উত্তর। যারা তোমার সাথে বর্তমান তাদের মঙ্গল সাধন। আমাদের এ ধরায় আগমনের মৌল উদ্দেশ্য অপরের কল্যাণে কাজ করা এবং এটি করাই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রুড ইর্য়াড ক্লিপলিং, দি জঙ্গল বুক খ্যাত লেখক। ভারতীয় বংশদ্ভূত ইংরেজী সাহিত্যিক। সাহিত্যে ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন। তার একটি উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক। সেটি হলঃ
Of all the liars in the world, the worst are our own fears অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত মিথ্যুকের মাঝে সবচেয়ে ঘৃণ্যতম মিথ্যুক আমাদের মাঝে বাস করা ভয়। এই নিদারুণ সত্য কথাটিকে যদি আমরা একটু ব্যাখ্যা করি তাহলে দেখা যাবে, ক্ষমতাকে ভয় পাই বলে বা ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আমরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করি না।
এ প্রসঙ্গে উদাহরণ টানতে গেলে তার প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ আমাদের চলমান রাষ্ট্র প্রশাসন থেকে আমরা তুলে ধরতে পারি। যেমন শিল্প বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ক দেশের অন্যতম সংবাদ পত্র দৈনিক বণিক র্বাতা তাদের ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় বিগত প্রায় বছরে বেসরকারী খাতকে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধান শিরোনাম করেছেন “বেসরকারী খাতের বিষণ্ন বছর”। এ বিষণ্নতার মাঝে রয়েছে ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাস, কম বিনিয়োগ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানী কমে যাওয়া, অর্ন্তবর্তী সরকারের নীতি কৌশলের নেতিবাচক প্রভাব, শিল্প বাণিজ্য তথা সার্বিক অর্থনীতির শ্লথ গতি এবং অস্থিরতা, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থাহীনতা তৈরী এসব মিলিয়ে বিগত বছর যর্থাথই বেসরকারী খাত বিষণ্ন একটি বছর পাড় করেছে। এটি নিখাদ সত্য। কিন্ত্তু এই সত্য বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে নিতান্তই নৈর্ব্যক্তিকভাবে। প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়নি কার অযোগ্যতায়, কার অদক্ষতায় আমাদের অর্থনীতির এই দুর্দশা, এই বিষণ্ন বছর।
পুজিঁবাজারে অস্থিরতা। দেশের শিল্প কারখানা বিকাশে- বিস্তারে পুঁজিবাজারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ তাদের অর্থ বানিজ্য পাতায় ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ শিরোনাম করেছে “বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো একটি হতাশার বছর”। কিন্ত্তু পুঁজিবাজার কেন বার বার দেশের অর্থনীতিকে বঞ্চিত করছে? কাদের অদূরদর্শীতায়, অযোগ্যতায়, অদক্ষতায় এর পুনরাবৃত্তি সে প্রশ্ন করা হয়নি। ফলে অযোগ্যরা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে।
ডযু ঘধঃরড়হং ঋধরষ ড্যারন এ্যাকমাগলু এবং জেমস এ রবিনসনের বই। এ বইয়ে মূলত একটি জাতি কিভাবে এবং কখন ব্যর্থতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায় তার আলোচনা করা হয়েছে। বইটির মূল প্রতিপাদ্য নাগরিকদের নিজেদের অসচেতনাতাই একটি জাতি রাষ্ট্র ব্যর্থতার দিকে যাত্রা করে। একটি জাতির সচেতনতার লক্ষণ তার অর্থনীতি, রাজনীতি,সমাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে অসামঞ্জ্যতা পরিলক্ষিত হলে তার উপর প্রশ্ন করা। দেশে বিচার ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সংঘটিত “মবোক্রেসি” তথা নৈরাজ্যের’র উপর আমাদের জাতি সত্তার জোরালো কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে আমরা লক্ষ্য করিনি।
ওসমান হাদি’র হত্যাকান্ডে পুরা জাতি এর বিচারে সোচ্চার। ইনকিলাব মঞ্চ এ হত্যাকান্ডের বিচার দাবীতে আন্দোলনরত। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫। ইনকিলাব মঞ্চের নামে ঢাকার রাস্তায় অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। এই অবরোধের ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের যে কি অবর্ণনীয় ভোগান্তি হয়েছে তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। কারণ হাজার হাজার মানুষের সেদিনের পদযাত্রায় আমিও প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে বিমান বন্দরে পৌঁছি। আমি ছিলাম অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী। যেসব যাত্রী বিদেশগামী বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী আমাদের সেইসব রেমিটেন্স যোদ্ধাদের মাথায় বোঝা, হাতে ব্যাগ, শাড়ী পড়া মহিলাদের মাথায় স্যুইটকেস শরীরের পেছানো শাড়ী সামলানো এসব যে কি দুর্দশার ছিল তা ঐদিন যারা মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন তারা কেউ সহজে ভুলে যাবেন বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হল যারা বিচারের মালিক তারা যদি বিচারে টালবাহনা করে তবে তাদের ঘেরাও করলেই ত হয়। হাজারো পরিশ্রমী বা নির্দোষ মানুষকে ভোগান্তির শিকার না করলেই ত মঙ্গল হত। এ প্রসঙ্গে পরদিন পত্র পত্রিকায় কেউ কোন প্রশ্ন করেছেন চোখে পড়েনি। বরং অবরোধের খবর এসেছে ফলাও করে।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬। খুব বেশী দূরে নয়। এরই মধ্যে দলাদলি, দল থেকে দলে ডিগবাজি! নীতি বা আদর্শ নয় যেন, যেন তেন ভাবে একটি আসন ভাগানোই যেন আসল উদ্দেশ্য। নীতিহীনতার অভিযোগ তুলে হয়ত কেউ কেউ স্ব দল ত্যাগ করেছে। তারা প্রশংসার দাবীদার। কিন্ত্তু কষ্টের বা বেদনার বিষয় হল আদর্শহীনতার, নৈতিকতার বিষয়ে আমাদের সচেতন সমাজ থেকে প্রশ্ন উঠছে না। এ প্রশ্ন যদি না উঠে তবে আমাদের এ জাতির সার্বিক মনস্তাত্ত্বিকতা নিয়ে ভাবার, জাতিকে সচেতন করার সময় এসেছে।
প্রশ্নহীন একটি সমাজ নৈর্ব্যক্তিক হয়ে পড়ে। নৈর্ব্যক্তিকতা একটি সমাজকে তথা একটি দেশকে অচলায়তনে ঠেলে দিতে পারে। এটি কোনভাবেই একটি জাতির কাম্য হতে পারে না।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক












