সমকালের দর্পণ

জটিল তিমির অন্ধকারে রোহিঙ্গা সমস্যা

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৫ at ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উদ্বাস্ত্তু হিসাবে অনুপ্রবেশের ২৫ আগস্ট ২০২৫ আট বছর পূর্ণ হয়েছে। এখন নয় বছরে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। যা হয়েছে তা জাতিসংঘে ভোটাভুটি। জাতিসংঘের বিপুল সংখ্যক সদস্য যা দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি এমনকি কোন কোন সময় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে সস্মানে তাদের উচ্ছেদকৃত বাড়ি ঘরে ফেরত নিতে মায়ানমারের প্রতি আহবান জানিয়ে প্রস্তাব পাশ হয়েছে। কিন্ত্তু মায়ানমার সেসব প্রস্তাবে কখনো কোন কর্ণপাত করেনি।

নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাব ভোটাভুটিতে গেলে চীন রাশিয়ার সম্মিলিত ভেটোতে তা বরাবরই ভেস্তে গেছে।

এরই মাঝে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া দি হেগে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আই সি জে) এ মায়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উত্থাপন করে। দীর্ঘ শুনানির পর হেগে’র আদালত মায়ানমারকে গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। মজার ব্যাপার হল এই আদালতে মায়ানমারের গণহত্যার ব্যাপারে সাফাই গান শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সুকি। কী বিচিত্র! শান্তির নোবেলের প্রতি কী সুবিচার। অথচ এ ঘটনার পূর্বে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ডেসমন্ড টুটু সহ শান্তিতে নোবেল জয়ী অন্যান্যরা সম্মিলিতভাবে অং সান সুকিকে রোহিঙ্গাদের উপর চলমান গণহত্যার ব্যাপারে প্রতিবাদী হওয়ার আহবান জানান। তাদের সেই আবেদনে তারা বলেন, আপনি রাখাইনে চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হন, আপনার নীরবতা গণহত্যাকে সমর্থন দেওয়ার সমতুল্য। পরিহাস এবং শান্তির নোবেলের ললাটে অংকিত হয় অশান্তির তিলক। অং সান সুকি হেগে দাঁড়িয়ে যান গণহত্যার পক্ষে।

এরও আগে ২৪ আগস্ট ২০১৭ জাতিসংঘের এক সময়ের মহাসচিব কফি আনান মায়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে রাখাইন স্টেটে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন অং সান সুকি’র কাছে উপস্থাপন করেন। সে প্রতিবেদনে রাখাইনের বিশেষ করে উত্তর আরাকানের রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত সমাধানের তাগাদা দেন। সে কথায় অং সান সুকি বা সেদেশের সামরিক জান্তা কোন কর্ণপাত করেনি। বরং পরদিন অর্থাৎ ২৫ আগস্ট ২০১৭ সামরিক জান্তা রাখাইনে ‘অপারেশন ক্লিনজ’ নাম দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ অভিমুখে বিতাড়ন করতে শুরু করে। সামরিক জান্তার এই অভিযানে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে আসে। বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করে।

সেই থেকে বর্তমানের ১৪ (চৌদ্দ) লক্ষ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে বসবাস। এক হিসাবে এখন দেখা গেছে এই চৌদ্দ লক্ষের সাথে প্রতিবছর যোগ হচ্ছে ৩২ (বত্রিশ) হাজার নব জাতক।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেলে আশ্রয় নেওয়ার পর সময়ে সময়ে তাদের ্বদেশে প্রত্যাবাসনে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এর মাঝে রোহিঙ্গাদের যাচাই বাচাইয়ের জন্য নামের তালিকা প্রেরণ। সে নাম সমূহ যাচাই বাচাইয়ের পর যখন পুনরায় রোহিঙ্গা শিবিরে ফেরত আসে দেখা যায় একই পরিবারের মায়ের নাম ওকে বাপের নাম নট। বোনের নাম ওকে ভাইয়ের নাম নট। অর্থাৎ একই পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে রোহিঙ্গারা যেন তেমন এক পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক হয় তার কৌশল। এটি মায়ানমার কর্তৃপক্ষের একটি ধূর্ত কূটকৌশল তথা ডিলেয়িং ট্যাকটিস বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ঝুলিয়ে রাখার অপকৌশল।

এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার কিছু রোহিঙ্গাকে ভাসান চরে স্থানান্তর করে তাদের জন্য বিপুল ব্যয়ে বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে।

বেশ কিছু রোহিঙ্গা আশ্রয়ের সন্ধানে মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়ায়ও পাড়ি জমিয়েছে। এই সাগর পাড়িতে অনেকে ডুবেও মরেছে।

রোহিঙ্গাদের এই দুর্দশা দুর্ভোগের শুরুতে বিশ্ববাসী তাদের প্রতি যে সহানুভূতিশীল দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ক্রমান্বয়ে বিশ্ব পরিস্থিতির নানা ভূরাজনৈতিক পালাবদলে সে দৃষ্টি ক্রমশ মরিয়মান হয়ে পড়ে। তাদের প্রতি বাড়ানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্যের হাত সময় যেতে সংকুচিত হতে থাকে। এর কারণ হিসাবে দেখা হয় ইউক্রেনরাশিয়া যুদ্ধ। পশ্চিমারা তাদের সাহয্যের হাত ইউক্রেনের দিকে শুধু বাড়িয়েই দেয়নি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও অনেকটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গা সমস্যা কেবলি পিছনে পড়ে যায়।

এর মাঝে নতুন উপসর্গ হিসাবে সামনে আসে আরকান আর্মির সাথে মায়ানমার সেনাবাহিনীর লড়াই। পুরা আরাকান তথা রাখাইন জুড়ে এ সংঘাত সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত মায়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির সাথে যুদ্ধে অনেকটা বেকায়দায় পড়ে আরাকানের বেশির ভাগ অঞ্চল থেকে পিছু হটে। মায়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির সাথে যুদ্ধে রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে আরো জটিলতর করে। তারা বেশ কিছু রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিকত্ব এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়ার প্রলোভনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নামায়। এই প্রেক্ষাপটে মায়ানমার সেনাবাহিনী পিছু হটলে রাখাইন অঞ্চলে বাকী যে সমস্ত রোহিঙ্গা এখনও আছেন তাদের উপর আরাকান আর্মির খড়গ হস্ত নেমে আসে। ফলশ্রুতি বিগত এক বছরে আরো ১১৩০০০ (এক লক্ষ তের হাজার) রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয়াত্বে প্রবেশ।

১৫ মার্চ ২০২৫ জাতিসংঘ মহাসচিব আমাদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা সহ বেশ বড়সর এক ইফতার আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন। সে সময়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক গণমাধ্যমে এই প্রশ্নটি তুলেছিলাম জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশে না এসে বরং মায়ানমার তথা নেপিডোতে যাওয়াই ছিল যুক্তিযুক্ত। কারণ রোহিঙ্গা সমস্যা মায়ানমার সৃষ্ট, সমাধানও তাদের হাতে, এই বক্তব্যটি ২৫ আগস্ট আমাদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাও কক্সবাজারে রোহিঙ্গা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তুলে ধরেছেন।

এভাবেই আট বছর পেরিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা এখন নয় বছরে গড়িয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ‘লাইট এ্যাট দি এন্ড অব দি ট্যানেল’ বলে ইংরেজিতে যে একটি বাক্য আছে যার অর্থ সুরঙ্গ শেষে আলোর রেখা সেরকম কোন আলোর রেখা এখনও আমরা দেখছি না।

এই আলোহীন এক জটিল তিমির অন্ধকারে এখন রোহিঙ্গা সমস্যা। এমন একটি জটিল পরিস্থিতিকে সামনে রেখে ২৪ থেকে ২৬ আগস্ট ২০২৫ কক্সবাজারে পর পর আরো দুটি রোহিঙ্গা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন একটি নিউইয়র্কে এবং অপরটি দোহায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রাক প্রস্ত্তুতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

কক্সবাজার অনুষ্ঠিত সভায় আমাদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানার্থে সাত দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এই সাত দফা হল:

১। রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছা, নিরাপদ এবং স্থায়ীভাবে রাখাইনে পুনর্বাসন। ২। ২০২৫ ২৬ সালের সমন্বিত পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে সাহায্য দাতাদের দীর্ঘকালীন সাহয্যের নিশ্চয়তা। ৩। মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে একই সাথে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ রোধ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত্তুদের তাদের স্ব স্ব বাড়িঘরে ফিরার ব্যবস্থা করতে হবে। ৪। পুনর্মিলন এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি সমন্বিত সর্বজন সম্পৃক্ত ব্যবস্থার সৃষ্টি করতে হবে। ৫। আসিয়ান সহ সকল প্রতিবেশী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শান্তি স্থাপনে, আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে কাজ করতে হবে। ৬। জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নীতে হবে সে অনুযায়ী মায়ানমারের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ৭। গণহত্যা এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আই সি জে) এবং ইন্টারন্যাশনা ক্রিমিনাল কোর্ট (আই সি সি) এর কার্যক্রমকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। অধ্যাপক ইউনূস এর বাইরেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন রোহিঙ্গাদের বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ হলে তা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। তিনি মায়ানমারকে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘রোহিঙ্গা সমস্যা মায়ানমার সৃষ্ট এবং তাদেরকেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে’।

মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার উপরোক্ত বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট এবং এটিই সত্য মায়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং তারাই এ সমস্যা সমাধানের নিয়ামক। এটি বিবেচনায় নিলে তা হলে দেখা যায় আলোচিত এই সম্মেলনে মায়ানমারের অনুপস্থিতি সমস্যা সমাধানে সংকটের ইঙ্গিতবহ। ইতিমধ্যে আমরা এটাও জেনেছি নিপিডোর আমাদের রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে মায়ানমারের সাথে আমাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেকটা সর্বনিম্ন পর্যায়ের। দ্বিতীয়ত চীন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এক সময় অর্থাৎ বিগত সরকারের সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন বাংলাদেশ এবং মায়ানমার একটি ত্রি পক্ষীয় প্লাটর্ফম গঠনের কথা শুনা গিয়েছিল। এরকম কোন উদ্যোগ এখনও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পথ দেখাতে পারে। এটা বাস্তবে দেখা গেছে বহু পক্ষীয় উদ্যোগ থেকে দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ সমাধান পেতে অনেক বেশি কার্যকর এবং ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে সক্ষম। ইউক্রেনরাশিয়া যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এমনকি আফগানিস্তান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তা দেখা গেছে।

রাখাইন অঞ্চলের জন্য এখন আরো একটি সম্ভাব্য দুর্যোগ তথা সংঘাত অপেক্ষমাণ, সেটি হল মায়ানমার সেনাবাহিনীর আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান। এটি বাস্তবে সংঘটিত হলে রাখাইনে বড়সর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে নতুন করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয়ের আশায় বাংলাদেশে ছুটে আসবে।

এরকম এক পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও আমাদের প্রস্ত্তুত থাকতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট; সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার মানোন্নয়নে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধসিলেট সীমান্তে গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত