সমকালের দর্পণ

আত্মরক্ষা থেকে আক্রমণে ইরান

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ২৯ মার্চ, ২০২৬ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যেটি ছিল অভাবনীয়, অকল্পনীয় যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে তাই প্রত্যক্ষ করল। বর্তমান বিশ্বের মহা শক্তিধর দেশ আমেরিকা আর তারই আস্কারা উস্কানি ও মদদে ধরাকে সরাজ্ঞান করা ইসরাইলকে ইরান এত বেকায়দায় ফেলবে এটি ছিল অচ্যিন্তনীয়। আমেরিকাইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধে বর্তমানে তাই ঘটে চলেছে। ২১ জুন ২০২৫ আমেরিকা “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার” নাম দিয়ে ইরানের বিভিন্ন পারমানবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। বোমাবর্ষণান্তে তড়িঘড়ি এক সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন তাদের অপারেশন শতভাগ সফল এবং তিনি ইংরেজীতে একটি বাক্য স্বদম্ভে উচ্চারণ করেন, Iran’s neuclear facilities is oblitrated অর্থাৎ ইরানী পারমানবিক স্থাপনা সমূহ বিনাশ তথা বিলুপ্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য সেই সময় আমেরিকা তার বিমান বহরের সবচেয়ে শক্তিশালী বি ৫২ বোমারু বিমানের মাধ্যমে ইরানের পারমানবিক স্থাপনা “ফরডো” “নাথানজ” এবং “ইস্পাহান” আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে অনুযায়ী ২১ জুন ২০২৫ আমেরিকা “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার” নাম দিয়ে ইরান আক্রমণ শুরু করে। এই হামলায় অংশ নিতে আরিজোয়ানার হোয়াইটম্যান এয়ার বেইস থেকে ৭ টি বি ৫২ বোমারু বিমান আকাশে উড়াল দেয়। প্রতিটি বি ৫২’র বুকে ছিল ৩০০০০ (ত্রিশ হাজার) পাউন্ড ওজনের ২ টি করে জি বি ইউ৫৭/বি বাংকার বাস্টার প্যাট্রিয়ট বোমা। উল্লেখ্য বি ৫২ বোমারু বিমানগুলি ৭০০০০ (সত্তর হাজার) পাউন্ড পর্যন্ত বোমা বা সমরাস্ত্র নিয়ে লক্ষ্যবস্ত্তুর উদ্দেশ্যে উড়াল দিতে পারে। আটলান্টিক মহাসাগর এবং মেডিটেরিায়ন হয়ে বিমানগুলি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে প্রবেশ করে। এসময় আমেরিকার বি ৫২ বোমারু বিমানগুলি দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা উড়াল সময় পার করে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বিমানগুলি আকাশে দু’বার জ্বালানীও নেয়। এইসব বিমান ভোর রাতে ইরানের পারমানবিক স্থাপনা ফ্রাদো, নাথানজ এবং ইস্পাহানে তাদের বয়ে আনা ১৪টি বোমা বর্ষণ করে।

উপরোক্ত প্রেক্ষাপট যখন বিশ্বের সচেতন মানুষের মানসপটে দেদীপ্যমান তখন ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পুনরায় আমেরিকা ইসরাইল দ্বারা ইরান আক্রান্ত। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে আমেরিকা ইসরাইলের অবস্থা ইরানের হাতে যখন লেজেগোবরে একাকার তখন আমেরিকার সিনেটের শুনানিতে উপস্থিত হন ডাইরেক্টর ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টিলিজেন্ট তুলসী গ্যার্বাড, সি আই এ ডাইরেক্টর জন রেডক্লিফ এবং এফ বি আই ডাইরেক্টর ক্যাশ প্যাটেল । সিনেটর ওসফ এদের প্রশ্ন করেন, ২১ জুন ২০২৫, ১২ দিনের যুদ্ধের সমাপ্তিতে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম ঘোষণা করেছিলেন Iran’s neuclear facilities is obliterated অর্থাৎ ইরানী পারমানবিক স্থাপনা সমূহ বিনাশ তথা বিলুপ্ত করা হয়েছে এর পর আপনাদের প্রতিবেদন ছিল ইরান পারমানবিক অস্ত্র তৈরীর আর কোন ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করেনি তাহলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইরান আক্রমণের যুক্তি Iran is the eminent threat to USA অর্থাৎ ইরান আমেরিকার জন্য আশু হুমকি হয় কীভাবে? আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের তিন মহারথীর অভিব্যক্তি ছিল তখন দেখার মত। হিমসিম খাওয়া তিনজনেরই উত্তর “আসন্ন হুমকি বা ঝুঁকি নির্ধারণ করা প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বাধীন বিষয়”।

সিনেটর রেডক্লিপ আরো তীর্যক প্রশ্ন করেন। তার প্রশ্ন ছিল উত্তর কোরিয়ার দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সমূহ আমেরিকার যে কোন অঞ্চলে আঘাত হানতে সক্ষম এবং এই সব ক্ষেপণাস্ত্র সমূহ পারমানবিক অস্ত্র সজ্জিত, ইরানের এ মুহূর্তে সেই সক্ষমতা নাই তা হলে উত্তর কোরিয়া না হয়ে ইরান আমেরিকার জন্য আশু হুমকি বা ঝুঁকির কারণ হয় কীভাবে? এ প্রশ্নে তিন গোয়েন্দা প্রধানের অবস্থা ছিল আরো গুরুচরণ।

মজার বিষয় হল ইরান কর্তৃক ওদিকে যখন আমেরিকার তাবেদার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি একের পর এক আক্রান্ত হচ্ছিল তখন তাদের ত্রাহি অবস্থা। এ প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনে যখন সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রামকে প্রশ্ন করেন যুদ্ধ শুরুর পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার মিত্র দেশগুলি আক্রান্ত হতে পারে সেরকম কোন গোয়েন্দা তথ্য গোয়েন্দা সংস্থা সমূহ তাকে দিয়েছিল কিনা? উত্তরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম বলেন এ ধরনের কো আশংকার কথা তাকে বলা হয়নি!

আরো মজার বিষয় হল আরব দেশগুলি ইরানী আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পেতে রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়ে ইরানের উপর রাশিয়ার প্রভাব খাটানোর অনুরোধ জানান। এতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরব ২২ মার্চ ২০২৬ তার প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেন, আমেরিকা এবং ইসরাইলের দ্বারা যখন ইরান আক্রান্ত হয় তখন আপনারা ইরানের পাশে তো নয়ই এমনকি এই অন্যায় আক্রমণ বন্ধে একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেননি, তিনি ঘোষণা করেন রাশিয়া তার মিত্র ইরানের পাশেই থাকবে।

এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে আমেরিকান স্কাই নিউজে ররি স্টুয়ার্ট উল্লেখ করেন ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশ গুলির অর্থনীতি দশ থেকে পনের বছর পিছিয়ে গেছে, এবং যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হবে এই ক্ষতির পরিমান এবং পরিধি আরো বিস্তৃত হবে।

এরই মাঝে ইরান তার ভূকৌশলগত সবচেয়ে কার্যকর মারণাস্ত্রটি ব্যবহার করেন। এ মারণাস্ত্রের নাম হল হরমূজ প্রণালী। এ প্রণালীর মাধ্যমে বিশ্বের মোট জ্বালানীর ২৫% পরিবাহিত হয়। ইরান কার্যকরভাবে এ প্রনালীর কর্র্তত্ব গ্রহণ তথা নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে নিয়ে নেয়। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করে। এতে বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানী সংকট চরম রূপ নিতে থাকে। আন্তর্জাতিক জ্বালানী সংস্থা আই ই এ, এ অবস্থাকে বিশ্বের জন্য স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে মারাত্বক জ্বালানী সংকট হিসেবে ঘোষণা করে তাদের কৌশলগত রিজার্ভ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানী তেল বাজারে যোগান দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর পরও হুরমুজ প্রণালী বন্ধের কারণে জ্বালানী তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আমেরিকাও এই মূল্য বৃদ্ধি থেকে রেহাই পায়নি। সেদেশে গ্যাসোলিন এর মূল্য ৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এতে ট্রাম সাহেবের টনক নড়ে, তিনি হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে ন্যাটোর সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হন। তিনি ন্যাটোকে ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্বন্ধে সতর্ক করে বলেন “ন্যাটোর জন্য আমেরিকা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, এখন প্রয়োজনে ন্যাটো আমাদের পাশে নাই”। এরপর একে একে বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, জাপান, ই ইউ সবার কাছে সাহায্য চেয়ে আমেরিকা হাত পাতে। সবারই একই উত্তর এ যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়। এ যুদ্ধ শুরুর আগে আমাদের কোন পরামর্শ চাওয়া হয়নি। এতে ঔদ্ধত্য উন্মত ট্রাম বলতে থাকেন “জাপানে আমাদের ৪৫০০০ হাজার, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৫০০০ হাজার, জার্মানীতে ৪৫০০০ হাজার সৈন্য মোতায়েন আছে। আমরা এসব দেশের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছি আমরা ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, অথচ প্রয়োজনে এরা কেউ আমেরিকার পাশে নাই।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম অবশেষে ঘোষণা করেন আমেরিকার রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, আমরা আমাদের শক্তিতে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করব। এমতাবস্থায় ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বলা হল এর মধ্যে হরমূজ প্রণালী উন্মুক্ত করা না হলে আমেরিকা ইরানের সমস্ত পাওয়ার প্ল্যান্টের উপর হামলা পরিচালনা করবে। প্রত্ত্যুতরে ইরান জানায় সেরকম কিছু হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির তেল স্থাপনা সহ সব শোধনাগারে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করবে।

উৎকণ্ঠিত বিশ্ব। কী হয় কী হয়। শেষ পর্যন্ত ট্রাম সাহেব তার আল্টিমেটাম থেকে পিছু হটে বল্লেন ইরানের সাথে ফলপ্রসু এবং অর্থবহ আলোচনা চলছে। আমরা ইরান আক্রমণে কিছুটা বিরতি টানছি। এটি শুনার পর কোন কোন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন “আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধকে জোক তথা ঠাট্টা মশকরার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আবার কোন কোন মন্তব্যকারী এও বলেছেন “প্রেসিডেন্ট ট্‌্রাম প্রমান করেছেন তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সন থেকেও নিকৃষ্ট একজন”। কোন কোন বিশ্লেষক বিশেষ করে আমেরিকার কাইন্টার টেরোরিজম ডির্পাটমেন্টের পরিচালক জো কান্ট তার পদত্যাগ পত্রে উল্লেখ করেছেন Iran poised no imminent threat to USA অর্থাৎ ইরান আমেরিকার জন্য কোন আশু হুমকি ছিল না। জো কান্ট আরো উল্লেখ করেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তার প্রতিশ্রুত অসবৎরপধ ভরৎংঃ ঘোষণা থেকে সরে গেছেন, তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে এখন ইসরাইল first ইসরাইলই প্রথম।

এবার ইরানের আত্মরক্ষা থেকে আক্রমণে আসার প্রসঙ্গে আসি। প্রথমত ইরান তার সম্মুখ সারির রাজনৈতিক সামরিক প্রায় সমস্ত নেতৃত্বকে হারিয়ে পথ হারায়নি। তারা অত্যন্ত দূরদর্শীতায় তাদের দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসে। সামরিক কমান্ডকে ডিসেন্ট্রালাইজ করে। নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের লক্ষ্যবস্ত্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। তারা শক্রুকে বোকা বানাতে হাজার হাজার নকল ট্যাংক, কামান, ড্রোন, মিসাইল তৈরী করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে। এতে দারুন ফল হয়। ইসরাইল আমেরিকা ঐসব নকল যুদ্ধাস্ত্রে আক্রমণ পরিচালনা করে নিজেদের ব্যাপক শক্তি ক্ষয় করে। অন্যদিকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে আমেরিকার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনা সমূহের উপর নিখুঁত আক্রমণ পরিচালনা করে তার সক্ষমতার পরিচয় দেয়। এরই মাঝে ইরান তার অব্যর্থ হাইপারসনিক মিসাইল ফাতাহ, সেজিল, ডান্সিং মিসাইল, খুররমশাহ এর মাধ্যমে ইসরাইলের উপর একের পর আক্রমণ পরিচালনা করে চলেছে। ২২ এবং ২৩ মার্চ ইরান ইসরাইলের পারমানবিক স্থাপনা সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সাফল্যের সাথে আক্রমণ পরিচালনা করে জানান দিয়েছে চাইলে ইরান এখন ইসরাইলের যেকোন স্থাপনায় আক্রমণ পরিচালনায় সক্ষম। অন্যদিকে ইসরাইল আমেরিকার গর্বের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার চাদর আইরন ডোম, ডেভিট স্লিং, এ্যারো, এ্যারো২ একে একে ইরানী মিসাইলের আক্রমনের সামনে ব্যর্থ এবং অকার্যকর প্রমানিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম হয়ত এখন জোরে সোরে ইরানের সাথে সমঝোতার সোর তুলেছে।

তবে ইসরাইল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইরান আক্রমণের মাধ্যমে আমেরিকা যে পটভূমি রচনা করেছে তাতে অদূর ভবিষ্যত এ রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া আর ইরান সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করলে বিশ্বে আমেরিকার বর্তমান আধিপত্য বিলুপ্ত হবে এটি সামরিক এবং ভূরাজনীতির বিশ্লেষণ থেকে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক; গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহৃদয় চোখে একাত্তরের শহীদ ছবুর ও মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কান্তি জলদাস
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্বের সেরা তালিকায় চুয়েটের পিএমই বিভাগ