সমকালের দর্পণ

ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকা এখন এক পাগলা হাতি

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ১৫ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

এই লেখাটির আর ভালো কোনও শিরোনাম খুঁজে পাওয়া আমার জন্য দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়, অবশেষে তাই এই শিরোনামই আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। এটির পিছনের কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী যে অনাসৃষ্টি, যে দুর্বৃত্তায়নের উদাহরণ, যে অমানবিকতা, যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা সৃষ্টি করে চলেছে তা একমাত্র পাগলা হাতির সাথেই তুল্য। আমেরিকা তার স্বার্থ অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার জ্বালানী তেল ব্যবহার করতে পারছে না বলে রাতারাতি সার্বভৌম দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার করে সস্ত্রীক আমেরিকায় নিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে ডোনাল্ড নিজেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টও ঘোষণা করে বসেছিল, নিজেদের বৈশ্বিক নিরাপত্তার অজুহাতে ডেনমার্ক থেকে গ্রীনল্যান্ডকে জবর দখলের হুমকি, কিউবার মরণ ঘণ্টা বেজে গেছে বলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ঘোষণা করা ইত্যাদি কোনভাবেই একটি সভ্য দেশের আচরণ হতে পারে না।

এসব কুকীর্তির সর্বশেষ উদাহরণ আমেরিকার ইসরাইলের প্ররোচনায় ইরান আক্রমণ। এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক সমস্ত রীতিনীতি, আইন কানুনকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। বিনা প্ররোচনায় একটি সার্বভৌম দেশের উপর এই আক্রমণ পরিচালনা এক বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস আমেরিকাকে একটি শক্তিশালী অথচ পাগলা হাতি হিসাবে আখ্যায়িত এবং চিহ্নিত করে রাখবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর চলমান আমেরিকা ইসরাইলের ইরান আক্রমণের আগেও ১৩ জুন ২০২৫ ইরানআমেরিকাই ইউ’র মাঝে আলোচনা চলা অবস্থায় ইরানের ওপর আমেরিকা ইসরাইল অতর্কিত হামলা চালায়। সেই আক্রমণকে বিশ্বব্যাপী কূটনীতি এবং রাজনীতি বিজ্ঞানের ওয়াকিফহাল মহল ‘এপিক বিট্রায়াল’ তথা চূড়ান্ত মোনাফেকি হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

এবারও অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানআমেরিকার আলোচনা যখন চলমান, আলোচনার মাঝেই ইসরাইলআমেরিকা ইরান আক্রমণ করে বসে। আমেরিকার এই আক্রমণে অংশ নেওয়ার পিছনে সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অদ্ভূত এক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তার যুক্তি ইসরাইল ইরান আক্রমণ করতে যাচ্ছে এটা আমেরিকানরা জানার পর তারা উপসংহারে আসে এটি হলে প্রতিক্রিয়ায় ইরান আমেরিকার স্বার্থের উপর আঘাত হানবে তাই এরকম পরিস্থিতি থেকে ইরানকে নিবৃত্ত করতে তারা ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়।

বিখ্যাত চৈনিক অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ভিক্টর গাও আমেরিকা ইসরাইলের এই ইরান আক্রমণকে আখ্যায়িত করেছেন ‘হাই হিপোক্রেসি এবং ব্লাট্যান্ট ভাইওলেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ল’ অর্থাৎ চূড়ান্ত ভণ্ডামি আর আন্তর্জাতিক আইন কানুনের নির্লজ্জ লঙ্ঘন’।

ইতিপূর্বেও নানা অজুহাতে ইরানকে দুর্বল করার মানসে আমেরিকার মদদে ইসরাইল হামাসের প্রতিষ্ঠাতা হুইল চেয়ারে চলাচলরত শেখ মোহাম্মদ ইয়াসিন, হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া, হামাসের সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া সিনাওয়াত্রাকে হত্যা করে। একইভাবে ইসরাইল ১৯৯২ সালে হিজবুল্লাহ প্রধান মুসাভিকে এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ হাসান নাসরুল্লাহকেও হত্যা করে। অন্যদিকে ৩ জানুয়ারি ২০২০ সালে আমেরিকা বাগদাদে এক ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলাইমানীকে হত্যা করে। ইরান, আমেরিকা ইসরাইলের সর্ম্পক মারাত্মক মোড় নেয় যখন ১ এপ্রিল ২০২৪ ইসরাইল দামেস্ক, ইরানী কনস্যুলেট আক্রমণ করে সাত ইরানী কমান্ডারকে হত্যা করে।

ফ্রান্সেসকা আলব্যানেজ ইটালীয়ান। তিনি মানবাধিকার বিষয়ে পৃথিবীর অন্যতম একজন আইনজ্ঞ। ১ মে ২০২২ থেকে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক মনোনীত হয়ে অধিকৃত প্যালেস্টাইনের জন্য বিশেষ রেপোটিয়ার বা বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৩ জুলাই ২০২৫ জেনেভায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় আলব্যানেজ অধিকৃত প্যালেস্টাইন এবং গাজার উপর তার একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

বিশ্ব পুঁিজবাদের সমস্ত রক্তচক্ষুর দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ফ্রান্সেসকা আলব্যানেজ তার ঐ প্রতিবেদনে ইসরাইলকে ঘিরে পুঁজিবাদী বিশ্ব কীভাবে গণহত্যার মাধ্যমে তাদের পুঁজির বিস্তার ঘটাচ্ছে তার নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। এ বিষয়টি আমি আমার ইতিপূর্বের লেখা “ইকনমি অব জেনোসাইড” এ বিস্তারিত তুলে ধরেছি। এসবের পরেও আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে কীভাবে অর্থনৈতিক যাতাকলে পিষ্ঠ করছে তার উদাহরণ সাম্প্রতিকের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি সমূহ। ১৫ মে ২০২৫ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম কাতারের আমীরের সাথে কাতার এয়ার ওয়েজের জন্য ২৪৫ (দুইশত পঁয়তাল্লিশ) বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ২১০ টি বোয়িং বিক্রির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বোয়িং এর ইতিহাসে এটি সর্ববৃহৎ ক্রয় আদেশ। এই ক্রয় আদেশের ফলে আমেরিকান শ্রমবাজারে বছরে ১৫৪,০০০ (এক লক্ষ চুয়ান্ন হাজার) কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর বাইরে নানা ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তির বিপরীতে কাতার এবং আমেরিকা ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তিও স্বাক্ষর করে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একই সময়ে আরব আমিরাতও সফর করেন। আরব আমিরাত আমেরিকার সাথে ১. ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির মাঝে ২০০ বিলিয়ন ডলারের এ আই প্রযুক্তি সংক্রান্ত। বাকী অর্থের মাঝে আছে অস্ত্র ক্রয় যার মাঝে আছে এফ ১৬ যুদ্ধ বিমান, এ্যাপাচে এবং চিনহুক হেলিকপ্টার ক্রয়। ৪৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে আমেরিকান গ্রীন এনার্জি এবং জ্বালানী খাতে।

অথচ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম যখন মধ্যপ্রাচ্য সফরে, গাজায় তখনও শত শত নিরীহ মানুষ ইসরাইলীদের অকারণ হত্যার শিকারে পরিণত। ট্রাম্প যখন মধ্যপ্রাচ্যের ঐসব তাবেদার রাষ্ট্রে একের পর এক বিলাসী রাষ্ট্রীয় ভোজে মত্ত তখন গাজার লক্ষ মানুষ অভুক্ত, খাদ্যাভাবে আহাজারিতে হাজার হাজার শিশু খাদ্যের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শূন্য পাত্র নিয়ে তাবুতে ফিরেছে। সে বাস্তবতা এবং ঐ শিশুরাই যখন ইসরাইলী বোমা বর্ষণের শিকার হয়ে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকে তাদের কথা একবারও উঠে আসেনি বিলাসী ঐসব ভোজ বা আলোচনার টেবিলে।

ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে ব্যতিক্রমী এক ভূমিকায় নিজেকে দাঁড় করিয়েছে। নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তিতে নিজেকে আমেরিকা ইসরাইলী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সংকল্পবদ্ধ। এটা অস্বাভাবিক নয়। ছয় হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সভ্যতাদর্পী ইরান এখন আমেরিকা ইসরাইলের আক্রমণের শিকার। আল রাজি, শেখ সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, জালালুদ্দিন রুমি আর শামসিদ তাবরিজদের মত ভুবন বিখ্যাত মনীষীদের জন্ম ইরান তথা পারস্যে। এই ইরানের উত্থান ঠেকাতে বর্তমানে আমেরিকা ইসরাইল পৃথিবীর সমস্ত রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে আক্রমণ পরিচালনা করে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে যুদ্ধের যে গতিপ্রকৃতি তা থেকে অনুমেয় আমেরিকা ইসরাইলের জন্য ইরান আক্রমণ বুমেরাং হতে চলেছে।

প্রথমত ইরান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী আমেরিকার আধিপত্যবাদী শক্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর মূল কারণ আমেরিকা তার ইরান আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ইরানে রিজিম চেঞ্জ বা সরকার পরিবর্তন। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা আক্রমণের শুরুতে ইরানের সর্ব্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সম্মুখ সারির অনেক সামরিক কমাণ্ডারদের হত্যা করে। এরপরও ইরানে কোনও সরকার তথা ধারাবাহিকতার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেনি বরং আমেরিকা ইসরাইলের সে লক্ষ্য চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানী সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পরিষদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি’র দ্বিতীয় পুত্র ৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনিকে তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসাবে ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য মুজতবা খামেনি ইসরাইলী আক্রমণে তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি’র সাথে তার মা, স্ত্রী এবং সন্তান হারিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত আক্রান্ত হওয়ার দ্রুততম সময়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের আমেরিকান স্থাপনা সমূহের উপর আঘাত ছিল আমেরিকা ইসরাইল এর জন্য অপ্রত্যাশিত। ফলশ্রুতি মধ্যপ্রাচ্যের তাবেদার রাষ্ট্রগুলি থেকে আমেরিকা তার দূতাবাসসমূহ গুটাতে বাধ্য হয়, আমেরিকান নাগরিকদের তড়িঘড়ি মধ্যপ্রাচ্য থেকে লণ্ডভণ্ডভাবে পাততাড়ি গুটাতে হয়।

তৃতীয়ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের সংকট, মূল্য বাড়ায় উল্পন। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। পুঁজিবাজারে ব্যাপক ধস। সার্বিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঋণাত্বক প্রভাব। চতুর্থ ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকা এবং মিত্রদের ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে মনোযোগ এবং সমর্থনে ভাটা। পঞ্চমত ইরান যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে ইরানকে ঘিরে বিশ্ব মানচিত্রে ভূ রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে রাজতন্ত্রের পতনের ঝড় বয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক একটি আবহ তৈরী হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,

সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরমজান ও সামাজিক ন্যায়বোধ
পরবর্তী নিবন্ধনবীন মেলার ঈদ উপহার বিতরণ