সমকালের দর্পণ

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল হক ইসলাম (অব.) | রবিবার , ৮ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

গতকাল ছিলো ৭ মার্চ। ১৯৭১ সরোয়ার্দী উদ্যানের সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি নির্মলেন্দু গুনের কবিতায় স্মরণ করছি

গণসূর্যের মঞ্চ কাপিঁয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি– ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামসেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) আমেরিকা এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের উপর সামরিক অভিযান পরিচালনা শুরু করে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনী স্বীয় বাসবভনে নিজের স্ত্রী মেয়ে নাতনী এবং মেয়ের জামাই সহ নিহত হন। এই হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কমান্ড স্তরের সম্মুখ সারির আরো প্রায় ৪০ জন নিহত হওয়ার খবর প্রচারিত হয়েছে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য যারা হত্যাকাণ্ডের শিকারে পরিণত হন সেই সব শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি, সশস্ত্র বাহিনী প্রধান জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আই আর জি সি (ইসলামী রেভ্যুলেশনারী গার্ড কমান্ড)’র র্স্বাধিনায়ক মোহাম্মদ পাকপুর’ও রয়েছেন।

১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা র্ন্বিাচিত হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ইরানকে নেতৃত্ব দিয়ে আসা আয়াতুলা্লহ আলী খামেনি সম্পর্কে আমাদের অনেকের হয়ত সম্যক ধারণা থাকতে পারে আবার অনেকের নাও থাকতে পারে। আলী খামেনি ১৯ এপ্রিল ১৯৩৯ সালে মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা গ্রহণ করেন মাশহাদ আর কোম শহরে। ১৯৬২ সালে তিনি শাহ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে ইসলামী রিপাবলিকান পার্টি গঠন করেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের উপ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হন। তিনি ১৯৯০ সালে ইরানের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদে নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

আয়াতুল্লা আলী খামেনী ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হন। এই থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আমেরিকাইসরাইলী হামলায় নিহত হওয়া পর্যন্ত ইরানকে তার আত্মমর্যাদা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা প্রশ্নে অবিচল অনুকরণীয় এক নেতৃত্ব প্রদান করে এসেছেন।

আয়াতুল্লহ আলী খামেনি’র নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় যে সাফল্য তা হল নেতৃত্বের বহুধা স্তর সৃষ্টি এবং তার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের ভার বহন করার পথরেখা রেখে যাওয়া। ১৩ জুন ২০২৫ সালে ইরান আমেরিকা পারমাণবিক জ্বালানী সমৃদ্ধ করণ বিষয়ে আলোচনা যখন চলমান তখন ইসরাইল ইরান আক্রমণ করে বসে। এই আক্রমণকে কূটনীতি এবং ভূরাজনীতির ইতিহাসে ‘এপিক বিট্রেয়াল’ বা চূড়ান্ত মোনাফেকি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ঐ আক্রমণের প্রথম প্রহরে ইরানের সম্মুখ সারির প্রায় সব কমান্ডারাই নিহত হয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে ইরানের সবল এবং দুর্বল দিকগুলি আমি তুলে ধরেছিলাম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার পুনরাবৃত্তি অযৌক্তিক নয় মনে করি।

ইরানের সবল দিক: অভাবনীয় দ্রুততার সাথে হারানো কমান্ডারদের স্থলাভিষিক্ত করণ। শত প্রতিকূলতায়ও মিসাইল আক্রমণ পরিচালনা করা। ইসরাইল আমেরিকার, আইরন ডোম, ডেভিড স্লিং, এ্যারো ১ বা এ্যারো ২ যে দুর্ভেদ্য সে ভুল ভেঙে দিয়ে ইসরাইলের উপর ক্রমাগত মিসাইল আক্রমণ। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির অনুপস্থিতিতে উত্তর সূরির মনোনয়ন। যুদ্ধ বিরতির শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের আক্রমণ সক্ষমতা বজায় রাখতে পারা। সাধারণ জনগণের সমর্থন এবং আস্থা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনুকূলে রাখতে পারা।

ইরানের দুর্বল দিক: যুদ্ধের প্রথম মুহূর্তে অনেক সেনা কমান্ডার হারানো। নিজেদের অভ্যন্তরে শক্রর প্রবল গোয়েন্দাবৃত্তির উপস্থিতি। দুর্বল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। প্রয়োজনের সময় প্রক্সিদের নির্লিপ্ততা। বন্ধু দেশগুলির যথেষ্ট সমর্থনের অনুপস্থিতি।

এবারের বিষয় নিয়ে এখনও মন্তব্য করার সময় আসেনি তবে উপরে বর্ণিত ইরানের সবলতা এবং দুর্বলতা এবারও নিশ্চিত সমভাবে প্রযোজ্য।

আলোচনায় আসা যাক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ আমেরিকাইসরাইলের যৌথ ইরান আক্রমণ প্রসঙ্গে। এ আক্রমণ কেন? এই আক্রমণ আমেরিকার ভূরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত এবং ইসরাইলের ফিলিস্তিন তথা আরব উপদ্বীপে তার দখলদারিত্ব অবারিত করা নিশ্চিত করতে। আমেরিকাইসরাইলের ভূরাজনীতি আর অর্থনীতির এ লক্ষ্য নির্ধারিত হয় ২০০০ সালের ইসরাইলী শহর হারজেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ইসরাইলআমেরিকান কৌশল প্রণেতাদের অনুষ্ঠিত সম্মেলন ‘দি ব্যালেন্স অব ইসরাইলী সিকিউরিটি’ থেকে। এই সম্মেলন আরব উপদ্বীপকে ঘিরে আমেরিকাইসরাইলের ভূরাজনীতি’র কৌশলে আমূল পরির্বতন ঘটায়। এই সম্মেলনে তারা স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফিলিস্তিনী বা আরবরা নয় ইরানই হবে ভবিষ্যৎ এ ইসরাইলের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি এবং ইসরাইলের প্রধানতম শক্র। এখানে আরো অভিমত প্রকাশ করা হয় ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করলে এটি বাস্তবে রূপ লাভ করবে। সুতরাং কোন অবস্থায় ইরানকে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে দেওয়া যাবে না। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা লক্ষ্য করি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’ প্রণীত চুক্তি যা আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওবামা ১৮ অক্টোবর ২০১৫ ‘জে সি পি ও এ’ এ্যাডাপশান ডে বা গ্রহণের দিন ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ আই এ ই এ বা ইন্টারন্যাশনাল এ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি ঘোষণা করে ইরান চুক্তি অনুযায়ী সমস্ত শর্ত পূরণ করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও ‘জে সি পি ও এ’ কে অনুমোদন দেয়। এতদসত্ত্বেও সমস্ত কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘জে সি পি ও এ’ থেকে তার দেশকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর আজ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প’ই বলছেন ‘ইরানকে আমি বহুবার সুযোগ দিয়েছি তারা চুক্তিতে আসেনি। এরপরও ২০২৫ ইরানআমেরিকা পরমাণু বিষয়ে আলোচনা চলমান ছিল। আলোচনা ৫ম পর্ব পেরিয়ে ৬ষ্ঠ পর্ব নিধর্ারিত ছিল ১৫ জুন। আলোচনায় কোন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তেমনটি কোন পক্ষই বলেনি। এরই মাঝে ৬ষ্ঠ আলোচনা শুরু করার দুদিন আগে অর্থাৎ ১৩ জুন অতর্কিতে ইসরাইল ইরান আক্রমণ করে বসে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর ইরান আক্রমণ একই লক্ষ্য থেকে ব্যতিক্রম নয়। হারজেলিয়ায় সিদ্ধান্ত ‘কোন অবস্থায় ইরানকে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে দেওয়া যাবে না’। এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বর্তমান ইরান আক্রমণ।

অথচ এটি ভেবে যে কোন সচেতন মানুষ অবাক না হয়ে পারবে নাআরব উপদ্বীপের সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, সিরিয়া, লিবিয়া আর ইরাক জুড়ে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে ২৭ টি। এর অর্থ হল এই প্রতিটি দেশ আমেরিকার তাবেদারীতে লিপ্ত।

মেডিটেরিয়ান বা ভূ মধ্যসাগর, আরব সাগর জুড়ে বসে আছে আমেরিকান পারমাণবিক শক্তি চালিত বিমানবাহী নৌ বহর, যেখান থেকে অবলীলায় আরব উপদ্বীপের যেকোন অঞ্চলের লক্ষ্য বস্ত্তুতে মিসাইলের আঘাত হানা যায়, বিমান বহর নির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্ত্তুতে আঘাত হেনে নির্বিঘ্নে ফিরে আসে নিজস্ব বহরে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার তাবেদার সরকারগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র মওজুদ করে রেখেছে নিজেদের প্রতিরক্ষায় নয় বরং আমেরিকার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। এই সব অস্ত্র এখন ইরানী মিসাইল আক্রমণ ঠেকাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এটা এখন স্পষ্ট আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে নিয়ে এক শুভঙ্করের ফাঁকির খেলায় মত্ত। খেলাটি এরকম

গদি রক্ষার নিশ্চয়তার বদলে আর ইরানের জুজুর ভয় দেখিয়ে আরব দেশগুলিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনতে বাধ্য করেছে। তেলের পয়সায় আরব সরকারগুলি অস্ত্র কিনে দেদারসে। অস্ত্র বেচার অর্থে আমেরিকান ওয়ার ইন্ডাস্ট্রিজগুলি ফুলে ফেঁপে উঠেছে দিন দিন, চাঙা হয়েছে আমেরিকার অর্থনীতি, অস্ত্র লব্ধ আয় থেকে অর্থ আর অস্ত্র দুটিই সরবরাহ করা হয়েছে এবং হচ্ছে ইসরাইলকে। এই অর্থ আর অস্ত্রে বলিয়ান ইসরাইল বেপরোয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যে।

ব্যতিক্রম ইরান। আমেরিকা থেকে কোনও অস্ত্র কিনা ত নয়ই বরং আমেরিকা ইসরাইলের চোখে চোখ রেখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা আর গৌরব গাথার জানান দিয়ে যাচ্ছে বহুদিন থেকে। একাজটি ইরানীরা মোসদ্দেক থেকে শুরু করে ইসলামী বিপ্লব সংহত করণ, ইরান ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত বজায় রেখেছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রান্ত হওয়া এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হারানোর পরও ইরান পশ্চিমা সামরিক কৌশল প্রণেতা বিশেষ করে আমেরিকানদের হতবাক করে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আমেরিকার প্রায় ২৭টি লক্ষ্যবস্ত্তুতে সফলভাবে আঘাত হানে। এতে করে সৌদি বৃহৎ জ্বালানী তেল উৎপাদনকারী সংস্থা আরামকো তাদের উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, কাতারকে তার এল এন জি উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আমেরিকার ১৪ টি দূতাবাস বন্ধ করতে হয়েছে। পাশাপাশি ইরানীরা পৃথিবীর অন্যতম তেল রপ্তানী করা হুরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এসবের প্রভাবে বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের দাম হু হু করে বেড়ে চলেছে।

জ্বালানী তেলের দাম বাড়া আমাদের মত দেশগুলির অর্থনীতির জন্য এক নিদারুণ শঙ্কার সৃষ্টি করে চলেছে। এতে করে জ্বালানী খাতে আমাদের আমদানী ব্যয় বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর নিশ্চিতভাবে ঋণাত্বক প্রভাব ফেলবে, শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দ্রব্যমূল্যেরও মূল্য বাড়বে ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিম্নগামী হবে। এসবের ফলশ্রুতিতে সার্বিক অর্থনীতিতে সংকোচনের একটি কুফল বয়ে যেতে পারে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,

সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুরক্ষিত হোক নারীর অধিকার
পরবর্তী নিবন্ধনারী উন্নয়ন শুধু নয়, মানব উন্নয়নে হোক সমষ্টিগত চিন্তার প্রতিফলন