আমি গত লেখাটিতে অসংকোচে লিখেছি আমাদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইনক্লুসিভ তথা অংশগ্রহণমূলক হয়নি এতদসত্ত্বেও আমাদের সংসদ নিয়ে প্রথমে আশার কথা বলছি। আমাদের জাতীয় সংসদ তার কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা অনুধাবনে এবং তা বাস্তবায়নের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হোক। ভারতীয়, বৃটিশ, ফরাসী পার্লামেন্ট, জাপানী ডায়েট আর আমেরিকান সিনেট এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই তুলনায় আমাদের জাতীয় সংসদ যেমন নবীন তেমনি এর অর্জনও সংবিধান প্রণয়ন ব্যতীত এ যাবত খুব একটা গৌরবোজ্জ্বল নয়।
আমাদের জাতীয় সংসদ অতীতে সামরিক একনায়কদের কীর্তিকলাপকে আইন সম্মত করার জন্য বারবার যেমন রাবার স্টাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে অতি দ্রুততার সাথে বিনা আলোচনায় দলীয় সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংবিধানকে সংশোধন করার মত নজীরও সৃষ্টি করেছে।
সংসদ এবং সাংসদদের কাছে একটি জাতি আশা করে, সাংসদরা সংসদে তাদের সরব উপস্থিতিতে বর্তমানকে বিনির্মাণ করবেন, বর্তমানের জঠরে ভবিষ্যতের ঐতিহ্যের বীজ বুনবেন। সংসদ হবে একটি জাতির পবিত্র আর গৌরবের স্থান। এই গৌরব যে কত মহিমান্বিত, কত ঐতিহ্যমণ্ডিত হতে পারে তা আমি ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসের এক মোহন সন্ধ্যায় গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করেছি। সক্রেটিস, এ্যারিস্টটল এর দেশে গ্রীক ‘সিটি স্টেট’ সম্বন্ধে আমরা কম বেশি অবহিত। গ্রীসের মানুষ তাদের সিটি স্টেটকালীন সময়ে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট একটি স্থানে জড়ো হতেন। সেই সমাবেশ থেকে তারা তাদের সমস্যা সমূহের আলোচনা পূর্বক সমাধান বের করতেন, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতেন। গ্রীকরা পরম যত্নে, গৌরবে সিটি স্টেটের সেইসব স্থানকে এখনও সংরক্ষণ করে চলেছেন।
এথেন্সে এরকম এক সিটি স্টেটের সম্মেলনস্থল বা পার্লামেন্ট দেখতে গিয়ে দেখি বহু শতাব্দীর সেই পুরানো ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে মিট মিট করে পিদিমের আলো জ্বলছে। মাথায় গ্রীক বীরদের শিরস্ত্রাণ পরা সামরিকবাহিনীর সদস্যরা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে সে পিদিমের আলো পাহারা দিচ্ছেন। এ দেখে আমার মনে হতে থাকে এ যেন কোনদিন তাদের পথ চলার এই আলো কেউ নিভাতে না পারে তারই অতন্ত্র প্রহরা। মানুষের গৌরবময় ইতিহাসকে নিজের মাঝে কিছুটা হলেও ধারণ করার মানসে মৌনতাকে সঙ্গী করে আমি সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। এথেন্সের মাটিতে সিটি স্টেটের মিট মিট জ্বলা পিদিমের আলো আমার মাঝে এক ধরনের আত্ম–অনুসন্ধান জাগ্রত করে – ঐতিহ্যের, গৌরবের সেই পাদ প্রদীপের আলোয় দাঁড়িয়ে আমি অবচেতনে ফিরে আসি শেরে বাংলা নগরে।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে আমাদের সংসদ তথা সাংসদরা কি ঐতিহ্য আমাদের উত্তর পুরুষদের জন্য সৃষ্টি করে চলেছেন? ঢাকার অভিজাত এলাকায় নিজের জন্য জমি, বিনা শুল্কে সম্ভব সবচাইতে দামী আধুনিকতম গাড়ি আমদানী, সর্বদলীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের বেতন নিজেরা বাড়িয়ে নেওয়া, দল নির্বিশেষে যখন বিরোধী দলে তখন সংসদে বিনা হাজিরায় বিনা কাজে সরকারি সব সুবিধা ভোগ, সংসদে গিয়ে এই পাশের নেত্রীকে দেবীতুল্য করে ঐ পাশের জনকে ভব্যতার সমস্ত সীমা ছেড়ে অশ্রাব্য গালাগাল ইত্যাদি। কিছুটা সম্বিত ফিরে “Man of Wisdom” ইতিহাস আর রাজনীতি বিজ্ঞানে গ্রীকদের এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে আর রোমানদের “Man of Action” বলে, ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে আমি হাঁটতে থাকি। স্বাপ্নিক গ্রীকদের রাজধানী এথেন্সের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমাকে যেন স্বপ্নে বিভোর করার দেবতারা পেয়ে বসে। স্বপ্নভুখ আমি। জোৎস্নামাখা বড় মেঘের পালের মত আমাদের অমন শিল্পসৌকর্যমণ্ডিত সংসদ ভবন আমার স্বপ্নে ভাসতে থাকে। ঐ সংসদে যেন নেহেরুর মেধা নিয়ে একজন প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়েছেন জাতিকে দিক নির্দেশনা দিতে, চার্চিল হয়ে একজন বিতর্কে অংশ নিয়ে দুর্যোগ দুর্বিপাক পিছু রেখে জাতিকে সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, মলোটভ এর কূটনৈতিক তীক্ষ্ণ ধী শক্তি নিয়ে একজন বিশ্ব দরবারে আমাদের তুলে ধরছেন। স্বপ্নের ভুবনে হাঁটতে হাঁটতে এথেন্স আমার কাছে আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা হয়ে যায় – এথেন্সের আর্কোপলিস আমার কাছে আমাদের সংসদ ভবন– আমি যেন আমার সন্তানকে ঈদের নতুন চাঁদ দেখানোর মত দেখাচ্ছি ঐ দেখ আমাদের সংসদ, অপূর্ব নির্মাণ শৈলিতে গড়া। এখান থেকেই আমার তোমার ভবিষ্যৎ নির্মিতির নকশা প্রণীত হয়।
বাস্তবে ফিরে সেই স্বপ্নের সাথে আমাদের সংসদকে তখন মিলাতে পারিনি, এখনও না – শুধু স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্টই ধারণ করেছি বুকে। সাংসদরা জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা সংসদে উপস্থাপন করবেন, এর উপর চুলচেরা বিশ্ল্লেষণ হবে। সাংসদরা তাদের মেধা, মননশীলতা আর দূরদর্শিতার আলোকে উত্থাপিত বিষয়ের উপর স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন। জাতি তার সংসদ থেকে সামনে চলার পাথেয় পাবে, ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছার অনুপ্রেরণা পাবে। এই সব, জাতি হিসেবে সংসদ তথা সাংসদদের কাছে আমাদের আশা। আশা পূরণ, স্বপ্ন বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব যখন সামর্থ্য তার অনুগামী। অর্থ না থাকলে যেমন চাহিদা পূরণ সম্ভব নয় তেমনি যোগ্যতাহীনের কাছে জাতি খুব বেশি কিছু আশা করতে পারে না। এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরতে চাই। ১৯৯৪–৯৫ সালের দিকে আমি যখন সামরিক বাহিনী কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজে কর্মরত তখনের ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের, নাম উল্লেখ না করাই শ্রেয়, এক দেশের পদস্থ এক সামরিক কর্মকর্তা আমার কাছে প্রায়ই বলত “এই কোর্স খুবই কঠিন, আমি এই কোর্স করতে পারব না” ইত্যাদি। সামরিক অভিযানের কিছু দিক বুঝিয়ে তার কাছে কোর্সকে কিছুটা হলেও সহজ করার জন্য একদিন আমি তাকে সামরিক ম্যাপের উপর যুদ্ধের একটি কল্পচিত্র তুলে ধরে বুঝানোর চেষ্টা করি। আমি অবাক হয়ে যাই যখন দেখলাম ঐ কর্মকর্তা Contour যা বাংলায় সমুন্নিত রেখা বলে, তা বুঝে না। এই না বুঝাটা একজন সাধারণ মানুষ বা অন্য পেশার যে কারো জন্য কোন অপরাধ নয়। কিন্তু একজন সামরিক কর্মকর্তার জন্য এটি একটি গুরুতর অপরাধ। কারণ “সমুন্নিত রেখা” থেকে একজন সামরিক অফিসার পাহাড়ী অঞ্চলের ঢালুর তীব্রতা বা ক্রমাগত উঠে যাওয়া বা নেমে যাওয়া বুঝে নিয়ে সবচাইতে সুবিধাজনক স্থান দিয়ে তার অভিযান পরিচালনা করতে পারেন বা পাহাড়ের উচ্চতা নির্ণয় করে কৌশলগত সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান স্থান নির্বাচন করতে পারেন।
আমার মধ্যপ্রাচ্যের সেই বন্ধু Contour বুঝতে অক্ষম ছিলেন শুধু তাই নয়, ম্যাপ দেখে নদী বা খালের তলদেশে বালি কি মাটি তাও তিনি বুঝতে অক্ষম ছিলেন। সামরিক বিষয়ের যে কোন ছাত্রের এই সব বিষয় না বুঝার কোন কারণই থাকতে পারে না। এখানে উল্লেখ্য আমার বর্ণিত বন্ধুটি তার ভাষ্য অনুযায়ী Gulf War এ একটি ব্যাটালিয়ানও কমান্ড করেছিলেন। কত হতভাগ্য ছিল সেই ব্যাটালিয়ান। পরম করুণাময়ের কৃপায় ঐ ব্যাটালিয়নটি হয়ত যুদ্ধে পার পেয়ে যায়।
ঘটনাটি এখানে তুলে ধরার কারণ, এই ঘটনার সাথে আমাদের অতীত সংসদের অনেক মাননীয় সদস্যের যোগ্যতার মিল আছে। ১৯৯৮–৯৯ সালের দিকে সরকারি কাজে আমার বহুবার আমাদের সংসদীয় কার্যপ্রণালী প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের অনেক সংসদ সদস্য সংসদীয় যোগ্যতার মাপকাঠিতে যেমন জনগণের ম্যান্ডেটকে অসম্মান করেছেন তেমনি নিজেদেরও অন্যদের কাছে হেয় করেছেন। হয়ত বাজেটের উপর আলোচনা চলছে দেখা গেল মাননীয় সাংসদ ফ্লোর নিয়ে তার নেত্রীর প্রশংসায় সময় পার করে দিলেন, পররাষ্ট্রনীতির উপর কোন বিষয় আসল–শুরু হয়ে গেল গালাগালি প্রতিযোগিতা, প্রতিরক্ষা নীতির প্রশ্নে দেখা গেল মাননীয় সাংসদের ভূ–রাজনৈতিক অবস্থা, কৌশলগত অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা স্পষ্ট নয়–তিনি তার বক্তৃতা অতীতমুখী করে সময় পার করে দিলেন। অথচ এসব ক্ষেত্রে সমগ্র জাতির আশা সরকারি দলের মন্ত্রী যেমন অতিরঞ্জিত বা বিষয়কে চাপা না দিয়ে সংসদের সামনে যা সত্য, যা সম্ভব তা তুলে ধরবেন। তেমনি বিরোধী দলেরও থাকবে ছায়া মন্ত্রীসভা। এই ছায়া মন্ত্রীসভার যিনি যেই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেই বিষয়ে তার সম্যক জ্ঞানের আলোকে অথবা এক্ষেত্রে না থাকলে তাকে তা অর্জন করে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় হবু সাংসদের যোগ্যতার উপর সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে আমাদের ভবিষ্যৎ সংসদীয় কর্ণধারদের কাছে আমার একটি নিবেদন পেশ করতে চাই। বিষয়টি হল নতুন সংসদের প্রথম বছরের একেবারে শুরু থেকে মাননীয় সংসদ সদস্যদের জন্য বাজেট, কর, বৈদেশিক বাণিজ্য, কৃষি উপকরণ ও কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ, আইন প্রণয়ন, স্থানীয় সরকার, পুলিশ এবং প্রশাসন বিষয়ক এখতিয়ার ইত্যাাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক কোর্স প্রবর্তন এবং অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করা। এতে মাননীয় সংসদ সদস্যরা যতটুক না লাভবান হবেন তার থেকেও জাতি বেশি উপকৃত হবে।
আমাদের আশা, আমাদের আগামী সংসদে স্বীয় স্বার্থ অর্জন নয় জনগণের মঙ্গলার্থে সাংসদরা নিবেদিত হবেন, প্রজ্ঞা আর দূরদর্শীতায় সাংসদরা জাতিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সংসদে ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে জাতি এবং জাতীয় স্বার্থ উর্ধ্বে স্থান পাবে। স্বপ্নে নয় বাস্তবেও আমরা যেন আমাদের সন্তানদের আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে পারি ঐ অপূর্ব স্থাপত্য শৈলীর – শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংসদে বসে আমাদের সাংসদরা তোমাদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করছেন। এই আশার পাশাপাশি আগামীতে আশঙ্কার কথা আলোচনা করব।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।










