আজকের এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার ঠিক তিন দিন পর অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন ধার্য করা আছে। তবে এ নির্বাচন পুরাপুরি অংশ গ্রহণমূলক হবে না। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন থেকে দূরে রেখেছে এবং নানা অভিযোগে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থেকে নিরোৎসাহিত করেছে। ইতিহাসের এমন এক ক্রান্তিকালে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬’র এই নির্বাচন। ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে এই লেখাটি বিভিন্ন দৈনিকে একই শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। সময়ের বুকে আমাদের দীর্ঘ পরিক্রমণে এই লেখাটির আবেদন এখনও সমভাবে প্রযোজ্য বলে আমার কাছে অনুমিত। তাই কিছুটা পরিমার্জন এবং সংযোজনের পর লেখাটি আবারও প্রকাশ করা হল।
“Representative Government ‘ideally best form of Government” প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ড মিল এর এই বক্তব্যের মর্মার্থ হল, প্রতিনিধিত্বশীল সরকারই, সরকার হিসাবে শ্রেয়। একটি জনগোষ্ঠীর বা দেশের সমগ্র জনসমষ্টি নিজেদের প্রয়োজনে আইন শৃংখলা রক্ষার জন্য আইন প্রণয়নে, উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণে সবার একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়। তাই বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীর দেশে দেশে বিশেষ করে গণতন্ত্র তথা পার্লামেন্টের সূতিকাগার ইংল্যান্ডে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নিজেদের শাসন করেছে। তবে একেবারে শুরুতে সাধারণ জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পায়নি। ইংল্যান্ডে এ্যাংলো – স্যাক্সন রাজারা কোন বিষয়ে পরামর্শ বা অর্থের প্রয়োজনে সমাজের বিত্তশালী–বিজ্ঞজনদের সভায় আমন্ত্রণ জানাতেন। এ ধরনের সভাকে Witenagemot (ওয়েটিনাগেমট) বা Meeting of the Wise Men (মিটিং অব দি ওয়াইজম্যান) অর্থাৎ গুণীদের সমাবেশ বলা হত। পরবর্তীতে এ সভা সমূহের নামকরণার্থে ল্যাটিন শব্দ Perliamentum (পার্লিয়ামেন্টাম) ব্যবহার শুরু হয় যার ইংরেজী মর্মার্থ “Council of the great men” (কাউন্সিল অব দি গ্রেটম্যান) বাংলায়, মহান ব্যক্তিদের সমাবেশ। কালের বিবর্তনে এই Perliamentum থেকেই বর্তমানের Parliament.
জন স্টুয়ার্ট মিলের “Representative Government” বা আমেরিকার বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকনের “the government of the people, by the people and for the people” বা জনগণের সরকার হবে জনগণ কর্তৃক, জনগণের মঙ্গলার্থে। এই সরকার পদ্ধতি খুব সহজে পৃথিবীতে প্রবর্তিত হয়নি। এই পদ্ধতির শুরুতে ইংল্যান্ডের রাজারা নিজেদের মর্জি মত ভূস্বামী ব্যারনস আর গীর্জার যাজক বিশপদের সলা পরামর্শের জন্য ডাকতেন। বলা বাহুল্য সাধারণ মানুষের অভাব অভিযোগ, সুখ দুঃখের কথা এসব সভায় খুব একটা স্থান পেত না। রাজাদের জবাবদিহি বিহীন অবাধ ক্ষমতা, তাদের ক্রমাগত অত্যাচার অনাচারে দুর্দমনীয় করে তোলে। রাজারা কখনও তাদের প্রয়োজনে ব্যারনদের বিরুদ্ধে বিশপদের ব্যবহার করতেন আবার কখনও বিশপদের বিরুদ্ধে ব্যারনদের। রাজাদের এসব অনাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এর থেকে আত্মরক্ষার্থে ব্যারনরা ইংল্যান্ডের রাজা জনকে বন্দী করে বসেন।
১২১৫ সালের ১৫ই জুন গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি সোনালী দিন। এই দিন ব্যারনরা বন্দী রাজা জনকে Magna Carta (ম্যাগনা কার্টা) বা Great Charter (গ্রেট চার্টার) তথা “মহা সনদ” এ স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। মানুষের শৃঙ্খল মুক্তি আর গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই Magna Carta একটি মাইল ফলক।
এই সনদে প্রথমবারের মত উল্লেখ করা হয় আইনের কাটগড়ায় দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত রাজা কোন নাগরিককে হত্যা, বন্দী বা Perliamentum এর সম্মতি ব্যতীত করারোপ সহ অন্য কোন প্রকারের শাস্তি দিতে পারবেন না।
Magna Carta বা মহা সনদ যদিও সকল মানুষের জন্য প্রণীত হয়েছিল তথাপি প্রাথমিক পর্যায়ে এর সুফল ভোগ করে শুধু মাত্র ব্যারনরা। কালের যাত্রায় ক্রমে সাধারণ মানুষ এর ফল ভোগ করার সুযোগ পায়। রাজা তৃতীয় হেনরীর সময় ব্যারনদের সাথে তার তিক্ত সম্পর্ক চরমে পৌঁছায়। এই প্রেক্ষাপটে ১২৬৫ সালে ব্যারনদের নেতা সাইমন দি মন্টফোর্ট ব্যারন আর বিশপদের ছাড়াও প্রতিটি কাউন্টি থেকে ২ জন নাইট আর প্রতি শহর থেকে ২ জন বিখ্যাত নাগরিক যারা যথাক্রমে শেরিফ আর মেয়র কর্তৃক নির্বাচিত তাদের সমন্বয়ে পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকেন। এটি ইতিহাসে প্রথম প্রতিনিধিত্বমুলক পার্লামেন্ট বলে দাবী করা হয়। যদিও তখনও সাধারণ মানুষদের ভোটে নির্বাচিত কোন প্রতিনিধি পার্লামেন্টে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। এ অবস্থায় পার্লামেন্ট ডাকার বা পার্লামেন্টে কোন বিষয় উপস্থাপন করার সম্পূর্ণ এখতিয়ার রাজার হাতে রয়ে যায়। পার্লামেন্ট সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটের পরিবর্তে শেরিফ আর মেয়রদের দ্বারা মনোনীত হয়ে পার্লামেন্টে আসতেন। বলাবাহুল্য মেধা নয় বিত্ত, সামর্থ্য নয় শ্রেণিই ছিল তখনও পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার মাপকাঠি। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্যদের বলা হত “Knight of the Shire” (নাইট অব দি সায়ার)। নাইট অব দি সায়াররা সত্যিকার অর্থে জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছা বা মঙ্গল বাদ দিয়ে যারা তাদের পার্লামেন্টে পাঠাতেন তাদের স্বার্থে, তাদের ইশারায় চলতেন। জনগণ কর্তৃক অনির্বাচিত নাইট অব দি সায়ারের ইতিহাস অনেকটা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথার মত। ইংল্যান্ডের জনগণকে বহুদিন এদের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
১৮৩২ সালের “গ্রেট রিফর্ম এ্যাক্ট” নাইট অব দি সায়ারদের হাত থেকে জনগণকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণের পথ করে দেয়। “গ্রেট রিফর্ম এ্যাক্ট” অনুযায়ী যে সব নাগরিক দশ পাউন্ড পর্যন্ত সম্পদের মালিক তারা পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। এই ব্যবস্থায় ইংল্যান্ডে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভোটের অধিকার লাভ করে।
১৮৬৭ সালে দ্বিতীয় বা “সেকেন্ড গ্রেট রিফর্ম এ্যাক্ট” শহরে বসবাসরত সকল নাগরিককে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচনে ভোটাধিকার দেয়। কিন্তু ‘গ্রামাঞ্চলের গরীব কৃষক, মজুর, খেটে খাওয়া মানুষ তখনও ভোট দেওয়ার অধিকার পায়নি। ১৮৭২ সালে ইংল্যান্ডে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান প্রথা প্রচলনের আইন পাশ হয়। এর আগ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার রীতি চালু ছিল – যা সাধারণ নাগরিকদের অনেক সময় বিপদগ্রস্ত’ করে তুলত। এই প্রসংগে একটি ছোট্ট মজার বিষয় উল্লেখ করছি, যখন প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার নিয়ম প্রচলিত ছিল তখন মাথা গুণে ভোট গ্রহণ করা হত। “Poll” (পোল) একটি পুরানো ইংরেজী শব্দ এর অর্থ “head” (হেড) অর্থাৎ মাথাকে বুঝানো হত। আমরা এখনও ভোটের দিনকে Polling Day আর ভোট গ্রহণ কেন্দ্রকে Polling booth ইত্যাদি বলে থাকি।
১৮৮৪ সালে তৃতীয় বা “থার্ড গ্রেট রিফর্ম এ্যাক্ট” মহিলা ব্যতীত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সকল নাগরিককে ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯১৮ সালের পিপলস্ রিপ্রেজেন্টেশান এ্যাক্ট এর অধীনে প্রথম মহাযুদ্ধে যে সব মহিলা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন তাদের ভোটাধিকার প্রদান করা হয়। দীর্ঘ সংগ্রাম আর প্রতীক্ষার পর ১৯২৮ সালের “পিপলস্ রিপ্রেজেন্টেশান এ্যাক্ট” ইংল্যান্ডে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য পৃথিবীর গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে নিউজিল্যান্ডই প্রথম দেশ যারা ১৮৯৩ সালে নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯১৮ সালে আমেরিকান কংগ্রেস তাদের সংবিধানের ১৯ তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৮ আগস্ট ১৯২০ সাল থেকে নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে।
ফিরে আসি আমাদের সাংসদ আর সংসদীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে। দুর্ভাগ্য হলেও একথা সত্য, আমাদের সংসদ খুব কম সময়ই স্বাধীন সার্বভৌমভাবে যোগ্য লোকদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনে পেশী শক্তি আর কালো টাকার দাপট যেমন সংসদ নির্বাচনে নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে তেমনি অতীতের কোন কোন সংসদের উপর বঙ্গভবনের করাল ছায়া – পুরা সংসদ ভবনকেই রাহুগ্রস্ত’ করেছে। ফলশ্রুতিতে সংসদ থেকে জাতি যা আশা করেছে তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিত্তবান নয় বিজ্ঞজন একটি সংসদের জন্য যেমন প্রাণ, তেমনি সার্বভৌমত্ব একটি সংসদের মূল চালিকা শক্তি। সংসদের সার্বভৌমত্বের উপর ভিক্টোরীয় যুগের বিখ্যাত ইংরেজ বিশেষজ্ঞ A.V.Dicey উল্ল্লেখ করেছেন the right to make or unmake any law whatever, and further, that no person or bodz is recognized by the law- as having a right to override or set aside the legislation of parliament. অর্থাৎ সংসদ হবে এমনই সার্বভৌম যেখানে যেকান আইন প্রণয়ন বা রদ করা যাবে, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অন্যকোন আইন দ্বারা এমন কোন স্বীকৃতি থাকবে না যার দ্বারা ঐ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সংসদে প্রণীত আইনকে অবজ্ঞা করতে পারে।
অতীতে রাজনৈতিক দলগুলির দুর্বলতার সুযোগে আমাদের সংসদেও “নাইট অব দি সায়ার”দের প্রবল পদচারণা ছিল। সময়ে সময়ে বিশেষ করে সামরিক শাসনের সময় কেউ কেউ সংসদকে দুর্বল করে রাষ্ট্রপতির সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছেন। সংসদের সার্বভৌমকে খর্ব করে অন্য কোনও কিছুকে প্রশ্রয় দেয়া হলে আমাদের ভাগ্যেও ইংল্যান্ডের মধ্যযুগীয় দুর্ভাগ্য নেমে আসতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে দেশ, রাজনীতি আর রাজনীতিকদের স্বার্থে যোগ্যতমদের নির্বাচিত করে সংসদে পাঠানো এবং সার্বিক অর্থে একটি সার্বভৌম সংসদের অন্য কোন বিকল্প আমাদের সামনে খোলা নেই। ইংরেজ ঔপন্যাসিক Anthony Trollope (এ্যান্থনী ট্রলপ) প্রসঙ্গক্রমে লিখেছিলেন “I have always thought, that to sit in the British parliament should be the highest object and ambition of every educated Englishmen”. ঔপন্যাসিক এ্যান্থনী ট্রলপ এর এই বাক্যকে একটু অন্যভাবে ভাষান্তর করে শেষ করছি। আমি সব সময় ভেবেছি প্রত্যেক সুশিক্ষিত বাঙালি / বাংলাদেশীর স্বীয় দেশের সংসদ সদস্য হওয়ার লক্ষ্য এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা বাঞ্ছনীয়।
সময়ের প্রয়োজনে বর্তমানে সাংবিধানিক কর্তৃত্বের বাইরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দেশ চালাচ্ছে। এই অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রায় ১৮ মাস দায়িত্বকালীন সময়ে ১১৫ টি অধ্যাদেশ জারী করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে এত এত অধ্যাদেশের আদৌ প্রয়োজন ছিল কিনা? এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারো বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে কোন অভিযোগ ঋজু হলেই তিনি যে কোন ধরনের নির্বাচনে অংশ গ্রহণে অনুপযুক্ত বিবেচিত হবেন, বিচারে তিনি দোষী প্রমাণিত হওয়ারও প্রয়োজন নাই, এটি আমাদের সংবিধানের তৃতীয়ভাগ মৌলিক অধিকার ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থি, অপরাধের দায় মুক্তি, ইত্যাদি এসব বিষয়ে এবং জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্বের উপর পরের লেখায় আলোচনার ইচ্ছা আছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট; গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।













