সমকালের দর্পণ

উদ্ভট এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

দেশের সাম্প্রতিক নানা বিষয় প্রত্যক্ষ করে কবি শামসুর রহমানের কবিতার বই ‘উদ্ভট এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ নাম থেকে আজকের লেখার শিরোনাম ধার করেছি। কারণ চলমান বর্তমান অবস্থা বর্ণনায় এর থেকে আর ভালো এবং যুক্তিযুক্ত কোনও শিরোনাম আমার বিবেচনায় স্থান করে নিতে পারেনি। চলমান যেসব অবস্থা আমাকে বিচলিত এবং আশঙ্কিত করেছে তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলজাতীয় জীবনে অনৈক্যের বিস্তার, বিভাজনের রক্তক্ষরণ, শিক্ষা ব্যবস্থায় অনাসৃষ্টি, সামাজিক মূল্যবোধে ক্ষয়, বিচার ব্যবস্থার প্রতি ক্রমাগত আস্থাহীনতা, অর্থনীতিতে স্থবিরতা, অন্তর্বর্তী সরকারের অনিরপেক্ষতা, জাতীয় ঐক্য সৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগহীনতা জাতীয় অনূভূতির বিষয় ক্রিকেট কূটনীতিতে শোচনীয় ব্যর্থতা এবং প্রাসঙ্গিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যাকে জটিল এক আবর্তে ঠেলে দেওয়া ইত্যাদি।

অনৈক্যের বিস্তার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে একথা অসংকোচে বলা যায় একটি জাতির নানা আন্দোলন সংগ্রামে একটি অভীষ্ট লক্ষ্য থাকে। এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ক্রমান্বয়ে একটি জাতি বা গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়। ঐক্যের শক্তিই তখন ঐ জাতিকে তার অভীষ্টে পৌঁছে দেয়। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার পর সেই জাতি বা গোষ্ঠী তার অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে কাঙ্ক্ষিত অভীষ্টকে ঋজু এবং ঋদ্ধ করতে ঐক্যের ভিত্তিকে প্রসারিত করে। দুর্ভাগ্য হলেও একথা স্বীকার করতে হবে এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন একান্ত নেতিবাচক, সত্যি বলতে গেলে এক্ষেত্রে আমাদের বরং অনৈক্যের কাল থাবা বিস্তার লাভ করেছে। এ বিস্তার দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে, এটি শঙ্কার। এই শঙ্কা নিয়েই এখন আমাদের পথ চলা।

কেউ স্বীকার করুক না করুক বর্তমানে আমাদের জাতিসত্তার মাঝে এক ধরনের বিভাজনের প্রবণতা প্রবাহমান। এ বিভাজন আমাদের মাঝে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে, পরিণামে এই রক্তক্ষরণ জাতিকে শক্তিহীন, উদ্যোগহীনে পরিণত করতে পারে। বিভাজনের কালোছায়া ক্ষেত্র বিশেষে বিস্তৃত হচ্ছে, অতীতে মীমাংসিত অনেক বিষয়কে উপলক্ষ করে। যেমন ৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা, জাতীয় সঙ্গীত, ৩২ নাম্বার। ঐতিহাসিক ভাবে মীমাংসিত এবং স্বীকৃত এই সব বিষয়ের তথা সত্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কোনও কোনও মহল বা পক্ষ জাতিকে যেমন বিভাজনের পথে ঠেলে দিচ্ছে তেমনি জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাসকেও ম্লান করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এ প্রসঙ্গে আমেরিকান সাহিত্যিক, কল্পকাহিনি লেখার পুরুধা পুরুষ Robert Anson Heinlein (রবার্ট এ্যানসন হেইনলেইন) এর একটি কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই, তার প্রবাদতুল্য সেই বাক্যটি হল A generation which ignores history has no past—and no future. অর্থাৎ “যে প্রজন্ম তার ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে সে প্রজন্মের যেমন কোনও অতীত থাকে না তেমনি ভবিষ্যৎ ও না”। বর্তমানে আমাদের কারো কারো মাঝে অতীতকে নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য বা অবজ্ঞা প্রদর্শনের প্রবণতা দৃশ্যমান। এ থেকে মনে হয় আমরা যেন অতীতমুখি হয়ে পথ চলছি। পিছন ফিরে সামনে চলা বিপদজ্জনক। এটি ব্যক্তির জন্য যেমন বিপদজ্জনক তেমনি একটি জাতির জন্যও।

শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে মুখ ফেরালে সেখানে অনাসৃষ্টি কেবলি দিগন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু ঘটনা তেমনিই ইঙ্গিতবহ। আমাদের বিত্তবান প্রভাবশালীরা নিজ নিজ সন্তানকে উন্নত বিশ্বের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিজেরা হয়ত নিশ্চিত, তবে আমাদের চলমান শিক্ষা কার্যক্রম মান সম্পন্ন পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। এর পিছনে মূল কারণ ছাত্রদের অতিমাত্রায় রাজনীতিমুখি কার্যকলাপ, কোন কোন ক্ষেত্রে ছাত্রদের এমন কর্মকাণ্ডে উৎসাহিতও করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান। এর বাইরে ছাত্রদের উপর শিক্ষকদের অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারানো। এই নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য শিক্ষকরাও কম দায়ী নন। অতীতে দেখা গেছে অনেক শিক্ষক নিজের পাঠ দানের প্রস্ত্তুতির চেয়ে রাজনৈতিক লেজুড় বৃত্তিতে বেশি সম্পৃক্ত ছিলেন, পরিণামে তারা শিক্ষকতার মহান পেশাকে যেমন কলুষিত করেছেন তেমনি নিজেদের নৈতিক অবস্থানের জায়গাটিও নড়বড়ে করে ফেলেন। এমন প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনেক শিক্ষক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকারে পরিণত হন। এ পরিস্থিতি আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক ধরনের নাজুক অবস্থায় নিপতিত করে, যার রেশ এখনও বিদ্যমান। পরিণতিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কেবলি অনাসৃষ্টির দিগন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।

রাজনৈতিক অনৈক্য, জাতির মনস্ত্তাত্বিক বিভাজন ইত্যাদি সামাজিক মূল্যবোধকেও ক্ষয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধ যে কোনও জাতির জন্য একটি পরম সম্পদ। যুগ যুগের লালিত এবং ধারণ করা সংস্কার একটি জাতির সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে চলমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিষ বৃক্ষের মত বেড়ে উঠা দুর্নীতিকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতা বিদ্যমান। এ মানসিকতা পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে দুর্বৃত্তায়নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এটি আরো চরম আকার ধারণ করার আগে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় রাষ্ট্র এবং তার সমস্ত অবকাঠামোকে সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং মূল্যবোধ সমূহকে আরো পরিশীলিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিচার ব্যবস্থা ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করে তার উপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে সুদৃঢ় করে। আইন সবার জন্য সমান, এটি বিশ্বজনীন স্বীকৃত একটি সত্য। এর ব্যাত্যয় হলে মানুষ আইনের উপর আস্থা হারাতে থাকে। ফলশ্রুতিতে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে। সমাজে অনাসৃষ্টিকারীরা নির্বিঘ্নে নির্ভয়ে সামাজিক মূল্যবোধ, প্রচলিত আইন, সব কিছুর প্রতি বেপরোয়া মনোভাব পোষণের মাধ্যমে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা ভঙে লিপ্ত হতে উৎসাহিত হয়। সাম্প্রতিকের কিছু কিছু ঘটনা তেমনই ইঙ্গিতবাহী। যেমন বৃহত্তর পরিসরে নিকট অতীতে ভালুকায় প্রকাশ্যে দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারা, সাদ্দাম’এর বউ আর শিশু পুত্রসহ মারা যাওয়ার পরও সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া ইত্যাদি। আরো আগের গণহারে হত্যা মামলার আসামী করা, নিরীহ নির্দোষ মানুষকে শুধু রাজনীতি করেছে বলে হয়রানির শিকার করা, এমন সব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেই হয়ত প্রখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান ১৩ নভেম্বর ২০২৫ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত তার লেখায় উল্লেখ করেছেন “আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন, বা গ্রেফতারের মুখে আছেন। প্রমাণিত কোনও সত্য তথ্যের ভিত্তি ছাড়াই অনেককেই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এমন কোন ব্যবস্থা করতে পারেনি যা প্রকৃত অপরাধের মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা সম্পর্কের কারণে করা মামলা থেকে আলাদা করতে পারে”। তিনি আরো উল্লেখ করেন “যারা আশা করেছিলেন আওয়ামী লীগের পতন বাংলাদেশে মানবাধিকার ও জবাবদিহির জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করবে, তাদের কাছে বাস্তবতা একেবারেই হতাশাজনক”।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪২৫ অর্থ বছরে সরকার ঋণ নিয়েছে ৩ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ নিয়ে বাংলাদেশের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকার উপর। ফলে এই বিশাল অংকের বিপরীতে সরকারকে সুদ বাবদ ঐ একই অর্থ বছরে প্রদান করতে হয়েছে ১ লক্ষ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এর অর্থ হল রাষ্ট্রের ব্যয়িত অর্থের প্রতি ৫ টাকার ১ টাকা চলে যাচ্ছে সুদ মেটাতে। এ টাকা কোন স্কুল কলেজ হাসপাতাল বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয়িত হয়নি। আমাদের রাজপথে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন হয়েছে। কিন্ত্তু এই দেশের বিদ্যমান আসল বৈষম্যের তথা সমাজের অভ্যন্তরে ক্রমাগত বেড়ে উঠা বৈষম্য বেড়ে যে ক্ষয়রোগ রূপ নিয়েছে সে দিকে দৃষ্টিপাত করার অবকাশ আমাদের হয়নি। বর্তমানে এই সমাজের ১০% শীর্ষ ধনীর কাছে স্ত্তূপ হয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৬০শতাংশ। আর নিচের হতদরিদ্র বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে কয়েক শতাংশ সম্পদও নাই।

শিল্প বাণিজ্য বিষয়ক দেশের অন্যতম শীর্ষ সংবাদ পত্র দৈনিক বণিক বার্তা তাদের ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় বিগত বছরে বেসরকারি খাত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধান শিরোনাম করেছেন “বেসরকারি খাতের বিষণ্ন বছর”। এ বিষণ্নতার মাঝে রয়েছে ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাস, কম বিনিয়োগ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানী কমে যাওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি কৌশলের নেতিবাচক প্রভাব, শিল্প বাণিজ্য তথা সর্া্বিক অর্থনীতির শ্লথ গতি এবং অস্থিরতা, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থাহীনতা তৈরী এসব মিলিয়ে বিগত বছর যথার্থই বেসরকারি খাত বিষণ্ন একটি বছর পার করেছে। এ উদ্ধৃতি আমি আমার পূর্বের একটি লেখায়ও টেনেছিলাম।

দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন ডিসেম্বরে রপ্তানী কমেছে ১৪%, রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকা জি ডি পি অনুপাতে যা ৬.% এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় সর্ব নিম্ন, মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯%, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৩%, এফ ডি আই বা বিনিয়োগ ২৪২৫ অর্থ বছরের চেয়ে ৫৮% কম। ঐ একই প্রতিবেদনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সি পি ডি’র প্রধান নির্বাহী ড. ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতির এ অবস্থাকে শ্বাসরুদ্ধকর বলে অভিহিত করেছেন।

দৈনিক কালের কণ্ঠ একই দিন ফারুক মেহেদী প্রণীত তাদের আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন “অর্থনীতির এ অবস্থাকে উদ্যোক্তাব্যবসায়ীরা কখনো বলেন (রপ্তানী এবং রেমিট্যান্স ভালো থাকায়) হৃদপিণ্ড সচল কিন্ত্তু কিডনি এবং লিভার (ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর এবং রাজস্ব ঘাটতি) অকেজো। সব কিছু বিবেচনায় নিলে আমরা ভালো আছি বলা যাবে না। (চলবে)

লেখক: কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য
পরবর্তী নিবন্ধচন্দনাইশের হাশিমপুরে মোমবাতি প্রার্থীর ব্যাপক গণসংযোগ