সমকালের দর্পণ

পাশ্চাত্যের ইরানভীতি

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

আমেরিকা তার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পুরো বিশ্বকে এক ধরনের অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এটি ভেনেজুয়েজুলার ঘটনা প্রবাহ, গ্রীনল্যান্ড নিয়ে দুনিয়ার সব রীতিনীতি ভঙ্গ করে আমেরিকার দখলদারিত্বের উলঙ্গ উন্মাদনা, ইরানে সহিংস আন্দোলনে উস্কানী, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের নানা কুর্কীতিকে নিঃশর্ত সমর্থনের মাধ্যমে প্রকাশিত। ইরানকে ঘিরে আমেরিকার কূটনীতি এবং নানা সামরিক অভিযান উস্কানীর পিছনে যে গূঢ় রহস্য তা হল মধ্যপ্রাচ্যকে পুরাপুরি কব্জায় নিতে হলে ইরানকে এক শক্তিহীন, প্রতিরোধহীন, প্রতিবাদহীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। ইরান বরাবরই নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকাইসরাইলের স্বার্থের প্রতিপক্ষ হিসাবে কার্যকরভাবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে। ইরান আমেরিকাইসরাইলের সা্বর্থের বিরুদ্ধে তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে তার প্রক্সি গেরিলা বাহিনী সমূহ গড়ে তোলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফিলিস্তিনে হামাস, লেবাননে হিজবুল্লা, ইয়েমেনে হাউথি, সিরিয়াইরাকে মিলিশিয়া বাহিনী।

বর্তমান বাস্তবতা হল আমেরিকাইসরাইল যৌথভাবে ইরানী এইসব প্রক্সির বিরুদ্ধে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে তাদের অনেকটা দুর্বল অবস্থায় ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছে। সিরিয়ায় আসাদের পতন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভূকৌশলগত অবস্থানের এক বিরাট বিপর্যয়। কারণ সিরিয়ার নতুন সরকার গঠন হতেই তারা ইরানী যে কোন উপস্থিতিকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকাইসরাইলের জন্য এক বিরাট বিজয়। কারণ এ যাবত ইরানের আমেরিকাইসরাইলের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির মূল অগ্রবর্তী পোস্ট ছিল হিজবুল্লাহ। ইরান থেকে হিজবুল্লাহ’র মূল সরবরাহ মাধ্যম হিসাবে কাজ করত সিরিয়া।

হিজবুল্লাহ’র মূল নেতা হাসান নাসরুল্লাহ’র হত্যাকাণ্ড, লেবাননে হিজবুল্লাহ’র ঘাঁটিগুলির উপর আমেরিকাইসরাইলের ক্রমাগত আক্রমনে হিজবুল্লাহ’র ক্ষয়ক্ষতি বিপুল। এসমস্ত কারণ লেবাননে তথা সার্বিকভাবে হিজবুল্লাহকে অনেকটা আত্মরক্ষায় ঠেলে দিয়েছে।

একইভাবে ইসরাইলের একের পর এক আক্রমণে হামাস’এর রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া, সামরিক কমান্ডার ইয়াহিয়া সিনওয়ার, মোহাম্মদ দায়েফ’ হত্যা কাণ্ডের শিকারে পরিণতহন। এসমস্ত আক্রমণে হামাসও অনেকটা আত্মরক্ষার পথ বেচে নিতে বাধ্য হয়।

ইয়েমেনের হাউথিদের উপর আমেরিকা ইসরাইল ক্রমাগত আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের সম্মুখ সারির অনেক নেতাকেও হত্যা করে।

ইতিপূর্বে একই লক্ষ্য অর্জনে আমেরিকানরা ৩ জানুয়ারি ২০২০ বাগদাদে ইরানী কুদস বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলার মাধ্যমে হত্যা করে।

১ এপ্রিল ২০২৪ ইসরাইল দামেস্কস্থ ইরানের কনস্যুলেট আক্রমণ করে। সেই আক্রমণে ইরানের ইসলামী রেভ্যুলুশনারী গার্ডের কুদস ব্রিগেডের দুজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা জাহেদি এবং তার ডেপুটি জেনারেল মোহাম্মদ হাদি সহ সাতজন সেনা সদস্য নিহত হন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সমস্ত রীতি নীতি বিরুদ্ধ।

আমেরিকা ইসরাইলের ক্রমাগত এইসব আক্রমণে ইরানের ‘এক্সিস অব রেসিস্ট্যোনস’ বর্তমানে বেশ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান।

এই সুযোগে আমেরিকা ইরানী অর্থনীতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তার ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার পলিসি’ তথা আমেরিকা ইরানের উপর প্রবল অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে চলেছে। এর লক্ষ্য হল ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করা, পারমানবিক গবেষণা কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা, ব্যালেস্টিক মিসাইল ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি করা ইরানকে তা থেকে নিবৃত্ত করা।

অর্থনৈতিক কঠিন অবরোধ ইরানী অর্থনীতিকে অনেকটা বির্পযস্ত করে তোলে। অর্থনীতির এই বিপর্যয়ে সাধারণ ইরানী জনগনের মাঝে অসন্তোষ দানা বাঁধে। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। মানুষের এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা সরকার এবং জনগণের মাঝে সংঘাত উস্কে দেওয়ায় ব্রতী হয়। অথচ সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ আমেরিকার অবরোধ জনিত কারণে সৃষ্ট। ইরানী সরকার সে দেশের সচেতন মানুষ এবং দেশ প্রেমিক সামরিক বাহিনী আমেরিকার উস্কানীকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে।

তবে পরিতাপের এবং দুঃখজনক হল আমেরিকার জনদুর্ভোগের এই অর্থনৈতিক অবরোধে সমর্থনের ঢোল তবলা নিয়ে অর্কেষ্ট্রা সাজিয়েছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন। ইরানের সম্পদ আটক, অর্থনৈতিক অবরোধ, দেশের অভ্যন্তরে নাশকতামূলক তৎপরতা পরিচালনা, সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা ইত্যাদির মাধ্যমে ইরানকে কাবু করার সমস্ত আয়োজন আমেরিকার নেতৃত্বে আয়োজিত হয়েছে। ইরানের উপর এই বৈরী আচরণ হত না, যদি না ইরান সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর, জর্দান এর মত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকাইসরাইলের কর্মকাণ্ডগুলিকে শুধুমাত্র নিন্দা জানানোতে সীমাবদ্ধ থাকত। সেটি হয়নি ইরান আরব তথা মধ্য এশিয় অঞ্চলের স্বার্থের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে বলে। এখানে হয়ত ইরানের স্বার্থ আরব উপদ্বীপ এবং মধ্য এশিয় অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার। আমেরিকা এবং ইসরাইল ইরানকে এই কারণে বহু আগেই তাদের লক্ষ্যবস্ত্তুতে পরিণতকরেছে। এটি করা হয় ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে। এ বিষয়টি আমি আমার পূর্বের একটি লেখাতেও উল্লেখ করেছি। প্রাসঙ্গিক বলে পুনঃউল্লেখ করছি।

তেলআবিবের উত্তরের শহর হারজেলিয়া। হারজেলিয়ায় ২০০০ সাল অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তেফাদা’র (ইন্তেফাদা অবিচার, অন্যায়, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম) পর থেকে প্রতিবছর ইহুদি গবেষক, কৌশল প্রণেতা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি, ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ, বিশেষজ্ঞ স্তরের লোকজনদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছরের সম্মেলনের বিষয়বস্ত্তু পূর্ব নির্ধারিত এবং খুবই আগ্রহ উদ্দীপক ‘দি ব্যালেন্স অব ইসরাইল ন্যাশনাল সিকিউরিটি’ অর্থাৎ বাংলা করলে দাঁড়ায় ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা।

২০০৭ সালের হারজেলিয়ার এই সম্মেলনে প্রথমবারের মত ৪২ জন আমেরিকান কৌশল প্রণেতা যোগদান করেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী গর্ডন ইংল্যান্ড, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাস বার্নস, প্রিন্সটন ইউনির্ভাসিটির অধ্যাপক বার্নাড লেউইস। ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ এলর্মাট সহ মন্ত্রী সভার প্রায় অর্ধেক মন্ত্রী এই সম্মেলনে উপস্থিত হন। সম্মেলনে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন। এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্য তথা পৃথিবীর ভূরাজনীতির ইতিহাসে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনার মাইল ফলক হয়ে থাকবে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান। ২০০৭ হারজেলিয়া সম্মেলন এ যাবত কালের ইসরাইলী কৌশল প্রণেতাদের ফিলিস্তিনের প্রতিরোধযোদ্ধা এবং আরবদেশগুলিকে নিয়ে সব হিসাব নিকাশ উল্টে দিয়ে সামনে নিয়ে আসে ইরানকে। সম্মেলনের স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত হয়, ফিলিস্তিনী বা আরব নয় ইরানই হবে ফিলিস্তিনীদের পক্ষে ইসরাইলের জন্য প্রধানতম হুমকি এবং বিনাশকারী শক্র। তারা আরও সিদ্ধান্তে আসেন ইসরাইলের প্রতি ইরানের পক্ষে এ হুমকি তখনই বাস্তবতা লাভ করবে যখন ইরান পারমানবিক শক্তিধর হবে। সুতরাং ইরানকে কোন অবস্থাতেই পারমানবিক শক্তির অধিকারী হতে দেওয়া যাবে না।

আমেরিকা এবং ইসরাইল দুটি দেশই একই যুক্তিতে উপনীত হয় ইরান পারমানবিক শক্তিধর হলে মধ্যেপ্রাচ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়বে আর আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর চাপিয়ে দেওয়া কৌশল আর ধোপে টিকবে না। এই প্রেক্ষাপটে ইরান তার শান্তিপূর্ণ বেসামরিক কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য নির্মিত পারমানবিক স্থাপনা সমূহকে উপলক্ষ্য করে আমেরিকা ইরানের উপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে চলেছে।

এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’ এর মাধ্যমে ইরান পশ্চিমাদের সাথে একটি রফায় পৌঁছেছিল। কিন্ত্তু ইসরাইল চায়নি ইরান সসম্মানে স্বগৌরবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক। এ কারণেই ক্যাপিটাল হিলের ইহুদি লবী পি+১ অর্থাৎ জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য + জার্মানী কর্তৃক স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান থেকে আমেরিকাকে বেরিয়ে যেতে উস্কানি দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়। যার প্রলম্বিত কার্যক্রম ইরানকে আমেরিকাইসরাইল এবং ইউরোপিয় দেশগুলি এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরান বিষয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়ন, আমেরিকাইসরাইলকে প্রবল এবং কার্যকরী সর্মথন জানালেও গ্রীনল্যান্ডের বিষয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি জার্মানী, ফ্রান্স, বৃটেন ডেনমার্ককে সমর্থন সূচক গ্রীনল্যান্ডে সৈন্যও প্রেরণ করেছ্‌ে। বিশ্ব আমেরিকা ইউরোপের দ্বিচারিতার ন্যাক্কারজনক আচরণ আরো একবার প্রত্যক্ষ করল।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য
পরবর্তী নিবন্ধজ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিক চেতনার মিলনমেলা