সব সূচকে চট্টগ্রাম বন্দরের অগ্রগতি

এক বছরে সর্বোচ্চ কন্টেনার হ্যান্ডলিং । ৫৪৬০ কোটি টাকা আয় । জাহাজ আসা বেড়েছে ১০.৫%

হাসান আকবর | শুক্রবার , ২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

নানা প্রতিকূলতার মাঝেও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫ সালে কন্টেনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড অর্জন করেছে। চলতি বছরে বন্দর দিয়ে দেশের মোট আমদানিরপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ সাধারণ পণ্য এবং ৯৮ শতাংশ কন্টেনারবাহী পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক গতকাল জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কন্টেনার, ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত বছরের তুলনায় কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.০৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১.৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের অগ্রগতি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে ৩৪ লাখ টিইইউএসের বেশি কন্টেনার হ্যান্ডলিং হওয়ায় এটি চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে আগের বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউএস কন্টেনার, ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪০৬টি বেশি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়েছে, যা বন্দরের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান উন্নতির ইঙ্গিত দেয় বলেও সূত্র জানিয়েছে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এর মধ্য দিয়ে এনসিটিতে বেসরকারি সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের প্রায় দেড় যুগের অবসান হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগে কোনো কোনো মহল থেকে কন্টেনার হ্যান্ডলিং কমে যাবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু বছর শেষে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনায় ড্রাইডক বেশ তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতা, কাস্টমসের কলম বিরতি, বিভিন্ন ধর্মঘট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দর জাহাজ জট কমিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ছিল ২.৫৩ দিন এবং কন্টেনার ডুয়েল টাইম ছিল ৯.৪৪ দিন, ফলে আমদানিরপ্তানিকারকরা দ্রুত পণ্য খালাস ও রপ্তানির সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে বন্দর লিড টাইম কমে এসেছে এবং সামগ্রিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি ও দক্ষতা বেড়েছে।

রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বন্দর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৫৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। চলতি বছরেই চট্টগ্রাম বন্দর সরকারকে দিয়েছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যার মাধ্যমে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বন্দরের কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তরও বড় ভূমিকা রাখছে। অনলাইন ইমুভমেন্ট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট চালুর ফলে কাগজবিহীন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে একদিকে ব্যবহারকারীদের সময় ও খরচ সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে জালিয়াতির ঝুঁকি কমে আসছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকেও চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট সিকিউরিটি পরিদর্শনে কোনো ধরনের ঘাটতি ছাড়াই উত্তীর্ণ হওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বেটার্মিনাল, লালদিয়া ও পানগাঁও কন্টেনার টার্মিনালসহ একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

বন্দরের পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক দৈনিক আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা বন্দরের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন। এছাড়া অটোমেশন, আধুনিক হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট সংযোজন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নতুন নতুন ইয়ার্ড, টার্মিনাল, জেটি, শেড নির্মাণ, সংস্কার, অপারেশন, নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুততর করাসহ বহুমুখী উদ্যোগের কারণে বিগত বছরের তুলনায় সব খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন হচ্ছে। এ অর্জনে সরকার, মন্ত্রণালয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বন্দরের শ্রমিককর্মচারী ও বন্দর ব্যবহারকারীসহ সংশ্লিষ্টরা সমান অংশীদার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসার্কের চেতনা এখনো জাগ্রত
পরবর্তী নিবন্ধশেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় রংপুরকে হারাল রাজশাহী