বাংলাদেশে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনৈতিক দল, একাডেমিয়া, সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ইউএইচসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা: বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ’ শীর্ষক এক নীতিনির্ধারণী সংলাপে বক্তারা এ কথা বলে। বক্তারা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনো বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা মৌলিক অধিকার হলেও বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ এখনো ৫০–এর ঘরে। থাইল্যান্ডের মতো সমসাময়িক রাষ্ট্র স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করলেও বাংলাদেশ সেটি পারছে না। এমনকি শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো অনেক দেশও অনেক এগিয়ে। এ দেশে প্রতি বছর মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট বের হয়ে এলেও বাড়ছে না সেবার মান। এছাড়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকবলের সংকট রয়ে যাচ্ছে। এ পর্যায় থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার ও সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য দলমত নির্বিশেষে সহযোগিতা ও আইনি সংস্কারের গুরুত্ব দিতে হবে।’
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ইউএইচসি ফোরামের আহ্বায়ক হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএইচসি ফোরামের সদস্য সচিব ডা. মো. আমিনুল হাসান। উপস্থাপনায় বাংলাদেশের ইউএইচসি অগ্রযাত্রাকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয় এবং আর্থিক দুরবস্থার ঝুঁকি কমাতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্যের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ মানুষ এখনো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে, যা ২০৩০ সালে ১৮–২২ শতাংশ নামিয়ে আনা সম্ভব বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউএইচও। সার্কভুক্ত দেশেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় এসেছে। এছাড়া পাকিস্তানের ৫১, নেপালের ৫৯, মালদ্বীপ ও ভুটানের ৬৫ শতাংশ মানুষ এ সেবা পাচ্ছে। তবে পিছিয়ে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষ এ সেবার আওতায় রয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সিঙ্গাপুরের ৮৬ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা পায়। এছাড়া থাইল্যান্ড ৮৩, ভিয়েতনাম ৭৩, ইন্দোনেশিয়া ৭১, মালয়েশিয়া ৭৭ এবং মিয়ানমারের ৬৪ শতাংশ মানুষ এ সেবার আওতায় এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব দেশের মানুষ ৭৫–৯৫ শতাংশ পর্যন্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দেশের সব মানুষের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ভবিষ্যৎ সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বক্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবিধানিক অধিকার হয়েও বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখনো একটি দূরবর্তী লক্ষ্য হিসেবেই রয়ে গেছে। পত্রিকার খবরে প্রকাশ, প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৬১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা দেখায় যে স্বাস্থ্য খাত আর শুধু একটি সেবা খাত নয়, এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধিরও বড় একটি উৎসে পরিণত হয়েছে। সামপ্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কেবল চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতায় থেমে নেই; এটি সরাসরি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তাকে গভীর করছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যখন সরাসরি মানুষের পকেট থেকে আসে, তখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেবা প্রতিষ্ঠানের সীমিত প্রস্তুতি, মানবসম্পদের ঘাটতি ও সেবার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশের প্রায় অর্ধেক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত নয়–এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত অবহেলার ফল। স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটই এ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বমান অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য যেখানে ৪৪ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র ৮ জনের কিছু বেশি। এই ঘাটতি কেবল সংখ্যার নয়; দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সুষম বণ্টনের অভাবও এতে যুক্ত। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অসামঞ্জস্য এবং শূন্য পদের দীর্ঘদিনের অবহেলা মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। টিকাদান ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে ফল আসতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। উন্নতির পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ, যখন তা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং নাগরিকের আস্থাকে শক্তিশালী করে। সবর্জনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে।








