চট্টগ্রামের সুইজারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনাময় বিস্তৃত এলাকা সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। ‘জঙ্গল’ হিসেবে পরিচিত হলেও এলাকায় আর অস্তিত্ব নেই জঙ্গলের। বছরের পর বছর ধরে দিতে রাতে কেটে ফেলা হয় পাহাড়, হারিয়ে যায় বন–বনানী, জঙ্গল। রাষ্ট্রের ভিতরে আলাদা রাজ্য হয়ে উঠা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুরে অর্থের মূল উৎস প্লট বাণিজ্য। বছরের পর বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এলাকাটি যৌথবাহিনীর অভিযানের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই অভিযানের পর অনেক সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ এলাকাটি দেখতে গিয়ে বিস্মিত হয়েছেন। পাহাড় এবং সমতল মিলে জায়গাটিকে তুলনা করছেন সুইজারল্যান্ডের সাথে।
গত সোমবার সেহেরি থেকে ইফতার পর্যন্ত দিনব্যাপী পরিচালিত অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সমন্বয়ের গঠিত ৪ হাজার সদস্য অভিযান পরিচালনা করেন। ওই সময় গ্রেফতার করা হয় ২২ জনকে, উদ্ধার করা হয় দেশি বিদেশি
অস্ত্রশস্ত্র।
অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, অব্যাহতভাবে পাহাড় কেটে বসতি ও প্লট তৈরি করা হয়েছে। বড় বড় রাস্তা, ড্রেন, রিটেইনিং ওয়াল, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করে পুরো এলাকাটিকে গড়ে তোলা হয়েছে একটি আলাদা জগত হিসেবে। যে হারে পাহাড় কাটা চলছে তা অব্যাহত থাকলে অচিরেই পুরো এলাকা পাহাড়শূন্য হয়ে পড়বে।
ফৌজদারহাট বায়েজিদ লিংক রোডের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীতে উত্তর পাশে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এলাকা জঙ্গল সলিমপুর। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে হলেও অবস্থানগতভাবে অনেকটা নগরের ভেতরেই। পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা এলাকা।
বিশাল পাহাড়ি এলাকাটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথমদিকে ছিন্নমূল এলাকা ও ভিতরের দিকে আলীনগর। দুই এলাকাতেই দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতবাড়ি, দোকানপাট, বাজার ও প্লট। বর্তমানেও পাহাড় কেটে ইটের দেয়াল তুলে তৈরি করা হচ্ছে প্লট, এখনো জমজমাট প্লট বাণিজ্য। কোথাও কোথাও টিনের ঘেরাও দিয়ে, কোথাও ৮/১০ ফুট উঁচু ইটের দেয়াল তুলে আবার কোথাও কোন রাখঢাক ছাড়াই চলছে পাহাড় কাটার কাজ।
লিংক রোড থেকে কিছুটা সামনে এগোলেই জঙ্গল সলিমপুর। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে প্রধান সড়ক, এডিশনাল ডিআইজি নাজমুল হাসানের ভাষায় আমেরিকান এ্যভিনিউর মতো অন্তত ৮০ ফুট চওড়া সড়ক। সড়কটি কোথাও কাঁচা কোথাও ইট বিছানো। সড়কটির পাশে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে অসংখ্য ঘরবাড়ি। কোথাও টিনের ঘর, কোথাও আবার পাকা দালান। স্থানীয় এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোটখাটো বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বিদ্যালয়ের আশপাশে দোকানপাট ও দ্বিতল মার্কেট রয়েছে। রয়েছে একটি মাজারও। সড়কের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট পথ উঠে গেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বসতিগুলোর দিকে। বেশির ভাগ পাহাড়ই এখন প্রায় ন্যাড়া, কোথাও গাছপালা নেই বললেই চলে। জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় কেটে বসতি গড়ে ওঠার ইতিহাস নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। পুলিশ এবং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী আলী আক্কাস প্রথম এই এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন। দখল ধরে রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল সীমিত। সেই সুযোগে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ি জমি প্লট আকারে বিক্রি শুরু হয়।
পরবর্তীতে আলী আক্কাস র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তার সহযোগীরা আলাদা আলাদা দল গড়ে তোলে। কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকের নেতৃত্বে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ ও আলীনগর বহুমুখী সমিতির মাধ্যমে প্লট ক্রেতাদের সংগঠিত করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই দুই সংগঠনের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।
এই প্লট বাণিজ্যকে ঘিরেই এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী। পাহাড় কাটা নির্বিঘ্ন রাখতে দীর্ঘদিন ধরে বাইরের মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আলীনগর অংশে প্রবেশের জন্য মূল ফটকে অনুমতি নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ আত্মীয়স্বজন নিয়ে এলে তাদের স্বজনরাই মূল ফটক থেকে ভেতরে নিয়ে যান।
বর্তমানে ইয়াছিন এবং রোকন মেম্বার দুইটি পৃথক সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারাই মূলত বিস্তৃত এলাকাটি শাসন করেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ এতো বিশাল যে, সন্ত্রাসীদের অনুমোদন ছাড়া কারো পক্ষেই এলাকায় প্রবেশ করা সম্ভব হতো না। চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ স্বীকার করেছেন যে, ইতিপূর্বে চার দফা উদ্যোগ নিয়েও প্রশাসন এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি। গত সোমবার স্মরণকালের বৃহত্তম প্রস্তুতি নিয়ে অবশেষ জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গেলে র্যাব–৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আরও চারজন র্যাব সদস্য আহত হন। সোমবারের অভিযানের সময়ও কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় যৌথ বাহিনীকে। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, আলীনগরে প্রবেশের মুখে একটি ট্রাক রেখে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি সরিয়ে বাহিনী এগিয়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে দেখা যায়, রাতের আঁধারে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে ইট–বালু ফেলে তা ভরাট করে বাহিনীর গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করে।
এদিকে জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছেন, স্বল্পমূল্যে বসতি গড়ার সুযোগ পাওয়ায় তারা এখানে প্লট কিনেছেন। কেউ উচ্ছেদ হলে বিকল্প পুনর্বাসনের দাবি জানান তারা। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে ১১টি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার–২, মডেল মসজিদ ও নভোথিয়েটার নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। নতুন কারাগারের জন্য ৫০ একর জমি নির্ধারণ করা হলেও দখলমুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি।
যৌথ অভিযান শেষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, এই এলাকায় প্রশাসনের পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হবে।
বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার আগে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।












