সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় এক র্যাব কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত র্যাব কর্মকর্তার নাম নায়েব সুবেদার মোহাম্মদ মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব–৭ এর আরো তিনজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। র্যাব–৭ এর ওই তিন সদস্যকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আহতরা হলেন, ল্যান্স নায়েক ইমাম উদ্দিন, নায়েক আরিফ ও কনস্টেবল রিফাত।
গতকাল রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব–৭ এর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিকাল সোয়া ৪টার দিকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হয়। এসময় র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন দুষ্কৃতকারী র্যাব সদস্যদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় র্যাবের চারজন সদস্য রক্তাক্ত আহত হয়। পরবর্তী সময়ে থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাদেরকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সিএমএইচে নেওয়া হয়। এর মধ্যে নায়েক সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তিনি র্যাব–৭ এ ডিএডি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাকি তিনজন চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে র্যাব–৭ এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার বিকেলে ইয়াছিন বাহিনীর একটি দলীয় কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল। এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যুবদল নেতা রোকন ও তার সহযোগীরা। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটনার খবর পেয়ে র্যাবের একটি টিম ঘটনাস্থলে অভিযানে গেলে হামলার শিকার হন। সেখানকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সাদা রঙের মাইক্রোবাসে র্যাব সদস্যরা সেখানে অভিযানে যান। মাইক্রোবাস ফিরে আসার সময় সন্ত্রাসীদের তা ভাংচুর করতে দেখা যায়।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গতকাল যে অফিসটি উদ্বোধন করাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষ হয় সেটি ৫ আগস্টের পূর্বে আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর রোকন বাহিনী তা দখল করে নেয়। মাস কয়েক পূর্বে রোকন ও ইয়াছিন বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনার পর অফিসটির দখল চলে যায় ইয়াছিন বাহিনীর হাতে। রোকন বাহিনী দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতেই গতকাল হামলা চালায় বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। তারা জানায়, গতকাল বিকেলে ইয়াছিন বাহিনীর লোকজন বিএনপির অফিস হিসেবে উদ্বোধন করার সময় রোকন বাহিনীর লোকজন বাধা সৃষ্টি করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এতে দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। পরবর্তীতে র্যাবের একটি দল ঘটনাস্থলে অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া হামলার শিকার হন। যুবদল নেতা মোহাম্মদ রোকন স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
প্রসঙ্গত, সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় ৪ দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিঙ্ক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল ছলিমপুর।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এলাকাটি এখনো সশস্ত্র পাহারায় নিয়ন্ত্রিত হয়। জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসন সূত্র অনুযায়ী, লিংক রোড সংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাসজমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪ সালে থেকে সেখানে বসতি শুরু হয়। বর্তমানে ৮–১০ হাজার পরিবারের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস সেখানে। পুরো এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়েছে ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য। কম টাকায় ‘জমি কিনে’ সেখানে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই রয়েছে সেখানে, যাদের অধিকাংশ রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর, হোটেল বয় ও গার্মেন্টম শ্রমিক। ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে আরেকটি গ্রুপ। এর জেরে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার সবগুলোই পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। গত দেড় বছরে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ জন বিএনপি নেতা কর্মি খুনের শিকার হয়েছেল। এ ছাড়া গত নভেম্বরে এ এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক। এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ ও পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে প্রশাসন।
এলাকাটি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। এর আগেও অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। গতকালের ঘটনার পর সাংবাদিকেরা সেখানে প্রবেশ করার চেষ্টা করেও যেতে পারেননি।









