সড়ক প্রশস্ত না হলে দুর্ঘটনা কমবে না

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক । সোজা করতে হবে অসংখ্য বাঁক । ৭ স্থানে বসল রাম্বল স্ট্রিপ

লোহাগাড়া প্রতিনিধি | শনিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৫ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেন করা এবং অসংখ্য বাঁক সোজা না হওয়া পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা থামার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে প্রতিনিয়ত হতাহতের ঘটনাও ঘটে। ঈদের ছুটিতে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৩ সড়ক দুর্ঘটনায় নারীশিশুসহ ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দুর্ঘটনার হটস্পট জাঙ্গালিয়ায় গতিরোধক রাম্বল স্ট্রিপ বসানো হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়সারা কাজ করছেন। এসব রাম্বল স্ট্রিপের কারণে দুর্ঘটনা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। দোহাজারী হাইওয়ে থানা ও নিরাপদ সড়ক চাই লোহাগাড়া শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে জাঙ্গালিয়ায় ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছেন ২৯ জন। আহত অর্ধশতাধিক।

জানা যায়, ২০২৩ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কে ছয় লেনের চারটি বাইপাস ও একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রকল্প একনেকে পাস হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। এর আগে বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দলও এই মহাসড়কটি পাবলিকপ্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে ছয় লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাই করে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বিপজ্জনক বাঁক কমানোর সুপারিশ ছিল। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ গত এক বছরে এই মহাসড়কে অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারে থাকা পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে যেতে হয় এই মহাসড়ক হয়ে। মহেশখালীতে চলমান ৭২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞও চলছে এই মহাসড়ক ঘিরে।

দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, অপ্রশিক্ষিত চালক, লবণ পানিতে মহাসড়ক পিচ্ছিল, গাড়ির এলইডি হেডলাইটের আলো, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ছোট যানবাহন চলাচল, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চলাচল ও সড়কের দুই পাশে অসমান অংশসহ কয়েকটি কারণে এই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। বিশেষ করে মধ্যরাত ও ভোরের দিকে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কক্সবাজার আসেন পর্যটকরা। দূরদূরান্ত থেকে আসা চালকদের এই সড়কের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

গত ২ এপ্রিল দুর্ঘটনা কবলিত জাঙ্গালিয়া পরিদর্শন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক। তার সাথে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইনামুল হাছান, অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমানসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ।

ফারুক ই আজম বলেন, আজই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সাথে এ বিষয়ে আলাপ করব। সড়কে কী অসঙ্গতি আছে তা সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের দেখতে বলেছি। তারা এখানে আছেন এবং দ্রুততম সময়ে করণীয় নির্ধারণ করে জানাবেন। দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেককে বিআরটিএর পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং সরকারিভাবে আরও ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। আহতদের সুচিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে চিকিৎসা বাবদ ১৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিআরটিএর পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার জন্য আরও প্রয়োজন হলে সরকার সহায়তা করবে।

তিনি বলেন, মর্মান্তিক, দুঃখজনক, বেদনাদায়ক এ ঘটনা আমাদের জাতিকে বিমর্ষ করেছে। আমরা স্বজনদের সাথে সমব্যথী। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগছে। অথচ ঢাকার মানুষ ফ্লাইটে আধা ঘণ্টায় পৌঁছে যাচ্ছে। এটি বৈষম্যের উদাহরণ। এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া উচিত। এছাড়া বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সড়ক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ সড়ক চাই লোহাগাড়া শাখার সভাপতি মোজাহিদ হোসাইন সাগর জানান, চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করা ও অসংখ্য বাঁক সোজা করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। যার ফলে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে দূরদূরান্ত থেকে আসা চালকদের এ সড়কের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। চট্টগ্রামকক্সবাজার প্রশস্ত না করা পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা থামার সম্ভাবনা নেই বলে জানান তিনি।

লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এই মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত না হলে থামবে না দুর্ঘটনা। দূর্ঘটনার হটস্পট জাঙ্গালিয়া গতিরোধক রাম্বল স্ট্রিপ বসিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়সারা দায়িত্ব পালন করছেন। এসব গতিরোধকের ফলে দুর্ঘটনা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কারণ মহাসড়ক লবণ পানিতে পিচ্ছিল থাকে। এতে ওই ঢালু স্থানে রাম্বল বসানোর কারণে প্রতিটি গাড়িকে ব্রেক করতে হবে। ব্রেক করলেই গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এছাড়া উক্ত নির্জন স্থানের পাশে ঘন বন থাকায় গাড়ির গতি কম থাকলে ডাকাতির আশঙ্কাও রয়েছে।

সরেজমিনে গতকাল শুক্রবার বিকালে জাঙ্গালিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জাঙ্গালিয়ার আধা কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৭ স্থানে বসানো হয়েছে রাম্বল স্ট্রিপ। বসানো রাম্বল স্ট্রিপের উপর দেওয়া হচ্ছে সাদা রং। ঘটনাস্থলের দুই পাশে প্রস্থে ২ মিটার ও দৈর্ঘ্যে ৩শ মিটার করে ইট বিছিয়ে সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলমান রয়েছে। রাম্বল স্ট্রিপ বসানোর কারণে গাড়ি ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা গেছে। এছাড়া দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চুনতি ইউনিয়নের হাজি রাস্তার মাথা এলাকায় ২ স্থানেও বসানো হয়েছে রাম্বল স্ট্রিপ।

এদিকে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শ্যামল ভট্টাচার্য জানান, ‘চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ও বাংলাদেশ সরকারের ২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা প্রদান করার কথা ছিল। ২০২৩ সালে একনেকে পাস হলেও এ প্রকল্পের মূল কাজ কবে শুরু হবে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যে জাইকার প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন ও পরামর্শ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কনসালট্যান্ট নিয়োগের আগে আরও কিছু ধাপ শেষ করতে হবে। কনসালট্যান্ট নিয়োগ হলেও টেন্ডার দিয়ে কাজ শুরু করতে এ বছর শেষ হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার দিলে আমরা কাজ এ বছরই শুরু করতে পারব।

তিনি জানান, জাইকার অর্থায়নে মহাসড়কের পটিয়া, চানখালী, কক্সবাজারের মাতামুহুরী, চন্দনাইশের শক্সখ ও বরুমতী খালের ওপর ৭৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি অত্যাধুনিক পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তাই চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে সুফল পেত মানুষ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, মহাসড়কের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২৫ দশমিক ২৭ কিলোমিটার অংশে চারটি বাইপাস ও একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করার কথা ছিল। পটিয়া, দোহাজারী, চকরিয়া ও আমিরাবাদে একটি করে বাইপাস এবং সাতকানিয়ার কেরানীহাটে একটি ফ্লাইওভার নির্মিত হওয়ার কথা। এগুলো নির্মিত হলে বাঁকের সংখ্যা যেমন কমত, তেমনি কমত যানজট এবং দুর্ঘটনাও। এই পাঁচটি বাইপাসের বাইরে চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাড়কের অবশিষ্ট অংশ ১০৭ কিলোমিটার সড়কও জাইকার অর্থায়নে হওয়ার কথা ছিল। এ ব্যাপারে তাদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। কিন্তু বলার মতো অগ্রগতি নেই। জাইকা প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রামের মইজ্যারটেক থেকে চকরিয়া পর্যন্ত অংশে তা করতে চেয়েছিল।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবদুল্লাহ আল নোমান পারভেজ জানান, কক্সবাজার পর্যটন নগরী হওয়ায় সারা দেশের পর্যটক এ পথ দিয়ে চলাচল করেন। ওয়ান বাই ওয়ান না হলে এ সড়কে দুর্ঘটনা কমবে না। জাইকা এ ব্যাপারে কাজ করছে। আশা করছি শীঘ্রই ছয় লেনে উন্নীত হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাউজানে ভাইদের হাতে প্রকৌশলী খুন
পরবর্তী নিবন্ধএকটি শক্তি ক্ষমতায় থাকতে নতুন পন্থা বের করছে