সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো নয়, বাড়ানোর কথা ভাবুন

| বুধবার , ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করল সরকার। আগের মুনাফার হার বহাল রাখা হয়েছে। গত রোববার নতুন মুনাফার হার বাতিল করে পুরোনো হার বহাল রাখার প্রজ্ঞাপন জারি করার জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে (আইআরডি) অনুরোধ করেছে অর্থ বিভাগ। এখন আইআরডি এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এর ফলে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে হারে মুনাফা পেতেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা, আগামী ছয় মাসও সেই হারেই মুনাফা দেওয়া হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত ২৮ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হয়েছিল। এতে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়ে যান। এমন অবস্থায় আগের হারই বহাল রাখা হলো। কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কম। এ ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ পরিমাণ বা এর কম হলে মুনাফার হার বেশি হবে। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কমে আসবে। আয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সরকার নিয়মিতভাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নির্ধারণ করে থাকে।

দেশে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন যত ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এ সঞ্চয়পত্রে এত দিন সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ; সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেটিও ঠিক আছে। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে, অর্থাৎ মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ; এখনো তা বহাল রাখা হয়েছে। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ বহাল থাকল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প কম। বয়স্ক অনেক মানুষ তাঁদের জীবনযাপনের ব্যয় সঞ্চয়পত্রের আয় থেকে করে থাকেন। অনেক অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক নাগরিক আছেন, যাঁদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সঞ্চয়পত্রের আয় থেকেই চলেন। তাই সঞ্চয়পত্রের আয় বৃদ্ধি পেলে তাঁদের দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ করা সহজ হবে। বলা বাহুল্য, সঞ্চয়পত্র এক প্রকার নিরাপদ বিনিয়োগরূপে বিবেচিত হয় সমাজে। অনেকে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে পেনশনাররূপে তাঁর অর্থ সরকারের নিকট জমা রাখেন। তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফাই ঐ সকল ব্যক্তির আয়ের প্রধান উৎস হয়ে থাকে। অনুরূপ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রও রয়েছে এবং বলা জরুরি যে, এই মুনাফার ওপর সমগ্র পরিবার নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট মুনাফার উপর জীবিকা নির্বাহ এদের কঠিন হলেও অনেকের বিকল্প উপায়ও থাকে না। কিংবা অন্যান্য ব্যবসা বা বিনিয়োগের সামর্থ্যও থাকে না। তারা সরকার নির্দিষ্ট মুনাফা দেখেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন এবং সেই অনুপাতে ব্যয় নির্বাহ করেন। কিন্তু হঠাৎ মুনাফার হার হ্রাস পেলে ব্যয়ের খাতে চাপ পড়া স্বাভাবিক। তাই যেভাবেই হোক, দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য সঞ্চয়পত্রকে লাভজনক রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিভাবে মুনাফার হার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায় তজ্জন্য জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরকে আরও তৎপর হতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ একেবারেই সন্তোষজনক নয়। সাধারণ মানুষ তাঁদের সঞ্চিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সেটা নিয়ে তাঁরা অস্থির। সমস্যার গোড়ায় সমাধান করে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের। দুঃখজনক হলেও সত্যি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মূল মনোযোগ এখানে কেন্দ্রীভূত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে সেটা দেখা যায়নি। সঞ্চয়পত্রের মূল গ্রাহক মূলত দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। তাদের অনেকের সংসার খরচের একটা বড় অংশ আসে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে। বড় কোনো অসুখ কিংবা সংকটের সময় তারা সঞ্চয়পত্র ভেঙে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আমরা মনে করি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির কারণে বিপুলসংখ্যক নাগরিক যখন সংকটে আছে, তখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো দূরের কথা, বাড়ানো উচিত।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে