সংখ্যালঘুদের ঘিরে গত বছরের অধিকাংশ ঘটনা সাধারণ অপরাধের আওতাভুক্ত

পুলিশের পর্যালোচনা | মঙ্গলবার , ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ

দেশে ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের সদস্যদের ঘিরে সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সামপ্রদায়িক নয়, বরং সাধারণ অপরাধের আওতাভুক্ত এমন তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের এক বছরব্যাপী পর্যালোচনায়। পুলিশের সদর দপ্তরের প্রস্তুত করা এই প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলেছে, অপরাধ দমনে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও দৃঢ়তার নীতিতে অটল রয়েছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ এই এক বছরে সারা দেশে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাইকৃত এ তথ্যগুলো এসেছে থানায় দায়ের করা মামলা (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগপত্র এবং চলমান তদন্তের হালনাগাদ নথি থেকে। খবর বাসসের।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টিতে সামপ্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে। বিপরীতে, ৫৭৪টি ঘটনা সামপ্রদায়িক নয় বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। অর্থাৎ, সংখ্যালঘুদের ঘিরে সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং সাধারণ অপরাধের আওতাভুক্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব ঘটনায় সামপ্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই মন্দির ভাঙচুর, ধর্মীয় প্রতিমা অবমাননা বা উপাসনালয়ে হামলার মতো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এর বাইরে অল্পসংখ্যক হত্যাকাণ্ডসহ কয়েকটি অন্যান্য অপরাধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সামপ্রদায়িক নয় এমন ঘটনাগুলোর পেছনে প্রধানত রয়েছে পারিবারিক বা প্রতিবেশী বিরোধ, জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং পূর্বশত্রুতাজনিত সংঘাত। এসব অপরাধের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রেস উইং বলছে, এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সব অপরাধই গুরুতর এবং জবাবদিহি প্রয়োজন। তবে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ দেখায়, সংখ্যালঘুদের ভুক্তভোগী হওয়া অধিকাংশ ঘটনাই সামপ্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং সমাজে বিদ্যমান সাধারণ অপরাধপ্রবণতা থেকেই ঘটে।

প্রতিবেদনে পুলিশের তৎপরতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। শত শত ঘটনায় মামলা হয়েছে, অনেক ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর কিছু ঘটনায় তদন্ত এখনো চলমান। বিশেষ করে ধর্মীয় উপাসনালয় বা সংবেদনশীল বিষয় জড়িত থাকলে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর দেশে সহিংস অপরাধে গড়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এই সংখ্যা কোনোভাবেই গর্ব করার মতো নয়। প্রতিটি মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি। তবে একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, সহিংস অপরাধ সব সমপ্রদায়কেই প্রভাবিত করে ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী বা ভৌগোলিক সীমা নির্বিশেষে।

প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান সূচকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। উন্নত পুলিশিং, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়, দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর ফলে অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ। সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করেন। প্রতিটি সমপ্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, নৈতিক দায়িত্বও।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আরো জানায়, এই প্রতিবেদন কোনো সমস্যাকে অস্বীকার করে না, আবার নিখুঁত পরিস্থিতির দাবিও করে না। বরং সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে ঘিরে অপরাধপ্রবণতার একটি তথ্যভিত্তিক ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরাই ছিল এর উদ্দেশ্য। প্রেস উইংয়ের মতে, গঠনমূলক সমালোচনা, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগুলেই অগ্রগতি সম্ভব। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্ধারিত হয় না। বরং এসব ঘটনা মোকাবিলায় সামষ্টিক প্রচেষ্টাই মূল বিবেচ্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকবিতার পরিমাপ তার রহস্যে, তার লাবণ্যে এবং তার জাদুতে
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে নূরানী বোর্ডের পুরস্কার বিতরণী