ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় ‘অতিরিক্ত অর্থের যোগান’ পেতে আইএমফের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, কোন শর্তে কত টাকা পাওয়া যাবে, তার বিস্তারিত আলোচনা হবে আগামী এপ্রিলে আইএমফের বসন্তকালীন বৈঠকে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। তার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত অর্থের যোগান কীভাবে আসবে। উত্তরে আমির খসরু বলেন, সেগুলো আলোচনায় হয়েছে, আলোচনার মধ্যে আছে। আমরা স্প্রিং মিটিংয়ে ওয়াশিংটনে যাচ্ছি, সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হবে। খবর বিডিনিউজের।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের সঙ্গে ঋণ চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই প্রোগ্রাম তো বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। এটা আবার ফারদার রিভিউতে যাবে, সেটা অসুবিধা নাই।
ইন দ্য মিনটাইম অর্থনীতির যে অবস্থা, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রোগ্রামগুলো আছে এই সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে, সেগুলো আমরা আলাপ করেছি। তিনি বলেন, এরকম একটা অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে গেলে আমাদের অনেকগুলো রিফর্ম দরকার, অনেক ডিরেগুলেশন দরকার। ব্যাংকিং সেক্টর তো অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছে, শেয়ার বাজার খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। তারপর ট্যাক্স জিডিপি অবস্থা খুবই কঠিন। তো এগুলো থেকে উত্তরণ করতে হলে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা যে কথাগুলো বলেছি, আমরা বলেছি এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটা সম্ভব। এবং এগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপগুলো আমরা একটার পর একটা নিয়ে যাচ্ছি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যে ‘অর্থনৈতিক সংকটে’ থমকে গেছে, সে কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিগত ইন্টেরিম গভার্নমেন্টের সময়ও অনেক কিছু থমকে গেছে, এগুলোকে আবার রিভাইভ করতে হবে। তো এগুলো রিভাইভ করতে গেলে আমাদের সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। বিএনপি সরকার সেজন্য ‘ডিরেগুলেশন’, সংস্কার, ব্যবসা সহজ করা, এবং ব্যবসা করার খরচ কমিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছে বলে মন্ত্রীর ভাষ্য।
আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফা আলোচনা শেষে পরের বছরের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। সবশেষ গত জুনে অর্থ ছাড়ের সময়ে ঋণের আকার বাড়িয়ে করা হয় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। সে বছর ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। একই বছরের ডিসেম্বরে পাওয়া যায় দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার আসে ২০২৪ সালের জুনে। আর চলতি বছরের জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে মিলিয়ে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার হাতে পায় বাংলাদেশ। ষষ্ঠ কিস্তির জন্য শর্ত প্রতিপালনের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও বৈঠকের পর আইএমএফ নির্বাচিত সরকার আসার আগে আর অর্থ ছাড় না করার সিদ্ধান্ত জানায়।
এখন এ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে কী কথা হল জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ওটা আলাপ–আলোচনা চলছে। আইএমএফের যে রিকয়ারমেন্ট, এগুলো আমরা আলোচনা করেছি কতটুকু সম্ভব– বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেগুলো সম্ভব না, এগুলো ক্রমান্বয়ে করতে হবে। একসাথে সব করা যাবে না। কারণ অর্থনীতি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে উত্তরণ করতে হলে আমাদেরকে আমাদের মত করে কিছু চিন্তা করতে হবে। এক্ষেত্রে শর্তের ব্যাপারে কোনো ছাড় চাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ওটা তো জুলাইতে আলাপ হবে। এটা তো নেঙট যখন রিভিউ–জুলাইতে হবে। এর মধ্যে আমরা বাজেটের প্রস্তুতি নেব। এ কর্মসূচির বাইরে অন্য কোনো অর্থ এখনই চাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পর্যন্ত এগুলো আলোচনা হয় নাই। ওয়াশিংটনে এপ্রিলে মিটিং আছে, সেখানে আলোচনা হবে বিস্তারিত। সরকার ‘অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক’ করায় রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেল, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধসহ কোথাও ‘সংকট দেখা যায়নি’ বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠক শেষে বাংলাদেশে অর্থায়ন করা নিয়ে এক প্রশ্নে আইএমএফের কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, অর্থায়ন সংক্রান্ত যে কোনো আলোচনা নীতিগত আলোচনার ওপর ভিত্তি করে হয়, আর আজ সকালে আমরা মাননীয় মন্ত্রীর সাথে সেই আলোচনাই করেছি। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, সব দেশই এখন খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ প্রতিটি দেশের জন্যই এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন। এক্ষেত্রে আইএমএফ কীভাবে সহায়তা করবে এমন প্রশ্নে তার ভাষ্য, এই বিষয়গুলো নিয়েই আমরা মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করছি এবং আমরা এ নিয়ে আরও কাজ করব।










