শোকসভায় হট্টগোল-বাকবিতণ্ডা, রাতে প্রকল্প পরিচালক সাময়িক বরখাস্তের খবর

রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-পিডির বিরোধ

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | শুক্রবার , ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৪:৪৬ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল গফুরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে রাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ জুনাইদ কবিরের সই করা এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আদেশে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধ, বিশ্ববিদ্যালয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা তৈরি, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের সভায় অভিযোগ বিশদভাবে আলোচনা করে সভায় উপস্থিত সদস্যদের সম্মতিক্রমে আবদুল গফুরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

এতে আরও জানানো হয়, সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালীন আবদুল গফুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান ও অনুপ্রবেশ করতে পারবেন না। তবে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন। এ আদেশ জারির তারিখ হতে কার্যকর হবে। এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে আব্দুল গফুরের ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সেটি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এর আগে, বুধবার সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর স্মরণে শোকসভা দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন১ এর সভাকক্ষে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জুনাইদ কবিরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান।

ওদিন শোকসভার শেষদিকে প্রধান অতিথির বক্তব্যকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুরের সঙ্গে জনৈক এক সাংবাদিকের কথোপকথনের একটি রেকর্ড সাউন্ড স্পিকারে উপস্থিত সকলকে শোনান। এসময় সভাস্থলে প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুর উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে আবদুল গফুর উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তখন ভিসি এবং প্রকল্প পরিচালকের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়, তখন সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তারা তাদের দুজনকে নিবৃত্ত করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এ ঘটনার ভিডিও ক্লিপ ও রেকর্ড এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীশিক্ষক, কর্মকর্তা জানান, শোকসভার শেষ দিকে ভিসি বক্তব্য দেওয়ার সময় ৫টি অডিও ক্লিপ তাদের হাতে এসেছে জানিয়ে বলেন, যার সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থবিরুদ্ধ। পরে ভিসি একটি ক্লিপ সভাকক্ষের সাউন্ড স্পিকারে উপস্থিত সকলকে শোনান। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুর দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে যান এবং ভিসি জামায়াতশিবিরের লোকদের দেখে দেখে চাকরি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন এবং অসৎ লোক বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ রিজেন্ট বোর্ড সদস্যদের নিয়ে রিজেন্ট বোর্ড সভা করেন ভিসি। সে সভায় আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধ, বিশ্ববিদ্যালয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা তৈরি, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টাসহ নানান অভিযোগে প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় রিজেন্ট বোর্ড। শোকসভায় হট্টগোলের পর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকল্প পরিচালককে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি প্রকাশ করে।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সদ্য সাময়িক বরখাস্ত ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরও ভিসির বিরুদ্ধে ‘অবৈধ ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে এবং বেআইনিভাবে সাময়িক বহিষ্কার আদেশ’ প্রদানের অভিযোগ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগপত্রের শুরুর দিকেই তিনি বর্তমান ভিসি ড. আতিয়ার রহমানকে ‘জামায়াত ঘরানার লোক’ দাবি করেন এবং নিজেকে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন বলে উল্লেখ করেন।

পত্রে আবদুল গফুর ভিসির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও হিংসায় বশীভূত হয়ে সাময়িক বহিষ্কার আদেশ প্রদান করেন বলে অভিযোগ তোলেন। অভিযোগপত্রে তিনি লেখেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে উপেক্ষা করে জামায়াত এবং শিবির পদধারী ২২ জন শিক্ষকের মধ্যে ২১ জনকে নিজের মতাদর্শের লোক নিয়োগ করেন ভিসি। অপরদিকে আটজন কর্মকর্তা নিয়োগ করলেও একজনও পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী নন এবং সবাই নিজের মতাদর্শের (জামায়াত) লোক।

তবে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান বলেন, ‘আবদুল গফুর দুটো থার্ড ডিভিশন পেয়েছেন, তার বাড়ি খাগড়াছড়ি বলেই কি দুটো থার্ড ডিভিশন পাওয়া লোক চাকরি পাবে? যারা চাকরি পেয়েছে তাদের দল কি এটা দেখার বিষয় আমাদের না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য পাহাড়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোটা আছে ২৪ পার্সেন্ট, তার ব্যত্যয় হয়নি। শিক্ষক নিয়োগে এ অঞ্চলের কোনো কোটা নেই, শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে মেধার ভিত্তিতে। গফুর একজন আদ্যোপান্ত ‘করাপ্টেড’ লোক, একটা মানুষের জীবনে এত করাপশন থাকতে পারে এটা আমার ধারণা নেই, এটা সবাই জানে। ওর চুলের আগা থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত শুধু করাপশন আর করাপশন। সে করাপশন ছাড়া কোনো চিন্তাই করতে পারে না। এভাবে একটা লোক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি পায় কিভাবে, ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক হয় কিভাবে। আগে দাবি করতো সে আওয়ামী লীগের লোক। রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্তে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গফুরের মতো করাপ্টেড লোক কোনো কিছুর বিনিময়ে পার পাবে না।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধভেন্যু বদলের অনুরোধ, আবারো আইসিসিকে চিঠি বিসিবির
পরবর্তী নিবন্ধচকরিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান চুট্টু গ্রেপ্তার