শেষ জামানার ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক | শুক্রবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কালামে পাকের সূরা আম্বিয়ার১ নং আয়াতে বলেছেন,‘ মানুষের জন্য তাদের হিসাব নিকাশের মুহূর্তটা একান্ত কাছে এসে গেছে, অথচ তারা এখনো উদাসীনতার মাঝে বিমুখ হয়ে আছে’এই আয়াতের মাধ্যমে মহাশক্তিমান আল্লাহতায়ালা মানুষকে সতর্ক করছেন এভাবে, কেয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে অথচ মানুষ তা থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন রয়েছে। তারা এর জন্য এমন কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করছে না, যা সেদিন তাদের উপকারে আসবে। বরং তারা সম্পূর্ণরূপে দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় তারা এমনভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছে যে, ভুলেও একবার কেয়ামতের কথা স্মরণ করে না। আল্লাহতায়ালা সূরা ক্বামারের ১ নং আয়াতে বলেন, ‘কেয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়ে গেছে’। তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা হচ্ছে এক চিরাচরিত জাদুগরি ব্যাপার। আল্লাহতায়ালা কুরাইশ এবং কাফিরদের সম্পর্কে বলেন, ‘যখনই তাদের নিকট তাদের রবের কোন নতুন উপদেশ আসে তখনই তারা তা শ্রবণ করে কৌতুকচ্ছলে। তারা আল্লাহর কালাম ও তাঁর ওহীর দিকে কানই দেয় না। তারা এক কানে শুনে এবং অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়। তাদের অন্তর হাসি তামাশায় লিপ্ত থাকে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আহলে কিতাবদেরকে কিতাবের কথা জিজ্ঞাসা করা তোমাদের কি প্রয়োজন? তারা তো আল্লাহর কিতাবের বহু কিছু রদবদল করে ফেলেছে, পরিবর্তন আর পরিবর্ধন করেছে। তোমাদের কাছে নতুনভাবে নাজিলকৃত আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে। এতে কোন প্রকার পরিবর্তন ঘটেনি (ফাতহুল বারী১৩/৫০৫)। সীমালঙ্ঘনকারীরা গোপনে পরামর্শ করে। তারা একে অপরকে গোপনে বলে, আমাদের মত একজন মানুষের অধীনতা স্বীকার করতে পারি না। তোমরা কেমন লোক যে, দেখে শুনে জাদুকে মেনে নিচ্ছ? এটা অসম্ভব যে, আল্লাহতায়ালা আমাদের মত একজন মানুষকে রিসালাত ও ওহী দ্বারা বিশিষ্ট করবেন সুতরাং এত বিস্ময়কর ব্যাপার যে, লোকেরা জেনে বুঝে তার জাদুর খপ্পরে পড়ে যাচ্ছে। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূল (সাঃ) কে বলেন, ‘তুমি বল, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছুর ব্যাপারে আমার রব অবগত আছেন। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তিনি এই পবিত্র কালাম কুরআনুল করিম অবতীর্ণ করেছেন। এতে পূর্বের ও পরের সমস্ত খবর বিদ্যমান রয়েছে। যার এইসব বিষয় জানা নেই সে কিভাবে নিজে এটা রচনা করবে’? এটা একথাই প্রমাণ করে যে, এটির অবতীর্ণকারী হল আ’লিমুল গায়েব। তিনি তোমাদের সব কথা শুনেন এবং তিনি তোমাদের সমস্ত অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত সুতরাং তোমাদের উচিত তাঁকে ভয় করা। বর্তমান পৃথিবীতে ফেতনা ফাসাদের দ্রুত প্রসার ঘটছে। খুন, রাহাজানি, হত্যা, ধর্ষন, ইভটিজিং, অনাচার, অবিচার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, পরকীয়া, মাদকের বিস্তার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তরুণ সমাজ এতে আসক্ত হয়ে তাদের মাঝে নৈতিক স্খলন পরিলক্ষিত হচ্ছে । যুব সমাজ মাদক গ্রহণ ও মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়ে নিজের জীবনটাকেই বিপন্ন করে তুলছে। উঠতি কিশোর কিশোরীরা মোবাইল আসক্তির কারণে তাদের নৈতিক চরিত্রের চরম অধঃপতন ঘটছে। আকাশ সংস্কৃতির কারণে বিজাতীয় সভ্যতা যেভাবে এদেশকে গ্রাস করেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ ও হতাশাজনক। মহান আল্লাহতায়ালা ১৪০০ বছর আগে সূরা আম্বিয়া এবং সূরা ক্বামারের মাধ্যমে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন তা যেন দিবালোকের মত এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং কোরআনের প্রতিটি অক্ষর সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। শেষ জামানার যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যেতে পারে তার অধিকাংশ এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা অধিক হারে বাড়তে থাকবে, মানুষেরা বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামবে। প্রতিটি ঘরে ঘরে আকাশ সংস্কৃতির উদ্ভব হবেসন্তানেরা এর প্রভাবে বিপদগামী হতে বাধ্য, পরকীয়ার হার আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাবে, স্বামী স্ত্রীকে বিশ্বাস করবে না ও স্ত্রী স্বামীকে বিশ্বাস করবে না, দ্বীনি ইল্‌ম উধাও হয়ে যাবে , মূর্খ লোকেরা শাসক হবে আর জ্ঞানী লোকেরা তাদের অধীনে থাকবে, হত্যাকারী জানবে না সে কেন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং হত্যার শিকার মানুষটিও জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। ফেতনার এই যুগে ভয়াবহ আকারে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়েছে। এই অশ্লীলতা প্রতিটি ঘরে ঘরে, সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে গ্রাস করেছে যে, এর থেকে মুক্তির কোন উপায় আছে কিনা তা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। শিশুকাল থেকেই নৈতিক চরিত্রের অধিকারী না হলে ধীরে ধীরে সেই সন্তান অসৎ পথে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ জামানায় সুদ এবং ঘুষের হার আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাবে। আমরা সবাই কম বেশি সুদের চক্রে জড়িয়ে পড়েছি। ইসলামি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলো যে সুদবিহীন অর্থনীতি কায়েম করেছেএতেও কিছুটা সন্দেহের অবকাশ রয়েছে, যদিও তা বিজ্ঞ আলেমদের দ্বারা পরিচালিত বোর্ড তদারকি করে। অথচ সুদের সর্বনিম্ন শাস্তি হচ্ছে মায়ের সাথে যেনা করা আর সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা, ‘হে ঈমানদার লোকেরা তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আগের সুদি যেসব বকেয়া আছে তোমরা তা ছেড়ে দাও, যদি সত্যি তোমরা ঈমানদার হও। আর যদি তোমরা এমটি না কর তাহলে আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ থেকে (তোমাদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধের (ঘোষনা থাকবে)’। সুদের ব্যাপারে যে ভয়ানক সত্য কথাটি এসেছে তা হল: যে সুদ দেবে , যে সুদ গ্রহণ করবে এবং যে সাক্ষী থাকবে তারা সবাই অপরাধী। তারা কেউ সুদের ভয়াবহ আযাব থেকে রক্ষা পাবে না। বর্তমানে সুদ ও ঘুষের বিসৃ্ততি সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছে। এই গন্ডি থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। শেষ জামানার অন্যতম ভয়াবহ ফেতনা হচ্ছে মোবাইল। এই মোবইল যুব সমাজকে দ্রুত অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই মোবাইল বিশ্বের সমস্ত খবরাখবরঘটনাপ্রবাহ নিমিষেই পাওয়া যায়। চরিত্র হনন করার সমস্ত উপাদানই রয়েছে এই মোবাইলে। উঠতি ছাত্রযুব সমাজ, স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে মোবাইল আসক্তি ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে। যা একদিকে তাদের নৈতিক চরিত্রের চরম অবনতি ঘটছে, অন্য দিকে শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেষ জামানার এই ফেতনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে আল্লাহর কোরআন ও রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং তদঅনুযায়ী নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা। কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক পরিবার ও সমাজ গঠন শেষ জামানার ফেতনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় বলে আমি মনে করি।

লেখক: সভাপতিরাউজান ক্লাব, সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি),

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল

পূর্ববর্তী নিবন্ধকিডনি ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে জানা জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধগাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মওলানা শাহ্‌ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.)