প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে দুটি বৃহৎ বইমেলা হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামে; যা ‘অমর একুশে বইমেলা’ নামে পরিচিত। বছর ঘুরে আসা এ বইমেলার জন্য অপেক্ষায় থাকেন পাঠক, লেখক ও প্রকাশক। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের কিছুটা দেরিতে ঢাকায় বইমেলা শুরু হয় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি। গত বছর (২০২৫) ঢাকার সাথে মিল রেখে চট্টগ্রামেও একইদিনে শুরু হয় বইমেলা। কিন্তু এ বছর চট্টগ্রামে ফেব্রুয়ারিতে হয়নি। আদৌ হবে কিনা সেটা অনিশ্চিত ছিল।
অবশেষে পাঠকের চাহিদা ও প্রকাশকের আগ্রহে সাড়া দিয়ে বইমেলা আয়োজন করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। গতকাল মঙ্গলবার নগরের কাজীর দেউড়ির চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে পর্দা উঠেছে বইমেলার। স্বাধীনতার মাসে শুরু হওয়া এবারের মেলাকে বলা হচ্ছে ‘স্বাধীনতা বইমেলা’।
প্রধান অতিথি হিসেবে বইমেলা উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, সিএমপির উপ–কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) নুসরাত সুলতানা, চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা একরামুল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক শাহাবুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ও চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি শাহাবুদ্দিন হাসান বাবু।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, একটি নৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, মূল্যবোধ তৈরি করে এবং প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। বইমেলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না, বরং বই মানুষের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি সংস্কৃতি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি জানান, চসিক পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ই–লাইব্রেরির ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা নৈতিক দায়িত্ব। পাহাড়তলী বধ্যভূমিসহ নগরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি পাহাড়তলী বধ্যভূমিসহ নগরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রকৃত শহীদদের তালিকা প্রণয়নে সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আমরা চাই চট্টগ্রামের প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষিত হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম সত্য ইতিহাস জানতে পারে।
নগর সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে শাহাদাত বলেন, দেশে এখনো সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিষয় সংরক্ষণে স্থানীয় সরকার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করা হচ্ছে, যা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, জ্ঞান অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞান অর্জনের জন্য বই পড়তে হবে। তিনি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, মাদক থেকে মুক্ত থাকার জন্য, অপসংস্কৃতি ও কিশোর গ্যাং থেকে দূরে থাকার জন্য বই পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে।
পাঠান মো. সাইদুজ্জামান বলেন, সবচেয়ে কাছের বন্ধু হচ্ছে বই। জীবনে অনেক বন্ধু থাকবে, আবার দেখা যায় সময়ের বিবর্তনে অনেক বন্ধু চলে যায়। কিন্তু বই থেকে পড়া জ্ঞান সারা জীবন থেকে যাবে।
মুক্তিযোদ্ধ শাহাবুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রত্যেক ওয়ার্ডে অফিসে ছোট করে লাইব্রেরি করার জন্য মেয়রের কাছে প্রস্তাব করেন।
মাহফুজুর রহমান বলেন, বাস্তবতা হলো, সরকারি দল ইতিহাসকে সবসময় তার পক্ষে নিতে চায়। ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। আমরা তার ঊর্ধ্বে নই। রাজনীতিবিদরা মানুষের জন্য রাজনীতি করবে। বর্তমান সময়ের কী সমস্যা, সেটার স্থায়ী সমাধান কীভাবে করা যায় এটা নিয়ে। ইতিহাসকে ইতিহাসবিদদের উপর ছেড়ে দিতে হবে। তা না করে ৫৪ বছর পর্যন্ত এখনো ইতিহাসে কে ঘোষক আর কে ঘোষক না, এগুলো নিয়ে টানাটানি করছেন। এটা করে নিজেদের অবস্থানকে খাটো করছেন।
তিনি বলেন, ইতিহাস জানতে হলে বই পড়ার দরকার নেই। আপনার দাদা–দাদি, নানা–নানি অথবা যার বয়স ৭০ বছর বা ৬৬–৬৭ বছর তাকে জিজ্ঞেস করবেন, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে উনি কী করেছিলেন? আপনি ওখানেই সঠিক ইতিহাসটি পাবেন। ওই লোক বলে দেবে একাত্তর সালে পাঞ্জাবিরা কী করেছিল এবং ওই লোক কী করেছিলেন। এমন কোনো ব্যক্তি পাবেন না, যে ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছেন। একমাত্র নামকরা আলবদর রাজাকার ছাড়া। এটা একটা জনযুদ্ধ ছিল। জনযুদ্ধের ইতিহাস লেখাটা অত্যন্ত কঠিন। আমরা চেষ্টা করছি একেবারেই ব্যক্তি উদ্যোগে বা সামষ্টিক উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে টেনে নিয়ে আসতে।
মাহফুজুর রহমান বলেন, আরে! ইতিহাস তো লেখা শুরুই হয় নাই এখনো। ১০০ বছর পর যে প্রজন্ম আসবে তারা আমাদের দলিলগুলো সামনে রাখবে। সামনে রেখে তারা সঠিক ইতিহাসটি রচনা করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি শাহাবুদ্দিন হাসান বাবু বলেন, দেশ সেরা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো মেলায় অংশ নিয়েছে। কয়েক হাজার বই প্রকাশ হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯ দিনব্যাপী এবারের বইমেলা চলবে আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত। এবারের বইমেলায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার ৯৬টি প্রকাশনা সংস্থার ১৩১টি স্টল রয়েছে। মেলার আয়তন ৪০ হাজার বর্গফুট। মেলা প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা ও ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ বইমেলার আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। তবে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, নাগরিক সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং শিল্প–সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা সম্মিলিতভাবে মেলা বাস্তবায়ন করছেন।













