শীতকালীন সবজি উৎপাদনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষকরা। কিন্তু সবজি উৎপাদনের ভরা মৌসুমে রাঙ্গুনিয়ায় টিএসপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলার কোথাও এমনকি আশেপাশের উপজেলা ঘুরেও এই সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের। ডিলাররা বলছেন, গত নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) গোডাউনে ধরনা দিয়েও টিএসপি সার পাননি তারা। তবে অন্যান্য সার স্বাভাবিক নিয়মে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তারা।
জানা যায়, রবিশস্য যেমন সরিষা, গম, শীতকালীন সবজি, আলু ইত্যাদি আবাদে সারের প্রয়োজন হচ্ছে কৃষকদের। এসময় অন্যান্য সারের পাশাপাশি টিএসপি সার ব্যবহার করা হয়। টিএসপি সার ব্যবহারে গাছের মূল বা শিকড় গঠন ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। গাছের কাঠামো শক্ত করে গাছকে নেতিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে থাকে। ফলের পরিপক্বতা ত্বরান্বিত করে থাকে। ফুল, ফল ও বীজের গুণগত মান বাড়াতে সহায়তা করে থাকে। কিন্তু টিএসপি সারের সংকটে হতাশায় দিন কাটছে কৃষকদের।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সার ডিলারদের ইউরিয়া (সাদা পাস), এমওপি (লাল সার), ডিএপি (ডেব সার) এবং ট্রিপল সুপার ফসপেট (টিএসপি) সার বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। বিএডিসি তা মাসের ১৫–৩০ তারিখের মধ্যে সরবরাহ করে থাকেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে বিএডিসি অথবা সংশ্লিষ্ট ডিলার বাড়তি একমাস সময় পায় সার উত্তোলনের। গত নভেম্বর মাস থেকে এই নিয়মে এই চার প্রকার সারের বরাদ্দ দিয়েছিলো কৃষি অফিস। এরমধ্যে ১৬ জন ডিলারের মাধ্যমে গত নভেম্বরে মাসে ১৯৫ মেট্রিক টন এবং ডিসেম্বরে ২৫০ মেট্রিক টন টিএসপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু অন্যান্য সার বরাদ্দ অনুযায়ী পাওয়া গেলেও বর্তমান সবজি আবাদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিএসপি সার নভেম্বর মাসের বরাদ্দই পাওয়া যায়নি। এতে বাজারজুড়ে টিএসপি সার একেবারে উধাও হয়ে গেছে। তবে বিকল্প হিসেবে ডিএপি সার ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে ডিলাররা বলেন, টিএসপি সার একদমই নেই। বিএডিসির গোডাউনে গেল দুই মাস ধরে ধরনা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। এরইমধ্যে গোডাউনে মজুদ সব সার বিক্রি হয়ে যাওয়ায় গত ১০–১৫ দিন ধরে একদমই টিএসপি সার নেই। এদিকে কৃষক ও খুচরা ডিলাররা টিএসপি সারের জন্য প্রতিদিন দোকানে ভিড় করছেন বলে জানান তারা। সার সংকট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, নভেম্বরের বরাদ্দকৃত টিএসপি সার বিএডিসি এখনো ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ করতে পারেনি। তাই সাময়িক সংকট কাটাতে টিএসপির পরিবর্তে ডিএপি সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। টিএসপি সারের মূল উপাদান ফসফরাস। আর ডিএপি সারের মূল উপাদান ফসফরাস+ নাইট্রোজেন মানে ইউরিয়া। অর্থাৎ ১ কেজি ডিএপি সার ব্যবহার করলে ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া সার কম লাগে। তাই একজন কৃষকের যদি এক বস্তা টিএসপি সার দরকার হয়, তাহলে সেই কৃষক টিএসপির পরিবর্তে ১ বস্তা ডিএপি সার ব্যবহার করতে পারে + ২০ কেজি ইউরিয়া সার কম ব্যবহার করলেও ফলনের কোন কমতি হবে না।
তবে এই ব্যাপারে কৃষকদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, এমনিতেই খুচরা দোকান থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। টিএসপির সরকার নির্ধারিত দাম ২৭ টাকা হলেও কিনতে হয় ৪০টাকায়। একইভাবে ডিএপি– ২১ টাকা হলেও কিনতে হয় ২৩–২৫ টাকায়। তার উপর গত এক মাস ধরে টিএসপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। এই সারের অভাব অন্য সার দিয়ে মিটছে না বলে দাবী তাদের।
পোমরা মাইজপাড়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ হারুন জানান, তিনি মরিচ ও আলু চাষাবাদ করেছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে টিএসপি সার খুঁজেও পাচ্ছেন না। কৃষি অফিসার অন্য সার ব্যবহার করতে বললেও টিএসপি ব্যবহারে অন্যান্য সারের তুলনায় ফলনও হয় বেশি। হাজীপাড়া গ্রামের এএমবি এগ্রো‘র পরিচালক মো. বাবর জানান, তিনি সমন্বিত সবজি আবাদ করেছেন। বেশ কিছুদিন ধরে টিএসপি সার খুঁজেও পাচ্ছেন না, এমনকি পাশের উপজেলাতেও খোঁজ নিয়েও পাননি তিনি। এই সারের বিকল্প ডেব ব্যবহার করলেও তা উৎপাদন চাহিদা মত হবে না বলে মনে করেন এই কৃষি উদ্যোক্তা। সারের সংকট কবে নাগাদ কাটতে পারে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশ থেকে সার নিয়ে জাহাজ আসছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একই কথা জানিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস আরও বলেন, টিএসপি সারের জাহাজ বন্দরে আসছে। সার খালাস হলেই উপজেলাগুলোতে পৌঁছে যাবে। আশাকরি আগামী সপ্তাহে টিএসপি সংকট কাটানো যাবে।