শিশুহত্যার মতো নৃশংস ঘটনা রোধে জনমত তৈরি করতে হবে

| রবিবার , ১২ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

গত ১০ এপ্রিল দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত একটি সংবাদ আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। সংবাদটি হলো ‘স্ত্রীর সাথে ঝগড়া, শিশুপুত্রকে দেয়ালে ছুঁড়ে মেরে হত্যা!’ সংবাদ বিবরণীতে বলা হয়, স্বামীস্ত্রীর পারিবারিক কলহের জেরে দুই বছর বয়সী আশরাফ বিন সামির নামে শিশু সন্তানকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘরের দেয়ালে ছুঁড়ে মেরে হত্যার অভিযোগ ওঠেছে তার বাবার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বাবা ও দাদীকে গ্রেপ্তার করেছে বাকলিয়া পুলিশ। এমন পাশবিক ঘটনা ঘটেছে গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত ৮টায় নগরের দক্ষিণ বাকলিয়ার বৌ বাজার এলাকায়। পরদিন বুধবার দিবাগত রাতে নগরের বৌ বাজার এলাকার একটি বাসা থেকে পাষণ্ড পিতা ও দাদীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, শিশুটির বাবা মো. সজীব (২২) ও শিশুর দাদী নূর নাহার বেগম (৪০)। বিষয়টি নিশ্চিত করে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, গত ৭ এপ্রিল রাত ৮টায় নগরের দক্ষিণ বাকলিয়ার বৌ বাজার এলাকায় ভুক্তভোগী শিশুর মা শারমিন আক্তার কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরলে স্বামী মো. সজীব, শাশুড়ি নূর নাহার বেগম ও শ্বশুর মো. হানিফের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্বামী সজীবস্ত্রী শারমিনকে মারধর শুরু করেন। এ সময় তাদের দুই বছরের শিশু সন্তান আশরাফ বিন সামির মায়ের কাছে গেলে সজীব তাকে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘরের দেয়ালে ছুঁড়ে মারলে সে গুরুতর আহত হয়। পরে তার খিঁচুনি শুরু হয়। মা শারমিন সন্তানকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললে অভিযুক্তরা তাকে আরও মারধর করেন। শিশুটির মৃত্যুকে অসুস্থতাজনিত বলে প্রচার করে গভীর রাতে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। পরদিন জ্ঞান ফেরার পর শারমিন আক্তার স্বামী, শাশুড়ি ও শ্বশুরকে দায়ী করে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন। বুধবার দিবাগত রাতে নগরের বৌ বাজার এলাকার একটি বাসা থেকে সজীব ও নূর নাহার বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১৪/১৫ জন খুন হচ্ছেন। তবে এসব খুনের বেশিরভাগ ঘটছে পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে। বাবা অথবা মা নিজের শিশু সন্তানকে গলাটিপে হত্যা করছেন। বাবা অথবা মাও খুন হচ্ছেন সন্তানের হাতে। রাস্তা বা ডোবা থেকে উদ্ধার হচ্ছে তরুণীর খণ্ডিত লাশ। এতে উদ্বেগউৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে সচেতন নাগরিক এমনকি জনসাধারণের মাঝে। এভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

কেন এই নির্মমতা? এর উত্তরে অপরাধ বিশেষজ্ঞ, নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন বিশিষ্টজনরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা ও প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ঘটছে এ ধরনের ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা রোধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যেমন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, তেমনি পারিবারিক সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক অনুশাসনের প্রতি জোর দেয়ারও তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এসব খুনের বেশির ভাগই ঘটেছে সামাজিক ও পারিবারিক কারণে। সাধারণত পারিবারিক কলহ, অর্থ লেনদেন, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হাতে এরা খুন হয়েছেন। আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড।

পরিবার হলো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখন পরিবারের মধ্যেও নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে পড়েছে। সামাজিক অবস্থার অপপ্রভাবে পরিবারের সদস্যদের একের প্রতি অপরের মমত্ববোধ হ্রাস পাওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে আপনজনের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সামাজিক অবস্থা কতটা ভেঙে পড়লে নিজের আদরের সন্তানকে জন্মদাতা পিতা হত্যা করতে পারে। ভাবতে গেলেই শিউরে উঠতে হয়।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক কারণে আমাদের দেশে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা নতুন কিছু নয়। বর্তমানে গণমাধ্যমের কল্যাণে তা সবাই হয়তো প্রত্যক্ষ করতে পারছে। শিশুহত্যার মতো যে ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা সামাজিক কারণেই ঘটছে। যার বেশির ভাগ শিকার নিম্ন বা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারের শিশু। তাঁরা বলেন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থার যে কাঠামো তাতে দেখা যায় যে, অপরাধীরা সাধারণত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে থাকে। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধের ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। এছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই অপরাধ কমানোর জন্য সামাজিক অনুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের উদ্যোগ খুব একটা নেই। শিক্ষার অভাবও এর জন্য দায়ী। তবে তাঁরা আশাবাদী যে এ বিষয়ে জনমত তৈরি হবে। শিশুহত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও কমে আসবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে