মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণির মধ্যে পার্থক্য হলো, মানুষের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিবেকবোধ আর গভীর অনুভূতি প্রকাশের ভাষা আছে। আরো আছে ভাল মন্দের পার্থক্য তথা বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা। যেটা সৃষ্টির অন্য প্রাণির মধ্যে নেই। মানব জীবনের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক হলো এই নৈতিকতা। চারিত্রিক গুণাবলি আর নৈতিকতা হলো জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সভ্যতার মূল চাবিকাঠি। কারণ যে জাতি যত বেশি সভ্য, সে জাতি তত বেশি উন্নত। জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি রক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিকতা একটি অপরিহার্য উপাদান। কোনো জাতি যখন অনৈতিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে,তখন তাদের বেঁচে থাকার শাণিত শক্তি হারিয়ে যায়, ফলে তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়। একটি সুন্দর সমাজ ও সুশৃঙ্খল জাতি গঠনের জন্য যে শিক্ষার প্রয়োজন তা হলো নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষা আমাদের সততা, উদারতা, শিষ্টাচার, শালীনতা, অহিংসা, মমতা, শ্রদ্ধাবোধ, সংযম, দেশপ্রেম, আর সৌজন্যমূলক ভালো আচরণ শিক্ষা দেয়। আর যে মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মানবিকতার গুণাবলি বিকশিত হয়না, সে মানুষ পাশবিকতা, লোভ লালসা, হিংসা বিদ্বেষ চরিতার্থ করা এক অমানবিক মানুষ তথা পশুতে পরিনত হয়। আবার মানুষের সম্মান ও মর্যাদা নৈতিকতা অর্জনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অনৈতিক কাজকর্ম মানুষকে মনুষ্যত্বের স্তর থেকে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে দেয়। তাই জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে, মানুষের বিবেক বুদ্ধি জাগ্রত করতে এবং সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধনের জন্য নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। বর্তমান সমাজে জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় আমরা যতটুকু এগিয়ে যাচ্ছি, দুঃখজনক হলেও সত্য যে সততা, ন্যায়নীতি আর নৈতিকতার উন্নয়নে আমরা ততোদূর পিছিয়ে যাচ্ছি। বরং দিন, দিন চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। মানুষের মানবিকতা আর ন্যায়নীতি ক্রমেই লোপ পেতে চলেছে। শিল্প বিপ্লবের ফলে যে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ। মানুষ জাগতিক ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য ন্যায় অন্যায়ের ভ্রুক্ষেপ করছে না। শুরু হয়েছে নিজের চাওয়া পূরণ করার অসুস্থ প্রতিযোগীতা। সভ্যতার ইতিহাসকে পদদলিত করে মানুষ যেন ক্রমেই ধ্বংস আর বিনাশের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো নৈতিকতার অবক্ষয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো নৈতিক চরিত্রে চরিত্রবান একটি জাতি গঠন করা। তাই বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের দেশপ্রেমিক, নৈতিক চরিত্রে চরিত্রবান, যোগ্য আর সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নৈতিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
লেখক : শিক্ষক।












