শিশু হলো জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুরা মন খারাপ করলে কি কারণে মন খারাপ করেছে পিতা–মাতাকে সুন্দরভাষায় জিজ্ঞাসা করা। বকা ঝকা দিয়ে নয়। শিশুর জন্য পারিবারিক শিক্ষা অতীত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর যখন মানসিক বিকাশ প্রস্ফুটিত হতে থাকে তখনই নিজের নিয়মশৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, কাজের প্রতি দায়িত্বশীল, লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হওয়া যায় সেভাবে শিশুদেরকে সুন্দরভাবে বুঝাতে হবে। শিশুর সামনে পিতা মাতাকে কোন ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না। আসলে শিশু যখন বড় হতে থাকে মা–বাবার আচরণগুলো সে সম্পর্কে ধারণা নিতে থাকে। শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যও সমান বা এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য তার ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সম্পর্ক, শিখন ক্ষমতা এবং সামগ্রিক বিকাশকে প্রভাবিত করে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, ব্যস্ত জীবনধারা এবং প্রতিযোগিতার কারণে শিশুদের মানসিক চাপ ক্রমবর্ধমান। তাই শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় শিশুর মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা, যেখানে সে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অন্যের সাথে সুন্দর সম্পর্ক রাখতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। মানসিক সুস্থ শিশুরা সাধারণত সুখী, সৃজনশীল এবং আত্মনির্ভরশীল হয়। মানসিকভাবে সুস্থ শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগী এবং নতুন ধারণা শিখতে আগ্রহী থাকে। সুস্থ মনোভাব শিশুদের বন্ধু, শিক্ষক এবং পরিবার সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করে। মানসিকভাবে সুস্থ শিশু সহজেই রাগ, হতাশা বা দুশ্চিন্তা মোকাবিলা করতে পারে। শিশুকালেই যদি মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক থাকে, তবে পরবর্তী জীবনের জন্য এটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বাবা–মায়ের ব্যস্ততা বা অভাব, আলাদা থাকা পরিবারে ঝগড়া, সহিংসতা বা অনিয়মিত আচরণ, সন্তানকে প্রতি মুহূর্তে চাপ দেওয়া, কঠোর পরীক্ষার চাপ শিক্ষকের, নেতিবাচক আচরণবন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, মোবাইল, ট্যাবলেট ও ইন্টারনেট অতিরিক্ত ব্যবহার, অনলাইন বাজে প্রভাব ও সাইবার বুলিং বন্ধুবর্গ বা সমাজের নেতিবাচক প্রভাব, নিরাপত্তার অভাব, গ্রামীণ বা শহুরে ভিন্নতা শিশু ছোটখাট বিষয় নিয়েও অত্যধিক চিন্তা করতে পারে।
স্কুলে না যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক বা পারিবারিক সমস্যা থেকে হতাশা দেখা দেয়। নিজেকে ছোট বা অযোগ্য মনে করা। আক্রমণাত্মক বা অশান্ত আচরণে রাগ প্রকাশে অতিরিক্ত সহিংসতা বা সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করা। শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ছোট অর্জনকেও উৎসাহিত করা, চাপ কমানো, প্রশংসার মাধ্যমে উৎসাহিত করা মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহমর্মী পরিবেশ চিত্রাঙ্কন, গান, নৃত্য ও খেলাধুলা গল্প, নাটক বা অভিনয় শিশুর আবেগ প্রকাশে সাহায্য করে সময়সীমা নির্ধারণ, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক অ্যাপ ও ভিডিও ব্যবহার বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কমিউনিটি বা ক্লাবের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ শিশুদের যদি দুশ্চিন্তা, অবসাদ বা আচরণ সমস্যা দেখা দেয়, তবে সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্টের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুদের আচরণে যদি এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে দ্রুত মনোযোগ দেওয়া উচিত। খাবার ও ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন পড়াশোনায় আগ্রহ হারানো, বন্ধু বা পরিবার থেকে আলাদা হওয়া, বারবার আতঙ্ক, রাগ বা দুশ্চিন্তা প্রকাশ করা হঠাৎ সামাজিক আচরণ পরিবর্তন বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে মানসিক চাপের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহুরে এলাকায় শিশুরা অতিরিক্ত পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে পড়ছে। গ্রামীণ অঞ্চলে সীমিত সুযোগ ও সামাজিক ভয় শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ। কোভিড–১৯ মহামারীর সময় শিশুদের সামাজিকীকরণ, স্কুল ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব মানসিক চাপ বাড়িয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষাকে স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা শিশুর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও সাপোর্ট সিস্টেম তৈরি করা পরিবার ও শিক্ষককে সচেতন করা মিডিয়া ও সামাজিক প্রচারে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য শুধু ব্যক্তিগত সুস্থতার বিষয় নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুরা যদি সুস্থ ও সৃজনশীল হয়, তবে সমাজও শক্তিশালী হয়। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও রাষ্ট্র মিলিতভাবে কাজ করলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব। তাই শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হলো আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।












