শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড

রোকেয়া হক | বুধবার , ৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

একটি দেশের যদি মেরুদণ্ড ভাঙতে চাও, তাহলে তার শিক্ষা ব্যবস্থা কে প্রথমে ধ্বংস করে দাও। না এটি আমার কথা নয়, বড় বড় মনীষীদের কথা। পত্রিকার বড় বড় হেডিং দেখে আমার তাই মনে হলো ‘তিনদিন বিদ্যালয়ে পড়তে যাও, বাকী দিন অনলাইনে পড়া লেখা কর।’ বাহ্‌ খুব সুন্দর ব্যবস্থাপনা। প্রশ্ন হচ্ছে এত সুন্দর প্রস্তাবনা কার মাথায় আসলো! যিনি বা যারা বিষয়টা চিন্তা করলেন। তাঁরা একবারও চিন্তা করেছেন না যে বাংলাদেশে তিন কোটি ৭০ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। পরিসংখ্যান অনুসারে প্রায় ৮৪% শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ছে। এরমধ্যে ৪৪% শিক্ষার্থী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছায়। জরিপে দেখা গেছে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা ৭ শতাংশ, নিম্ন মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ৬৯ দশমিক ৩%। এর মধ্যে এক বিরাট অংশ যাদের স্মার্ট ফোন নেই বা কেনার সামর্থ ও নেই। ওয়াইফাই বা রিচার্জ করার সামর্থ্য না থাকলে তারা কীভাবে অনলাইন ক্লাস করবে? কোভিটের সময়ে অনলাইন ক্লাস চালু হলেও গ্রাম, শহরতলীর এক তৃতীয়াংশ ছাত্রছাত্রী উল্লেখিত সমস্যার কারণে স্কুল বিমুখ হয়। যার মাশুল এখনো স্কুলগুলোকে ও পরিবারকে দিতে হচ্ছে। এক তৃতীয়াংশ স্কুলে একটা কিংবা ২ টা ফ্যান চলে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়। স্কুলগুলোতে আইপিএস নেই। এরপরও ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে আসে। সাথীদের সাথে ভাব বিনিময় হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা করে। দুই একটি রুমের মধ্যে নিজেদের ঘরে ওদের দম বন্ধ হয়ে যায়। ওরা উচ্ছৃঙ্খল। জেদী, বদ মেজাজী হয়ে যে কোন অঘটন ঘটায়। এরপরও যদি সিদ্ধান্তকারীরা পেট্রোল, বিদ্যুৎ এসবের কারণে স্কুল বন্ধের কথা বলেন তাহলে পরিণতি কী হতে পারে ভাবুন। ছাত্রছাত্রী রা পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে স্কুলে অনুপস্থিত থাকবে। ক্লাস টেস্ট পরীক্ষাগুলো দিবে না। সঠিক সময়ে স্কুলের বেতন পরিশোধ করবে না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। জরিপে দেখা গেছে কোভিডের কারণে এমন অনেক প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেনার দায়ে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই স্কুল বন্ধ ও খোলা রাখার চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়ার আগে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করা দরকার। বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা নাইন, টেন এর ছাত্রছাত্রীরা অনলাইন ক্লাস এর নামে স্মার্ট ফোনে চ্যাটিং করে, গেইমস খেলে।

মনে হচ্ছে, কোভিডের সময়কালে এক শ্রেণির মাক্স ব্যবসায়ীর মতো স্মার্ট ফোনের ব্যবসা, ওয়াইফাই ব্যবসা, মোবাইল রিচার্জ ব্যবসা, কোচিং ব্যবসা কি চালু হতে যাচ্ছে? পেট্রোল, জ্বালানী গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সবকিছুই আমাদের মূল্যবান সম্পদ। এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে হলে সহজেই কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সংকটের মোকাবিলা করা যায়। সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮ পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখা। বিয়ের অনুষ্ঠান উভয় পক্ষ (বর কনে) একত্রে ২ দিনে (বিয়ে ও হলুদ) শেষ করে নেয়া। জন্মদিন, অন্যান্য পারিবারিক সকল অনুষ্ঠান দিনের বেলায় শেষ করা। পথেপ্রান্তরে দোকান, মাল্টিসটোয়ার্ট বিল্ডিংয়ের পাওয়ারফুল লাইট সীমিতকরণ।

যে সব প্রতিষ্ঠানে তেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি সে সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিতকরণ, যাদের একের অধিক গাড়ি আছে তারা আপাতত একটা গাড়ি ব্যবহার করা বাইক ব্যবহারের পরিবর্তে বাইসাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ। সেচ, কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে আদি ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশের তেল বিদ্যুৎ সংকটের কিছুটা মোকাবিলা করা যায়। বিদ্যালয় বন্ধ রেখে শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে সংকটের মোকাবিলা অসম্ভব।

লেখক : কবি, উপস্থাপক; প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, লুসেনট লায়ন টিউটোরিয়াল এন্ড হাই স্কুল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমশার উপদ্রব বন্ধ হোক
পরবর্তী নিবন্ধজীবনের বসন্ত